তীব্র বাহাসে বিতর্ক পেয়েছে ভিন্নমাত্রা

দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের রাজনীতির আলোচিত চরিত্র কাদের-ফখরুল

স্টাফ রিপোর্টার: তীব্র বাহাসে জড়ালেন ওবায়দুল কাদের এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্যের কড়া জবাব দিলেন বিএনপি মহাসচিব। গেল কয়েক মাস ধরেই একে অন্যের কথার জবাব দিয়ে আসছিলেন তারা। তবে গত দুই দিনে তাদের বিতর্ক পেয়েছে ভিন্নমাত্রা। শনিবার ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর টাকার বস্তার ওপর শুয়ে আছেন। ফখরুল সাহেব এখন চাঙ্গা হয়ে গেছেন। টাকা পাচ্ছেন তো। টাকারে টাকা! আরব আমিরাতের টাকা, দুবাইয়ের টাকা। এই তো এলো টাকা। ফখরুল সাহেব মহাখুশি।’ গতকাল নয়াপল্টনে এক সংবাদ সম্মেলনে ওবায়দুল কাদেরের এ বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ বক্তব্যকে ‘অশালীন ও ব্যক্তিগত আক্রমণ’ বলে মন্তব্য করেন বিএনপি মহাসচিব বলেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের শনিবার খুব আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন। সমস্ত রাজনৈতিক শিষ্টাচারের বাইরে গিয়ে তিনি কথাগুলো বলেছেন এবং আমাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেছেন। আমি ওবায়দুল কাদের সাহেবকে এটুকু বলতে চাই, ব্যক্তিগত আক্রমণ করলে সামাল দিতে পারবেন না। অযথা বেশি ঘাঁটাবেন না। কাদা থেকে কেঁচো বেরিয়ে আসে। আপনারা কী করেন গোটা বাংলাদেশের মানুষ জানে। কীভাবে অর্থ উপার্জন করেন, সবাই জানে। আমরা আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে রাজনীতি করি। আমরা কারও পয়সায় রাজনীতি করি না। আমাদের দলের প্রতিটি সদস্য নিজেরা চাঁদা দিয়ে প্রতিটি সমাবেশ করছে। এটাই হলো আমাদের বৈশিষ্ট্য। ওবায়দুল কাদের দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের রাজনীতির এক আলোচিত চরিত্র। তার উত্থান হঠাৎ কিংবা নাটকীয় নয়। ছাত্র থাকতেই রাজনীতিতে হাতে খড়ি। মুক্তিযুদ্ধে রেখেছিলেন গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। ছাত্রলীগের শীর্ষ পদেও দায়িত্ব পালন করেছেন। মন্ত্রিসভারও প্রভাবশালী সদস্য। কারাভোগ করেছেন বহুবার। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক হিসেবে প্রায়শই কথা বলেন মিডিয়ায়। কখনো আলোচিত, কখনো সমালোচিত। এক সময় ভূমিকা রেখেছেন সাংবাদিক হিসেবেও। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উত্থানও ছাত্র রাজনীতির হাত ধরে। ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ নেতা। পরে জড়ান শিক্ষকতা পেশায়। তৃণমূল থেকে উঠে এসে হয়েছেন বিএনপি’র অন্যতম শীর্ষ নেতা। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরব প্রতিদিনই। ছুটছেন এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। বিরোধী রাজনীতির লাইম লাইটও এখন অনেকটা তার ওপর। ফখরুল ব্যক্তিগত আক্রমণ করলে সামাল দিতে পারবেন না ওবায়দুল কাদেরকে উদ্দেশ্য করে এ মন্তব্য করার পাশাপাশি ফখরুল আরও বলেন, আপনারা কী করেন সেটা বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকে সবাই জানে, হঠাৎ ফুলে কলাগাছ হয়ে যাচ্ছেন। আপনারা কে কোথায় হাজার হাজার কোটি টাকার বাড়ি করছেন। কে কোথায় ব্যাংকের লোন নিয়ে পাচার করে দিচ্ছেন। আপনারা কানাডাতে বেগমপাড়া, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম করলেন সব খবর রাখি। কে কয়টা ব্যাংকের মালিক হলেন, কারা আমেরিকাতে কতোগুলো বাড়ি করেছেন, আর দেশের মানুষের ৪৩ কোটি টাকা দিয়ে সচিবদের জন্য বাড়ি করছেন। এগুলো মানুষের টাকা। এগুলো মানুষের করের টাকা। আপনাদের চেহারার দিকে তাকানো যায় না। তিনি বলেন, আপনারা সব সরকারি গাড়ি-টাকা ব্যবহার করে যে লোকজন নিয়ে এলেন, বিশাল নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে, সরকারি জায়গার মধ্যে সেখানেও চেয়ার পর্যন্ত পূর্ণ করতে পারলেন না। ২২ হাজার চেয়ার ছিলো। ২২ হাজার চেয়ার যদি পূর্ণ না হয় তাহলে কতো লোক হয়েছিলো! আমি কথাটা আলোচনা করতে চাইনি। যেহেতু উনি আমার নাম বলেছেন, সেই কারণে কথাগুলো বললাম। দিস ইজ ভেরি আনফরচুনেট! আমরা এটা আশা করি না, এত বড় রাজনৈতিক দলের সাধারণ সম্পাদকের মুখ থেকে অশালীন ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে আক্রমণ আসবে। মির্জা ফখরুল আরও বলেন, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একেবারে ভাগাড়ে নিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছে। ১৯৭৪ সালে আমরা যে দুর্ভিক্ষ দেখেছিলাম, আবার সেই দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। কথাটা আমার নয়, কথাটা প্রধানমন্ত্রীর। এটাকে আবারো তলাবিহীন ঝুড়ি বলার অবস্থা তৈরি করেছে এই সরকার। রিজার্ভের পরিমাণ কমতে কমতে এমন জায়গায় এসেছে যে, দুর্নীতির কারণে প্রতিটি খাতে এমন দুর্নীতি হচ্ছে যার ফলে আবার আজকে তলাবিহীন ঝুড়ির দিকে চলে যাচ্ছে। মিথ্যাচার করে, মানুষকে বোকা বানিয়ে, প্রতারণা করে তারা আবার একদলীয় শাসন ব্যবস্থায় নিয়ে গেছে দেশকে। আজকে শুধু নামমাত্র, মুখে বলা যে, গণতন্ত্র আছে। আসলে কোনো গণতন্ত্র নেই। গণমাধ্যমের কোনো স্বাধীনতা নেই। তাদের যেটুকু বলা হয়, তারা শুধু সেটুকুই বলবেন। তার বাইরে বলতে পারবেন না। যুবক-তরুণদের কর্মসংস্থান নেই। এই সরকার দেশকে আবারো দারিদ্র্যের দিকে নিয়ে গেছে। ৪২ শতাংশ মানুষ এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে। কয়েকদিন আগে একটি জরিপ হয়েছে, শতকরা ৩০ শতাংশ লোক এখন খাদ্য সংকটে ভুগছে। এ বিষয়গুলো আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের কারণে হয়েছে। এখানে তো মানুষের কোনো অধিকার নেই। আমাদের রাজনীতি করার স্পেস একেবারে কমিয়ে ফেলা হয়েছে। নির্বাচন ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা হয়েছে। আওয়ামী লীগের উদ্দেশ্যে বিএনপি মহাসচিব বলেন, এতই যদি আপনারা শক্তিশালী হন, জনগণের প্রতি আস্থা থাকে তাহলে এত ভয় পান কেন? বিরোধী দলকে সভা-সমাবেশ করতে দেন না কেন? কেন আপনারা পরিবহন বন্ধ করে দেন? আপনাদের গু-া লেলিয়ে দিয়ে সাধারণ মানুষ যারা সভায় আসতে চায়, তাদের আঘাত করেন? একটাই কারণ, তারা জানে, গণতন্ত্র যদি ঠিক মতো চলে, জনগণ যদি ভোট দিতে পারে, রাজনৈতিক দলগুলো যদি কাজ করতে পারে তাহলে তারা কোনো দিনই ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারবে না। জবাব, পাল্টা জবাব: অনেকদিন ধরেই অবশ্য বাহাস চলে আসছে ওবায়দুল কাদের ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মধ্যে। এর আগে গত ১৭ই অক্টোবর নিজ বাসায় এক সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুলের পদত্যাগ দাবি করেন কাদের। ওবায়দুল কাদের বলেন, আন্দোলন ও নির্বাচনে টানা ব্যর্থতার জন্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেই সবার আগে পদত্যাগ করা উচিত। তিনি বলেন, বিএনপি’র সম্মেলন কবে হয়েছে ফখরুল সাহেবের হয়তো তাও জানা নাই। সম্মেলন ছাড়াই ক’বছর ধরে দলের মহাসচিব পদে বসে আছেন। আগে বাস্তবতা অনুধাবন করতে শিখুন। এর আগের দিন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মন্তব্য করেন, উত্তরা থেকে গাজীপুর বিআরটি প্রজেক্ট নাকি সরকারের গলার কাঁটা-এমন বক্তব্য দেয়ার আগে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের পদত্যাগ করা উচিত। গত ৩রা সেপ্টেম্বর ওবায়দুল কাদের বলেন, সরকার হটাবেন? দেখি-না জনগণ সাড়া দেয় কিনা? এখনো কোথাও জনগণ সাড়া দেয়নি। জনগণ কারও সঙ্গে মারামারি করে না। আপনাদের আন্দোলন মানে হচ্ছে নিজেরা নিজেরা মারামারি, চেয়ার ছোড়াছুড়ি। আপনাদের বিক্ষোভ মানেই পুলিশের ওপর হামলা। তো পুলিশ আত্মরক্ষা করবে না? তিনি বলেন, মির্জা ফখরুলকে সতর্ক করে দিতে চাই। আপনাদের হাতে রক্তের অনেক দাগ। আমরা আপনাদের কাউকে হত্যা করিনি। হত্যা ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে আমরা বিশ্বাস করি না। পরদিন এর জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, বিরোধী দল যাতে আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে সেজন্য মাঠ খালি করতে হামলা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সারা দেশে বিএনপি’র কর্মসূচিতে পুলিশের হামলা ও গুলিতে তিন জন নিহত, দুই হাজারের বেশি আহত ও দুই শতাধিক নেতার্কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ৫ই অক্টোবর ওবায়দুল কাদের মির্জা ফখরুলের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, এ ধরনের বক্তব্য হাস্যকর ও নির্লজ্জ মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়। বিএনপি নেতারাই তো মাঠে নামতে ভয় পায়, আন্দোলনের ডাক দিয়ে তারা ঘরে বসে থাকে। আমরা চাই, বিএনপি নির্বাচনে আসুক। আওয়ামী লীগ খালি মাঠে গোল দিতে চায় না। ৯ই সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে দৃশ্যমান কোনো উন্নতি নেই বলে মন্তব্য করেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, এখন অর্জন বলতে শুধু কুশিয়ারা নদীর ১৫৩ কিউসেক পানি। বলা হচ্ছে, সীমান্ত হত্যা জিরোতে আনা হবে। যেদিন এই কথা বলা হলো, সেদিনই দিনাজপুর সীমান্তে গুলি চালানো হলো। পরদিন ওবায়দুল কাদের বলেন, বিএনপি নেতারা যদি হাতের তালু দিয়ে চোখ ঢেকে রাখে তাহলে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে কোনো অর্জন না দেখারই কথা। ভারত সফরে দেশবাসীর প্রত্যাশা পূরণ হলেও বিএনপি’র প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। কারণ তারা চায় প্রতিবেশীর সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক, বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে। ওইদিনই বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একটি অনুষ্ঠানে বলেন, ভারতও এখন আওয়ামী লীগের ওপর খুশি নয়। ভারতের সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্ক হোক এটা আমরা সবাই চাই। ভারত আমাদের বন্ধুপ্রতিম দেশ। কিন্তু দেশের মানুষ ভাবলো হয়তো বা এবার তিস্তার পানি চুক্তি হবে। অভিন্ন নদীগুলো পানি পাবে। বাণিজ্যের ব্যবধানগুলো কমে আসবে। তারাও সেই আশা করে গিয়েছিল। কিন্তু ভারত আর এখন তাদের ওপর খুশি নয়। এ ছাড়াও তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেয়া বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। গত ১১ই সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সুসম্পর্ক হওয়ায় বিএনপি’র গাত্রদাহ হয়েছে। তিনি বলেন, বিদেশি কোনো রাষ্ট্র বা সংস্থা কাউকে ক্ষমতায় বসাবে এমন উদ্ভট ঘটনা আপনারা বিশ্বাস করলেও আমরা করি না। পরের দিন মির্জা ফখরুল বলেন, পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। তার এমন বক্তব্যের প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলেন, রাষ্ট্রের পুলিশ বাহিনীকেও নতুন করে প্রতিপক্ষ বানাচ্ছে বিএনপি। তাদের কথা থেকে প্রমাণ হয় তথাকথিত নিষেধাজ্ঞা ষড়যন্ত্রের মূলহোতা বিএনপি। ১৫ই সেপ্টেম্বর মির্জা ফখরুল নিজ এলাকা ঠাকুরগাঁওয়ে বলেন, পাকিস্তান সরকার থেকে বর্তমান সরকার আরও নিকৃষ্ট। আমরা পাকিস্তান আমলে আর্থিক ও জীবনযাত্রার দিক থেকে এখনকার চেয়ে ভালো ছিলাম। পাকিস্তান সরকার যেহেতু আমাদের অধিকার ও সম্পদ হরণ করতো, সে কারণে আমরা যুদ্ধ করেছি। কিন্তু এখন তার থেকেও খারাপ অবস্থায় আমরা আছি। এখন দেশে ১ লাখ ৯২ হাজার কোটিপতি আছে। এখানে গরিব মানুষের অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে। যে দেশে ৪২% মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে, সে দেশকে উন্নত দেশ কীভাবে বলা যায়? এর পরদিন ওবায়দুল কাদের বলেন, বাংলাদেশের অগ্রগতি, সাফল্য, উন্নয়ন ও অর্জন যখন বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত তখন বিএনপি মহাসচিব পাকিস্তান আমলের প্রশংসা করেন। এ ধরনের বক্তব্যে পাকিস্তানপ্রীতির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। যা দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র ও রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More