ফেরিঘাটে বাসডুবিতে মৃত্যু বেড়ে ২৬ : তদন্ত কমিটি গঠন

আহতদের চিকিৎসায় আর্থিক সহযোগিতা দিচ্ছে প্রশাসন

স্টাফ রিপোর্টার: রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মা নদীতে বাসডুবির ঘটনায় এখন পর্যন্ত মোট ২৬জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এদের সবার পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। মৃতদের মধ্যে ১৪জন নারী এবং ১২জন পুরুষ। এদের মধ্যে চার জন ছেলে শিশু এবং তিন জন মেয়ে শিশু রয়েছে। গতপরশু বুধবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের পন্টুন থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে গেলে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। বুধবার দুর্ঘটনার কবলে পড়ার পর বিআইডব্লিউটিএ-এর উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা এবং ফায়ার সার্ভিস ও কোস্ট গার্ডের ডুবুরি দল’ উদ্ধারকাজ শুরু করে। প্রতিকূল আবহাওয়া ও তীব্র স্রোতের প্রতিকূলতা পেরিয়ে রাত সাড়ে ১১টার দিকে বাসটি নদী থেকে টেনে তোলা হয়। গতকাল সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত মোট ২৬জনের মৃতদেহ উদ্ধার নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা হলেন-রাজবাড়ী পৌরসভার ভবানীপুর এলাকার লালমিয়া সড়কের মৃত ঈসমাইল হোসেনের স্ত্রী রেহেনা আক্তার (৬১), কুষ্টিয়া পৌরসভা ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের মজমপুর গ্রামের মো. আবু বক্কার সিদ্দিকের স্ত্রী মর্জিনা খাতুন (৫৬), কুষ্টিয়া সদর থানার খাগড়বাড়ীয়া গ্রামের হিমাংশু বিশ্বাসের ছেলে রাজীব বিশ্বাস (২৮), রাজবাড়ী পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সজ্জনকান্দা গ্রামের মৃত ডা. আবদুল আলীমের মেয়ে জহুরা অন্তি (২৭), রাজবাড়ী পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সজ্জনকান্দা গ্রামের কাজী মুকুলের ছেলে কাজী সাইফ (৩০), রাজবাড়ী জেলাধীন গোয়ালন্দ উপজেলার ছোট ভাকলা ইউনিয়নের চর বারকি পাড়া গ্রামের রেজাউল করিমের স্ত্রী মর্জিনা আক্তার (৩২) এবং তার কন্যা সাফিয়া আক্তার রিন্থি (১২), কুষ্টিয়া জেলার খোকশা উপজেলার সমাজপুর ইউনিয়নের ধুশুন্দু গ্রামের দেলোয়ার হোসেনের ছেলে ইস্রাফিল (৩), রাজবাড়ী জেলার কালুখালী উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামের বিল্লাল হোসেনের কন্যা ফাইজ শাহানূর (১১), রাজবাড়ী পৌরসভা ৫ নম্বর ওয়ার্ড সজ্জনকান্দা এলাকার কেবিএম মুসাব্বিরের ছেলে তাজবিদ (৭), রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার পশ্চিম খালখোলা গ্রামের আরব খানের ছেলে আরমান খান (৩১) (গাড়ির চালক), রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মদেন্দ্রপুর ইউনিয়নের বেলগাছি এলাকার আব্দুল আজিজের স্ত্রী নাজমিরা জেসমিন (৩০), রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজাপুর ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর গ্রামের সোবাহান মন্ডলের মেয়ে লিমা আক্তার (২৬), রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজাপুর ইউনিয়নের বড় চর বেনি নগর গ্রামের মান্নান মন্ডলের স্ত্রী জোছনা বেগম (৩৫), গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার আমতলী ইউনিয়নের নোয়াধা গ্রামের মৃত জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী ও সিদ্দিকুর রহমানের মেয়ে মুক্তা খানম (৩৮), দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর উপজেলাধীন মথুয়ারাই গ্রামের মৃত নূর ইসলামের স্ত্রী নাছিমা (৪০), ঢাকা জেলার আশুলিয়া উপজেলার বাগধুনিয়া পালপাড়া গ্রামের মো. ইরুজ্জামানের স্ত্রী আয়েশা আক্তার সুমা (৩০), রাজবাড়ী পৌরসভার সোহেল মোল্লার মেয়ে সোহা আক্তার (১১), কুষ্টিয়া জেলার খোকশা উপজেলার সমসপুর ইউনিনের গিয়াস উদ্দিন রিপনের মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকা (১৩), ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার কাচের কোল ইউনিয়নের খন্দকবাড়িয়া গ্রামের নুরুজ্জামানের ছেলে আরমান (সাত মাস), রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার রতনদিয়া ইউনিয়নের মহেন্দ্রপুর গ্রামের আব্দুল আজিজের ছেলে আব্দুর রহমান (৬), রাজবাড়ী সদর উপজেলার দাদশি ইউনিয়নের আগমারাই গ্রামের শরিফুল ইসলামের ছেলে সাবিত হাসান (৮), রাজবাড়ী পৌর ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইসমাইল হোসেন খানের ছেলে আহনাফ তাহমিদ খান (২৫), রাজবাড়ী কালুখালী উপজেলার বোয়ালিয়া এলাকার মো. সানাউল্লা শেখের ছেলে মো. জাহাঙ্গীর আলম (৫৫), রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মদাপুর এলাকার আফছার শেখেরে ছেলে আসরাফুল ইসলাম (৫০) এবং রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার ঝাউগ্রাম এলাকার মজনু খার ছেলে উজ্জল খান (৪০)। দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিচয় শনাক্তকরণে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন সাংস্কৃতিক বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, তার সঙ্গে আরও উপস্থিত ছিলেন রাজবাড়ী দুই আসনের সংসদ সদস্য হারুন অর রশিদ হারুন, রাজবাড়ী জেলা পরিষদের প্রশাসক আব্দুস সালাম, জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার, পুলিশ সুপার মঞ্জুর মোর্শেদসহ প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। এ সময় স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে রাজবাড়ি সদর হাসপাতালের পরিবেশ।

দুটি তদন্ত কমিটি গঠন : এদিকে, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে সরকার দুটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। একটির নেতৃত্বে আছেন রাজবাড়ীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং অন্যটির নেতৃত্বে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মহিদুল ইসলাম। দুই কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের আর্থিক সহায়তা: নৌপরিবহন ও সেতু প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান জানিয়েছেন, নিহতদের দাফনের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবার প্রতি প্রাথমিকভাবে ২৫ হাজার টাকা এবং আহতদের চিকিৎসার জন্য ১৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর স্থায়ী পুনর্বাসনের বিষয়ে সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করবে। বর্তমানে উদ্ধার অভিযান কাজ চলমান রয়েছে।

এদিকে, বিশেষ প্রতিনিধি জানান, নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে গতকাল বৃহস্পতিবার এই দুর্ঘটনার বিষয়ে এক বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এই যাত্রীবোঝাই বাস নিমজ্জিত হয়ে প্রাণহানি নিছক কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ত্রুটি এবং চরম দায়িত্বহীনতা। নৌ-চলাচল অধ্যাদেশের অধীনে প্রণীত বিধিমালা অনুযায়ী প্রত্যেক ফেরি ও লঞ্চঘাটে বিআইডব্লিউটিএর ট্রাফিক ইন্সপেক্টর থাকা আবশ্যক উল্লেখ করে অশীষ কুমার দে বলেন, ঘাটে ফেরি না থাকা অবস্থায় যাত্রীবোঝাই বাসটিকে পন্টুনের কাছাকাছি পৌঁছানোর সুযোগ দেয়ার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্রাফিক ইন্সপেক্টর দায়ী। সেখানে বিআইডব্লিউটিসির ফেরি সার্ভিস পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীও এই অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বে অবহেলার দায় এড়াতে পারেন না। আবার প্রতি ঈদ মরসুমে পাটুরিয়া ও দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় স্থানভেদে পুলিশ, নৌ-পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশ অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করে থাকে। তবে ফেরিঘাটগুলোর ক্ষেত্রে এসব কিছুই নির্ভর করে বিআইডব্লিউটিএ এবং বিআইডব্লিউটিসির আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার ওপর। কারণ, ফেরি সার্ভিস পরিচালনার দায়িত্ব বিআইডব্লিউটিসির এবং ফেরিঘাট পরিচালনার দায়িত্ব বিআইডব্লিউটিএর। এই দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির দায়ভার এই দুই কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না বলে জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক অভিমত ব্যক্ত করেন।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More