সাধারণ রোগে ভর্তি হয়ে আক্রান্ত হচ্ছেন করোনায় : সেবা না পেয়ে  হাসপাতাল থেকে পালাচ্ছেন করোনা রোগী

স্টাফ রিপোর্টার: জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান বার্ধক্যজনিত নানা অসুখে ভুগছিলেন। ২৭ এপ্রিল অসুস্থতা বোধ করলে তাকে ভর্তি করা হয় রাজধানীর ইউনিভার্সেল কার্ডিয়াক হাসপাতালে। তার হার্ট, কিডনি, ফুসফুস, উচ্চ রক্তচাপ, পারকিনসন ডিজিজসহ নানা শারীরিক জটিলতা ছিলো। এ হাসপাতাল থেকে পরে তাকে সিএমএইচে নেয়া হয়। সেখানে ১০ মে তার নমুনা নিয়ে করোনা পরীক্ষা করা হয়। তখন করোনা নেগেটিভ এসেছিলো। কিন্তু বৃহস্পতিবার ৪টা ৫৫ মিনিটে মৃত্যুর পর নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করা হলে তার শরীরে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়। শুধু অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের ক্ষেত্রেই নয়, এর আগে সাবেক এক বিমান বাহিনী কর্মকর্তাও হাসপাতালে গিয়ে আক্রান্ত হন করোনাভাইরাসে। তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে আজগর আলী হাসপাতালে ভর্তি হন। ভর্তির দিন তার করোনা পরীক্ষায় নেগেটিভ আসে। তিন দিন পর তার মৃত্যুর পর ফল আসে পজিটিভ। অবশ্য এর মধ্যে হাসপাতাল পরিবর্তন করা হয়েছিলো।

হাসপাতালে গিয়ে করোনা আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির পর সেখান থেকে চলে আসার ঘটনাও বাড়ছে। খোদ স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাবে, তিন দিনে ৬৬ জন করোনা রোগী হাসপাতাল থেকে চলে গেছেন। সুস্থ হওয়ার আগেই তারা হাসপাতাল থেকে চলে গেছেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, ভয়ভীতি-আতঙ্কে রোগীরা হাসপাতাল ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। কেউ মনে করেন, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে অনেকে আস্থা পাচ্ছেন না। যদিও স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাবে হাসপাতাল ছেড়ে যাওয়াদের পলাতক হিসেবে দেখানো হচ্ছে। ঢাকার চারটি সরকারি হাসপাতাল থেকেই এভাবে করোনা রোগী চলে যাওয়া ও পালানোর তথ্য পাওয়া গেছে। প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, হাসপাতালগুলোয় সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা নেয়ার ক্ষেত্রে কিছু ঝুঁকি তো আছেই। হাসপাতালগুলোকে অন্যান্য রোগ নিয়ে যে রোগীরা আসবেন তাদেরও চিকিৎসা দিতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকেও নির্দেশনা জারি রয়েছে। করোনা আক্রান্ত ছাড়া আরও অন্যান্য রোগী আছে। আগে হাসপাতালগুলোর আউটডোর ও ইনডোর সব স্থানে রোগী ভর্তি থাকতো। কিন্তু এখন সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা পেতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। এ ছাড়া ঢাকার বাইরের জেলাগুলো থেকে পরিবহন চলাচল বন্ধ থাকায় রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসতেও পারছে না। তবে সাধারণ রোগীরা যে বিভিন্ন হাসপাতালে যাচ্ছে সেখানে অনিয়ম হচ্ছে। চিকিৎসা নেয়ার জন্য এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরতে গিয়ে অনেক রোগী মারাও যাচ্ছে। চিকিৎসকদের এজন্য সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা দিতে হবে। করোনা ছাড়াও হৃৎপিন্ড, লিভার, কিডনি ও বিভিন্ন ধরনের জ্বরের রোগী আছেন। কভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসার জন্য অনেক হাসপাতাল সরকার নিয়েও নিয়েছে। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় যেহেতু চিকিৎসকরা কিছুটা ভয় পাচ্ছেন সে কারণে তাদের জন্য পিপিইর ব্যবস্থা করতে হবে।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই-মাহবুব বলেন, করোনা রোগের তো কোনো চিকিৎসা নেই। যেসব করোনা আক্রান্ত রোগী হাসপাতাল থেকে ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছেন তাদের ঘরে আইসোলেশনে রাখলেই হতো। আমাদের বুঝতে হবে, যেহেতু আমাদের হাসপাতালগুলো ফাইভ স্টার মানের নয়, এগুলো সংক্রামক রোগের হাসপাতাল আর এ ধরনের হাসপাতালে স্বাভাবিকভাবে চিকিৎসক, নার্স ও রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকে। রোগে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে তারাও ভীত থাকে। আবার হাসপাতালে গিয়ে একজন করোনা নেগেটিভ রোগীর করোনা পজিটিভ হওয়ারও আশঙ্কা থাকে। তিনি কীভাবে আক্রান্ত হলেন তা নিয়ে কথা হতে পারে কিন্তু এটি অস্বাভাবিক নয়। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালগুলোয় এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই পারে। আবার অনেক সময় চিকিৎসকের মধ্যেও করোনা সংক্রমণ হতে পারে। এজন্য আমরা প্রথমেই বলেছিলাম যেখানে করোনা রোগীদের চিকিৎসা হবে সেখানে অন্য রোগীদের চিকিৎসা যাতে না করানো হয়। কিন্তু রূঢ় বাস্তবতায় এমনটি করা সম্ভব নয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) এবং বর্তমানে চর্মরোগ ও যৌনব্যাধি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. শহীদুল্লাহ সিকদার বলেছেন, অনেক রোগী কভিড নয়। সেই রোগী হাসপাতালে অন্য রোগের চিকিৎসা নিতে গিয়ে কভিডে আক্রান্ত হয়ে আবার নতুন সমস্যায় পড়লো। এ রকম একটা জটিল সমস্যা তৈরি হচ্ছে স্বাস্থ্যব্যবস্থায়। এটি খুবই অনাকাক্সিক্ষত। এটি আমরা চাই না। তিনি বলেন, ভয়ে অনেকেই হাসপাতালে যাচ্ছে না, রোগীরা মনে করছে হাতপাতালে গেলে যদি করোনা হয়ে যায়। এজন্য অনেকে যাচ্ছে না। হাসপাতাল একটা ভীতির জায়গা হয়ে যাচ্ছে। যেখানে হাসপাতাল হওয়ার কথা অসুস্থ মানুষের ভরসার স্থান। সেখানে হাসপাতাল ভয়ের কারণ হতে পারে না। তিনি বলেন, একটি বড় হাসপাতালে যেখানে হার্টের চিটিকৎসা হয়, ফুসফুসের চিকিৎসা হয়, নার্ভের চিকিৎসা হয়, চোখের চিকিৎসা হয়, সে হাসপাতালে কভিডের জন্য আলাদা উইং থাকা উচিত। সেখানে অবশ্যই অত্যন্ত কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে রোগ কীভাবে ছড়ায় তা হাসপাতালের কর্তাব্যক্তি থেকে চিকিৎসক, অধ্যাপক, জুনিয়র চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী সবাইকে জানতে হবে। একইভাবে রোগী ও তার সঙ্গের লোকজন ও আত্মীয়স্বজনকেও জানতে হবে রোগ কীভাবে ছড়ায়। অধ্যাপক ডা. মো. শহীদুল্লাহ সিকদার বলেন, হাসপাতালে রোগী এলে আলাদা উইং তথা আলাদা এমন একটা জায়গা রাখতে হবে যেটা কভিডও নয়, আবার নন-কভিডও নয়। একটি মাঝামাঝি জায়গায়। রোগীর যদি কভিড পরীক্ষা করা থাকে, তবে তাকে ফলোআপ করে কভিডে নিতে পারেন, আর যদি পরীক্ষা না করা থাকে তবে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে পারি যে তার কভিড নেই। তখন তাকে আমরা নন-কভিড জায়গায় নিশ্চিন্তে চিকিৎসা দিতে পারি। তবে তিনি আর কভিড ছড়াবেন না। এ রকম একটি বিধিসম্মত স্বাস্থ্যব্যবস্থা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি ছিলো। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা তা করতে ব্যর্থ হচ্ছি। হয় আমাদের বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের ঘাটতি অথবা আমাদের আন্তরিকতার ঘাটতি রয়েছে।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More