বৃহস্পতিবার , আগস্ট ১৬ , ২০১৮

পলিপাস অপারেশনের সময় হাতুড়ের হাতের ওপরই রোগীর মৃত্যু

মেহেরপুরের গাংনীর গাড়াডোবের ফকরুজ্জামান কফু ডাক্তারের অপচিকিৎসা অব্যাহত

মেহেরপুর অফিস/গাংনী প্রতিনিধি: মেহেরপুর সদর উপজেলার আলমপুর বাজারের হাতুড়ে ডাক্তার ফকরুজ্জামান ওরফে ফকুর অপারেশনে সাইদুর রহমান (১৯) নামের এক যুবকের মুত্যু হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে আলমপুর বাজারের অদূরবর্তী ফকুর তামান্না ফার্মেসিতে পলিপাস অপারেশনের সময় এ ঘটনা ঘটে। তাকে হত্যা করা হয়েছে মর্মে পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। হাতুড়ের অপচিকিৎসায় অপমৃত্যুর শিকার সাইদুর রহমান গাংনী উপজেলার গাড়াডোব গ্রামের দিনমজুর সানোয়ার হোসেনের ছেলে।
নিহতের পরিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গাড়াডোব গ্রামের ফকরুজ্জামান ওরফে ফকু হাতুড়ে ডাক্তার হিসেবে আলমপুর গ্রামে তামান্না ফার্মেসিতে চিকিৎসা দিয়ে আসছেন। কোন ডাক্তারি পাশের সনদ না থাকলেও সে বিভিন্ন প্রকার অপারেশন করে থাকেন। গতকাল সকালে সাইদুরের নাকের পলিপাস অপারেশনের জন্য পরিবারের লোকজন ফকুর কাছে নিয়ে যায়। নাকের অপারেশন করা অবস্থায় সাইদুরের মৃত্যু হয়। বিষয়টি ধামাচাপা দিতে মৃত সাইদুরকে গুরুতর অসুস্থ দাবি করে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায় ফকু নিজেই। তবে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে সাইদুরকে রেখে কৌশলে পালিয়ে যায় ফকু।
মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. এহসানুল কবির বলেন, হাসপাতালে পৌঁছুনোর আগেই সাইদুরের মৃত্যু হয়েছে। অদক্ষ হাতে নাকে ভুল অপারেশনে অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণের ফলে তার মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন এই চিকিৎসক। কিভাবে ফকু ডাক্তার অপারেশন করছে তা স্বাস্থ্য বিভাগ খতিতে দেখছে বলেও জানান তিনি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিজেকে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দাবি করে ফকরুজ্জামান ফকু। নিজ চেম্বারে রয়েছে একটি অপারেশন থিয়েটার। নাক, কান ও গলাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে অপারেশনে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি রয়েছে। বিভিন্ন প্রকার রোগীকে প্রতিনিয়ত অপারেশন করেন। তার অপারেশনে এর আগেও কয়েকজনের মৃত্যু হয়। তবে রোগীর স্বজনদের কৌশলে ম্যানেজ করায় বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায়। সরজমিন নিহতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় শোকের মাতম। নিকটাত্মীয় ছাড়াও পাড়াপ্রতিবেশী ও গ্রামের নারী পুরুষ সমবেদনা জানাতে ভিড় করেছেন সাইদুরের বাড়িতে। নিহতের মায়ের আহাজারিতে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি উৎসুক নারীরা। ছেলের বন্ধু বান্ধবদের জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন মা। আদরের সন্তানটিকে ফিরিয়ে দেয়ার দাবি। আহাজারিতে উঠে আসে ফকুর নানা অপকর্মের অভিযোগ। নিহতের মা নিলুফা খাতুন বলেন, অনেক দিন থেকেই ছেলের নাকে পলিপাস। প্রয়োজনীয় টাকার অভাবে চিকিৎসা নিতে পারছিলো না। তাই সম্প্রতি তামাক বিক্রির টাকা দিয়ে ফকুর কাছে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত হয়। সেমতে গতকাল সকালে নিহতের এক চাচির সাথে গাড়াডোব গ্রামের পাশর্^বর্তী আলমপুর গ্রামে হাতুড়ে ডাক্তার ফকরুজ্জামান ওরফে ফকুর তামান্না ফার্মেসিতে যায়।
নিহতের চাচী বলেন, ফকরুজ্জামান ফকুর চেম্বারের এক পাশে রয়েছে অপারেশন ঘর। সাইদুরকে তার কাছে নিয়ে গেলে অপারেশন কক্ষে নিয়ে যায়। আমাকে বাইরে বসিয়ে রাখে। অপারেশন শুরু হলে সাইদুরের গোঙরানি শুনতে পাই। তবে আমাকে ভেতরে যেতে দেয়া হয়নি। আমার মনের মধ্যে ভালো ঠেকছিলো না তাই বাড়িতে মোবাইলে করে সাইদুরের বাবাকে সেখানে আসতে বলি। এর কিছুক্ষণ পরে অপারেশন থেকে ফকু বাইরে আসে। অপারেশন ভাল হয়েছে তবে রক্ত বন্ধ করার জন্য মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে নেয়ার কথা বলে। তিনি অ্যাম্বুলেন্সে খবর দেয়। একটু পরে অ্যাম্বুলেন্স আসলে সাইদুরকে নিয়ে ফকু মেহেরপুর চলে যায়।
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ফকরুজ্জামান ওরফে ফকুর চেম্বারের সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে তার নাম ও পরিচয় এবং চিকিৎসার বর্ণনা। নিজের নামে পাশে এল.এম.এ.এফ.পি, আর.এম.পি (ঢাকা) লিখেছেন। তিনি আদৌ প্যারামেডিকেল প্রশিক্ষণ কোর্স করেছেন কি-না তা সন্দিহান। সাইনবোর্ডে নিজেকে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দাবি করেছেন। সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি ও জরুরি অক্সিজেন পাওয়া যায় বলেও সাইনবোর্ডে লেখা হয়েছে। মেডিকেল সনদ ছাড়াই সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি কিভাবে বিক্রি হয় এবং অক্সিজেন বিক্রির কোনো সনদ আছে কি-না তা খতিয়ে দেখেননি কেউ।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ফকরুজ্জামান ফকুর কাছে কোনো রোগী গেলেই অপারেশন অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে। অপারেশন করায় তার নেশা হয়ে উঠেছে। রোগীকে অজ্ঞানও করা হয় না। এজন্য অনেকেই তাকে কসাই হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বিভিন্ন প্রকার অপারেশনের জন্য ফকুর ফার্মেসিতে রয়েছে আধুনিক যন্ত্রপাতি। এগুলো অনেক ক্লিনিকের চিকিৎসকরা অপারেশনের কাজে ব্যবহার করেন। ফকুকে কোন অর্থ দিতে হয় না। যন্ত্রপাতি সরবরাহের বিনিময়ে অপারেশনের সময় ফকু সেখানে উপস্থিত থাকে। এই চোখের দেখায় সে অপারেশনে উৎসাহিত হয়।
হাতুড়ে ডাক্তার ফকরুজ্জামান ফকুর ফার্মেসীর আশেপাশের লোকজনের সূত্রে জানা গেছে, বেশ কয়েকদিন আগে এক রোগীকে অপারেশন করেছেন ফকু। এছাড়াও হাত-পা, নাক, কান, গলা, মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে অনেক রোগীর অপারেশন করেছে ফকু। তার এই অপারেশনে অনেকই আজ পঙ্গু। মৃত্যুবরণ করেছেন কয়েকজন। কিন্তু কৌশলে রোগীর পরিবারকে ম্যানেজ করার বিষয়টি তেমনভাবে প্রকাশ হয়নি।
স্থানীয় অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে জানালেন, দীর্ঘদিন ধরে হাতুড়ে ডাক্তার ফকরুজ্জামান ফকু এভাবে অপারেশন করে যাচ্ছে। পঙ্গু কিংবা মৃত্যুবরণের ঘটনাও আছে। কিন্তু জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ তার বিরুদ্ধে কেনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি? জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কর্তাব্যক্তিদের নিরবতার পেছনে অনেক সমালোচনা এখন সাধারণ মানুষের মনে। যারা ফকুর যন্ত্রপাতি নিয়ে অপারেশন করে তাদের মধ্যে তো জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের দু’য়েকজন রয়েছেন। তাদের এই ভূমিকা এখন জনমনে বিরুপ প্রভাব ফেলছে। হাতুড়ে ডাক্তারের অপারেশনে রোগী মৃত্যুর ঘটনায় এলাকাজুড়ে বইছে ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড়। সন্তানকে হারিয়ে পাগলপ্রায় নিহতের মা ও বাবা।
নিহতের পারিবারিক পরিচয়:
গাড়াডোব গ্রামের কাচারিবাজারপাড়ার দিনমজুর সানোয়ার হোসেনের দুই ছেলে যথাক্রমে সাইদুর ও জাহিদ। সংসারে অনটনের জন্য দুই ছেলে পিতার পেশা বেছে নিয়েছেন। স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে সানোয়ার হোসেনের বেশ সুখেই কাটছিলো। তিনজনের আয়ে সংসারে সচ্ছলতা ফিরে আসার পথে এমন দুর্ঘটনায় শোক ও হতাশায় গ্রাস করেছে পরিবারটিতে। সাইদুরকে হত্যা করা হয়েছে মর্মে অভিযোগ করে ফকুর দৃষ্টান্তমূলক সাজা ও ফার্মেসী বন্ধের দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।
এদিকে, নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল বিকেলে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। সন্ধ্যার পর গাড়াডোব ঈদগাহ ময়দানে শত শত মুসল্লির উপস্থিতিতে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে গ্রাম্য কবরস্থানেই তার দাফন সম্পন্ন হয়।
মেহেরপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল আলম বলেন, নিহত সাইদুরের পিতা বাদী হয়ে গতকাল রাতে ফকুকে একমাত্র আসামি করে সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। অপারেশন প্রতারণায় মৃত্যু, তাই দ-বিধির ৩০৪(ক) ধারায় হত্যা মামলা এজাহারভুক্ত (রেকর্ড) করা হয়েছে। আগামী গ্রেফতারের জোর প্রচেষ্টা চলছে। অপারেশন করার সময় ফকুর সাথে আর কেউ উপস্থিত ছিলো কি-না তা তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তের পর আসামির সংখ্যা বাড়তে পারে বলেও জানিয়েছেন তিনি।


আরো দেখুন

চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে মোবাইল চোরকে গণধোলাই শেষে পুলিশে সোপর্দ

স্টাফ রিপোর্টার: সাত সকালে হাসপাতালে মানুষের ছোটাছুটি হৈ চৈ দেখে সাধারণ রোগীদের মাঝে ভীতির সৃষ্টি …

Loading Facebook Comments ...