সেদিন কী হয়েছিলো বুয়েটে

স্টাফ রিপোর্টার: ২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েটের শেরেবাংলা হল। কক্ষ নম্বর ২০১১। মধ্যরাত পর্যন্ত থেমে থেমে কান্নার আওয়াজ আসছিলো ওই কক্ষ থেকে। হলের অন্য ছাত্রদের কাছে ঘটনাটিকে খুব একটা অস্বাভাবিক মনে হয়নি। কারণ ২০১১ নম্বর কক্ষটি হল ছাত্রলীগের টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ছাত্রলীগ নামধারী সেই পাষ- ছাত্ররা ভুক্তভোগী আবরার ফাহাদ রাব্বীকে যে মেরেই ফেলবে তা ঘুণাক্ষরে কল্পনাও করতে পারেননি হলের ছাত্ররা। রাত আনুমানিক ২টার দিকে হলের সিঁড়িতে তোশকের ওপর আবরারের লাশ প্রথমে দেখতে পান দ্বিতীয় তলার কয়েকজন আবাসিক ছাত্র। মুহূর্তের মধ্যে তা শেরেবাংলা হলসহ আশপাশের হলে ছড়িয়ে পড়ে। রাত ৩টার দিকে আসেন বুয়েটের চিকিৎসক মাশরুক এলাহী। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তিনি বুঝতে পারেন ততক্ষণে আবরার অনন্তলোকে পাড়ি জমিয়েছেন। নৃশংস ও চাঞ্চল্যকর ওই ঘটনাটি নিয়ে প্রতিবেদন বিভিন্ন গণমাধ্যম ফলাও করে প্রকাশ করে। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের মেধাবী ছাত্রদের এমন আচরণে আঁতকে ওঠেন সচেতন মহল। হলের যে কক্ষে আবরার থাকতেন, ওই কক্ষ ও আশপাশে কক্ষগুলোর কয়েকজন আবাসিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ছুটি কাটিয়ে কুষ্টিয়ার গ্রামের বাড়ি থেকে ৬ অক্টোবর বিকালে নিজের ক্যাম্পাসে ফেরেন আবরার। ওই দিন বিকেলের দিকে শেরেবাংলা হলে নিজের ১০১১ নম্বর কক্ষে পৌঁছে ফোনে মায়ের সঙ্গে কথাও বলেন। ৫ অক্টোবর বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে বিভিন্ন চুক্তি নিয়ে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন আবরার ফাহাদ রাব্বী। শিক্ষার্থীরা জানান, বাড়ি থেকে ফিরে আবরার নিজের কক্ষেই পড়ালেখা করছিলেন। ৬ অক্টোবর রাত ৮টার দিকে ছাত্রলীগের কয়েকজন কর্মী আবরারের কক্ষে গিয়ে তাকে ডেকে নিয়ে আসেন। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ২০১১ নম্বর কক্ষে। এই কক্ষে থাকেন ছাত্রলীগের চার নেতা। সেখানে তার মোবাইল ফোন তল্লাশি করেন নেতারা। ওই কক্ষে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল ও সহ-সভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদ। তারা আবরারের মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে সেটি যাচাই করেন। একপর্যায়ে আবরারকে তার ফেসবুক আইডি খুলতে বলেন। পরে তারা তার ফেসবুক ও মেসেঞ্জার ঘেঁটে তাকে শিবিরের নেতা হিসেবে উল্লেখ করেন। এর পরই ওই দুই নেতার সঙ্গে থাকা আরও কয়েকজন তাকে মারধর শুরু করেন। আবরারকে ক্রিকেট খেলার স্টাম্প দিয়ে এলোপাতাড়ি পেটানো হয়। ‘শিবির ধরা হয়েছে’- এমন খবর পেয়ে সেখানে সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেলের অনুসারী আরও সাত থেকে আটজন নেতা জড়ো হন। তারাও সেখানে তাকে এলোপাতাড়ি মারধর করেন। একপর্যায়ে নিস্তেজ হয়ে যায় আবরারের দেহ। রাত ২টার পর তাকে ওই কক্ষ থেকে বের করে হলের সিঁড়িতে ফেলে রাখা হয়। পরে রাত ৩টার দিকে শেরেবাংলা হলের সিঁড়ি থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরবর্তী সময়ে হলের সিসিটিভি ফুটেজেও আবরারের লাশ বের করার দৃশ্য ধরা পড়ে। শেরেবাংলা হলের একজন আবাসিক ছাত্র সে সময় জানান, তিনি রাত ২টার দিকে পানি আনতে গিয়ে দেখেন নিচতলা ও দোতলার সিঁড়ির মাঝে তোশকের ওপর আবরারের নিথর দেহ পড়ে আছে। তখন সেখানে ছাত্রলীগের অন্তত তিনজন দাঁড়িয়ে ছিলেন। এতে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে অন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ঘটনা জানাজানি হয়। তখন সবাই হলের চিকিৎসকদের খবর দেন। চিকিৎসক এসে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। অ্যাম্বুলেন্স ডাকার একপর্যায়ে চিকিৎসক জানান, আবরার আর নেই, মারা গেছেন। ততক্ষণে ছাত্রলীগের ওই কর্মীরা পালিয়ে যান। ওই সময় হলের প্রভোস্টও ঘটনাস্থলে আসেন।
বুয়েটের চিকিৎসক মাশরুক এলাহী সে সময় জানান, খবর পেয়ে তিনি রাত ৩টার দিকে ঘটনাস্থলে আসেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বুঝতে পারেন, ছেলেটি বেঁচে নেই।
কয়েকজন শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, পেটাতে পেটাতে আবরারকে হল ছাড়ার নির্দেশ দেন ছাত্রলীগের নেতারা। তিনি তাতে রাজিও হন। এরপরও তাকে ছাড়া হয়নি। নৃশংস ও নির্দয়ভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
হলের নিরাপত্তাকর্মী মোহাম্মদ মোস্তফা সে সময় দাবি করেন, প্রতি রাতেই শিক্ষার্থীরা নানা বিষয়ে কমবেশি হই-হুল্লোড় করেন। কিন্তু রবিবার রাতে তিনি কোনো চিৎকার শোনেননি। বিষয়টি গভীর রাতে জানতে পারেন তিনি।
ঘটনার বিষয়ে পরদিন হলের প্রভোস্ট জাফর ইকবাল খান জানান, এক শিক্ষার্থী হলের সামনে পড়ে আছে খবর পেয়ে তিনি দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। শরীরে আঘাতের চিহ্ন পেয়ে তিনি সঙ্গে সঙ্গে পুলিশে খবর দেন।
সিসিটিভি ফুটেজে হামলাকারীদের মুখ : হাতে আসা প্রায় দেড় মিনিটের একটি ফুটেজে দেখা যায়, আবরারকে মারধরের পর কক্ষ থেকে বের করা হচ্ছে। প্রথমে একজন বারান্দা দিয়ে কিছুটা দৌড়ে এসে সামনে দাঁড়ান। এরপর তিনি একই পথে ফিরে যান। কিছুক্ষণ পর আরও তিনজনকে দেখা যায়, যারা আবরারকে চ্যাংদোলা করে নিয়ে যাচ্ছেন। ওই তিনজনের পেছনে আরও একজনকে হাঁটতে দেখা যায়। এর পরই চশমা পরা একজন প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে বেরিয়ে আসেন। এর পরপরই আরও পাঁচজনকে ওই বারান্দা দিয়ে পেছনে হাঁটতে দেখা যায়। তাদের একজন আবার মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন। বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের একটি সূত্র জানিয়েছে, ফুটেজে দেখতে পাওয়া ছাত্রদের মধ্যে নেতা ছাড়াও কর্মীও রয়েছেন। পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওই ফুটেজটি ছাড়া আর কোনো সিসিটিভিতে ঘটনা ধরা পড়েছে কি না তা যাচাই করা হচ্ছে।
টর্চারসেলে যাদের যাতায়াত ছিল : ২০১১ নম্বর কক্ষটিতে থাকতেন বুয়েটের তৎকালীন উপ-আইন বিষয়ক সম্পাদক অমিত সাহাসহ ছাত্রলীগের চার নেতা। হলের শিক্ষার্থীরা বলেছেন, ওই কক্ষটি বুয়েট ছাত্রলীগের নির্যাতন কেন্দ্র হিসেবেই ব্যবহার হতো। অন্য নেতারাও নিয়মিত আড্ডা দিতেন সেখানে। ৭ অক্টোবর রাতে আবরারের ওপর নির্যাতনের সময় ওই কক্ষে বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল ছাড়াও সহসভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদ, সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন, আইনবিষয়ক উপসম্পাদক ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র অমিত সাহা, উপ-দফতর সম্পাদক ও কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র মুজতাবা রাফিদ, সমাজসেবা বিষয়ক উপসম্পাদক ও বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র ইফতি মোশারফ সকাল, উপসম্পাদক আশিকুল ইসলাম বিটু, ক্রীড়া সম্পাদক নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র মিফতাউল ইসলাম জিয়ন, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এবং মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র অনিক সরকার, সদস্য মুনতাসির আল জেমি, এহতেশামুল রাব্বী তানিম ও মুজাহিদুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। তারা সবাই আবরারকে নির্যাতনে অংশ নেন। এর আগে মাঝে মধ্যেই ছাত্রদের আটকে নির্যাতন করা হতো। নারকীয় খেলায় লিপ্ত হতেন বুয়েটের সেই নৃশংস অমানবিক মেধাবী ছাত্ররা।

 

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More