সন্ধ্যায় আঘাত হানতে পারে সুপার ঘূর্ণিঝড় আম্পান : উপকূলে মহাবিপদ সংকেত

 

সুন্দরবন অতিক্রম করতে পারে ঝড়ের মূল কেন্দ্র : উপকূলীয় ১৪ জেলায় সতর্কতা জারি : ৫-১০ ফুট জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা

স্টাফ রিপোর্টার: সুপার ঘূর্ণিঝড় আম্পান আজ বিকেল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে বাংলাদেশের উপকূলে আছড়ে পড়তে পারে। এর আগে দুপুরের পর এটি আঘাত হানতে পারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং উড়িষ্যা উপকূলে। পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুরের দিঘা থেকে বাংলাদেশের নোয়াখালী জেলার হাতিয়া দ্বীপের মাঝখানে পড়েছে আম্পানের গতিপথ। গোটা উপকূলের যে কোনো স্থান দিয়ে ঝড়টির মূল কেন্দ্র বা চোখটি উঠতে পারে উপকূলে। যদিও দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সংস্থার বিশেষজ্ঞরা কম্পিউটার মডেল বিশ্লেষণ করে বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের দিঘাসহ বাংলাদেশের সুন্দরবনের উপর দিয়ে মূল কেন্দ্র বা চোখ উপকূল অতিক্রম করতে পারে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব শেষরাত থেকেই পড়েছে বাংলাদেশের উপকূলে। বইছে প্রচ- ঝড়ো হাওয়া। তা ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। উন্মত্ত আম্পানের প্রভাবে মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরে ৭ নম্বর মহাবিপদ সংকেত জারি করা হয়েছে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে জারি করা হয়েছে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত।

বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. একেএম সাইফুল ইসলাম বলেন, ২১ বছর পর বঙ্গোপসাগরে সুপার ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হলো। বর্তমান শতাব্দীর প্রথম সুপার ঘূর্ণিঝড় হচ্ছে আম্পান। এর আগে ১৯৯৯ সালে উড়িষ্যায় আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড়টি ছিলো ‘সুপার সাইক্লোন’। তিনি মার্কিন যৌথ টাইফুন সতর্কতা কেন্দ্র ও ফিলিপাইনভিত্তিক জয়েন্ট টাইফুন ওয়ার্নিং সেন্টারের (জেটিডব্লিউসি) বরাত দিয়ে বলেন, এটিকে বঙ্গোপসাগরের রেকর্ড করা ঘূর্ণিঝড়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হিসেবেও চিহ্নিত করা যায়। এর আগে ১৯৭০ সালের ভোলা ঘূর্ণিঝড়, ১৯৯১ সালের বরিশাল ঘূর্ণিঝড় এবং ২০০৭ সালের সিডরকে ভয়ংকর হিসেবে মানুষ স্মরণ করে। কিন্তু সেগুলোর সর্বোচ্চ গতি ছিলো ২২০ থেকে ২৪০ কিলোমিটার। আর আম্পানের বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ২৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত উঠেছিলো। এটি আটলান্টিক মহাসাগরের হ্যারিকেন ক্যাটাগরি-৪ এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের সুপার টাইফুনের সঙ্গে তুলনা করা যায়। তবে বর্তমানে এর শক্তি কমতির দিকে। আঘাত হানার সময়ে এটি ক্যাটাগরি-৩ পর্যায়ের ‘অতি প্রবল’ ঘূর্ণিঝড় রূপে থাকতে পারে। মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে এটি ২৪১ কিলোমিটার গতির বাতাসের বেগ নিয়ে উড়িষ্যা উপকূলের দিকে এগোচ্ছিলো। ২২১ কিলোমিটারের উপরে বাতাসের গতি হলে সেটিকে সর্বোচ্চ মাত্রার বা ক্যাটাগরি-৫ পর্যায়ের ‘সুপার’ ঘূর্ণিঝড় বলা হয়।

ঘূর্ণিঝড়ের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের সব ধরনের পণ্য উঠানামা মঙ্গলবারই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। জাহাজগুলো পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে বহির্নোঙ্গরে। দুর্গতদের সহায়তায় ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। জনগণকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি খোলা হয়েছে ১২ হাজারের বেশি আশ্রয় কেন্দ্র। আশ্রয় কেন্দ্রে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে সাধারণ আশ্রয় নেয়া মানুষের জন্য ইফতারসহ রাতের খাবার এবং সেহরির ব্যবস্থা করা হয়েছে। আম্পান মোকাবেলায় মোতায়েন করা হয়েছে যুদ্ধজাহাজ ও ল্যান্ডিং ক্রাফট।

আম্পান সঙ্গে নিয়ে আসছে জলোচ্ছ্বাস, ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাত এবং প্রচ- ঝড়ো হাওয়া। ঘূর্ণিঝড়ের তীব্র থেকে অতি তীব্র ঝড়ো হাওয়া চলারপথে ল-ভ- করে যায় জনপদ। ২২ মে অমাবশ্যা থাকায় আম্পানের সঙ্গে ৫ থেকে ১০ ফুট জলোচ্ছ্বাসও হতে পারে। আম্পান বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট এ শতাব্দীর প্রথম ‘সুপার সাইক্লোন’। এর আগের দানবীয় সিডরও সাগরে থাকাকালে ‘সুপার ঘূর্ণিঝড়’ আকারে ছিলো না। সেটি ছিলো অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়রূপে। যদিও সিডর-পরবর্তী সময়ে এর সর্বোচ্চ ২২৩ কিলোমিটার ঝড়ো হাওয়ার রেকর্ড পাওয়া যায়। তবে আম্পান উপকূলের যতো কাছে আসবে, এর শক্তি তত পড়তে পারে। সেই ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত আম্পান ‘অতি প্রবল’ বা ‘প্রবল’ ঘূর্ণিঝড় হিসেবে আঘাত হানতে পারে। উপকূলে আঘাত হানার সময়ে এর বাতাসের গতি ১৬০ থেকে ১৮৫ কিলোমিটার পর্যন্ত থাকতে পারে।

আম্পানের প্রভাবে ইতোমধ্যে অস্থির হয়ে উঠেছে বঙ্গোপসাগর। মঙ্গলবার দুপুর থেকেই উপকূলীয় বিভিন্ন জেলায় ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ধীরে ধীরে ঢাকাসহ দেশের দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলের আকাশ হালকা-ধূসর মেঘে ছেয়ে যায়। শুরু হয় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। ঘূর্ণিঝড়ের ভয়ংকর রূপের কারণে মঙ্গলবার দুপুর ১২টার বুলেটিনে আবহাওয়া বিভাগ (বিএমডি) মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরে ৭ নম্বর মহাবিপদ এবং চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত জারি করেছিলো। পরে বেলা ৩টার দিকে আম্পানের শক্তি কিছুটা কমে এলে ‘মহাবিপদ’ সংকেত নামিয়ে শুধু ‘বিপদ’ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয় মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে। তবে আজ ভোর থেকে মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরে ‘মহাবিপদ’ সংকেত জারি থাকবে বলে মঙ্গলবার ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান।

ভারতীয় আবহাওয়া সংস্থা (আইএমডি) এবং জয়েন্ট টাইফুন ওয়ার্নিং সেন্টারের (জেটিডব্লিউসি) তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার দিনে আম্পানের ঘণ্টায় গতি ছিলো ১২ থেকে ১৬ কিলোমিটার। এটি যতই উপকূলের কাছে পৌঁছাতে থাকে, ততই গতি এবং শক্তি কমতে থাকে। মঙ্গলবার মধ্যরাতে ঝড়ের অগ্রবর্তী অংশ প্রথম পৌঁছায় উড়িষ্যা উপকূলে। পরে সেটি ডান দিকে বা উত্তর-পূর্ব দিকে বেঁকে ধেয়ে যায় পশ্চিমবঙ্গ উপকূলে। উপকূলের কাছে আসার আগেই এর গতি আরও কমে যায়। কম্পিউটারের মডেল বিশ্লেষণ করে আবহাওয়াবিদরা বলেছেন, আজ দুপুর বা বিকেলের দিকে পশ্চিমবঙ্গে এবং বিকাল বা সন্ধ্যায় বাংলাদেশের উপকূলে আছড়ে পড়তে পারে আম্পান।

আর বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম আইএমডির বরাত দিয়ে বলেন, আছড়ে পড়ার সময় আম্পানের শক্তি কিছুটা কমে তা প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে। তখন ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ ঘণ্টায় ১৬৫ থেকে ১৮৫ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এ মাত্রার ঘূর্ণিঝড়কে বলা হয় ‘অতি প্রবল’ ঘূর্ণিঝড়। তিনি বলেন, মনে হচ্ছে, সিডরের মতোই এবারও সুন্দরবনের কারণে আমরা বেঁচে যাচ্ছি। ঝড়ের মূল অংশটি সুন্দরবনের ভেতরে উঠতে পারে।

এদিকে বিএমডি মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টার ২৭ নম্বর বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, সুপার সাইক্লোন আম্পানের শক্তি কিছুটা কমেছে। এটি ওইসময়ে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় আকারে পশ্চিম মধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। এটি সন্ধ্যা ৬টায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৭৭৫ কিলোমিটার দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৭৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিমে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৬৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৬৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছিলো। এটি আরও উত্তর, উত্তর-পূর্বদিকে অগ্রসর হয়ে খুলনা ও চট্টগ্রামের মধ্যবর্তী অঞ্চল দিয়ে আজ বিকাল বা সন্ধ্যার মধ্যে বাংলাদেশ উপকূল অতিক্রম করতে পারে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৮৫ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের টানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া আকারে ২২০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের কাছে সাগর খুবই বিক্ষুব্ধ আছে।

এ কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর ও এসব জেলার অদূরবর্তী দ্বীপ এবং চরগুলোও ৭ নম্বর বিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে।

এছাড়া চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় জেলা নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এবং এসব জেলার অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলোতেও ৬ নম্বর বিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।

বিএমডি ১৪টি জেলায় প্রচ- ঝড়ো হাওয়া ও জলোচ্ছ্বাসের সতর্কতা জারি করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে এ প্রসঙ্গে বলা হয়, ঘূর্ণিঝড় এবং অমাবস্যার প্রভাবে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম ও তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ এবং চরগুলোর নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৫-১০ ফুট অধিক উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে।

ঘূর্ণিঝড় অতিক্রমকালে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম জেলায় এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহে ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণসহ ঘণ্টায় ১৪০-১৬০ কিলোমিটার বেগে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে।

এছাড়া উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে অতি সত্ত্বর নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড়ের ৫টি ক্যাটাগরি আছে। পঞ্চম বা সবচেয়ে ভয়ংকর রূপটির নাম ‘সুপার সাইক্লোন’। বাতাসের গতি যখন ঘণ্টায় ২২১ কিলোমিটারের উপরে থাকে তখন সেটিকে সুপার সাইক্লোন বলে। চার নম্বর ক্যাটাগরি হচ্ছে এক্সট্রিম সিভিয়ার সাইক্লোন। এর বাতাসের গতি থাকে ১৬৬-২২০ কিলোমিটার। তৃতীয় পর্যায়েরটির নাম ভেরি সিভিয়ার সাইক্লোন। এর বাতাসের গতি থাকে ১১৮-১৬৫ কিলোমিটার। দ্বিতীয় ক্যাটাগরির নাম সিভিয়ার সাইক্লোন। এর বাতাসের গতি ৮৯-১১৭ কিলোমিটার। আর প্রথম ক্যাটাগরির ঘূর্ণিঝড়ে বাতাসের গতি থাকে ৬৫-৮৮ কিলোমিটার। সাগরে আম্পানের বাতাসের গতি ২৭৫ কিলোমিটার পর্যন্ত উঠেছিল। এর গতি এখন কমতির দিকে। আঘাত হানার সময়ে এটি ১৬৫ থেকে ১৮৫ কিলোমিটার হতে পারে। সেই হিসাবে এটি ক্যাটাগরি-৩ বা অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়।

প্রস্তুত ১৭৫৭টি মেডিকেল টিম : ঘূর্ণিঝড় আম্পান মোকাবেলায় প্রস্তুত ১ হাজার ৭৫৭টি মেডিকেল টিম। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অ্যান্ড কন্ট্রোল রুম এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। পাশপাশি দুর্গত এলাকার স্বাস্থ্য বিভগের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের সহকারী পরিচালক (হেলথ ইমার্জেন্সি অ্যান্ড কন্ট্রোল রুম) ডা. আয়শা আক্তার বলেন, এ পর্যন্ত চারটি বিভাগের ১৯ জেলার ১৪০টি উপজেলায় আম্পান মোকাবেলায় অধিদফতর থেকে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এরমধ্যে ১ হাজার ৪৫৮টি ইউনিয়নে ৮ হাজার ৪৫৭টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব এলাকায় স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের জন্য ১ হাজার ৭৫৭টি মেডিকেল টিম প্রস্তুত করা হয়েছে। মেডিকেল অফিসার/সহকারী সার্জন, সিনিয়র স্টাফ নার্স, মিডওয়াইফ, উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, স্বাস্থ্য সহকারী, সিএসইচসিপি ও অন্যান্য কর্মচারীদের নিয়ে মেডিকেল টিম গঠিত হয়েছে। যে ১৯টি জেলায় বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে সেগুলো হল- ঢাকা বিভাগের ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর জেলা। চট্টগ্রাম বিভাগের চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর জেলা। খুলনা বিভাগের খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট জেলা। বরিশাল বিভাগের বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, পিরোজপুর এবং ঝালকাঠি জেলা।

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, জেলা প্রশাসন উপকূলীয় উপজেলায় ও নগরীতে ৪ হাজার ৪৬টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত করেছে। একইভাবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনও ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। এদিকে মঙ্গলবার বিকালে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হয়। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন রয়েছে। পতেঙ্গায় সাগরের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে। পাহাড় সমান উঁচু উঁচু ঢেউ আছড়ে পড়ছে তীরে। খুলনা ব্যুরো জানায়, ঘূর্ণিঝড় আম্পানে সৃষ্ট জোয়ারে বাঁধ ভাঙার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে খুলনা উপকূলের লাখো মানুষ। নাজুক বেড়ি বাঁধ ভেঙে যাওয়ার শঙ্কায় নির্ঘুম রাত পার করছে মানুষ। জেলার কয়রা, পাইকগাছা ও দাকোপের মানুষ ইতোমধ্যে আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়া শুরু করেছেন। বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় ২০ লাখ মানুষ বেড়ি বাঁধ ভাঙন আতঙ্কে রয়েছেন। বরিশাল ব্যুরো জানায়, ঘূর্ণিঝড় আম্পান থেকে জনসাধারণকে রক্ষায় বরিশালসহ গোটা উপকূলীয় এলাকায় মাইকিং করছেন ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) সদস্যরা। মঙ্গলবার ভোর থেকে নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতে জনসাধারণকে সচেতন করতে মাইকিং করা হয়। বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার মো. ইয়ামিন চৌধুরী জানান, উপকূলীয় এলাকায় বেশ কিছু ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ রয়েছে, সেসব এলাকার মানুষকে ইতোমধ্যে সতর্ক করা হয়েছে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তারা যেন আশ্রয় কেন্দ্রে পৌঁছে যান, সে বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। বরগুনা প্রতিনিধি জানান, আম্পান মোকাবেলায় মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলন করেছেন জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ। তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড় আম্পান পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী উদ্ধার তৎপরতাসহ ত্রাণ তৎপরতা পরিচালনার জন্য একটি যুদ্ধজাহাজ ও একটি ল্যান্ডিং ক্রাফট মোতায়েন রাখবে নৌ বাহিনী।বাগেরহাট প্রতিনিধি জানান, মঙ্গলবার সকালে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ জানান, করোনা পরিস্থিতির মধ্যে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানতে যাওয়ায় জেলার আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে আগের মতো লোক গাদাগাদি করে রাখা যাবে না। সবাইকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখেই আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে রাখা হবে। রামপাল (বাগেরহাট) প্রতিনিধি জানান, ঘূর্ণিঝড় আম্পান থেকে মানুষের জানমালের নিরাপত্তার লক্ষ্যে রামপাল উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।আমতলী ও তালতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি জানান, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে মঙ্গলবার মাইকিং ও স্বেচ্ছাসেবকরা কাজ করলেও উপকূলের জনগণ তা শুনছেন না।দশমিনা (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি জানান, উপজেলা প্রশাসন আশ্রয় কেন্দ্র ও শুকনো খাবার প্রস্তুত রেখেছেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার তানিয়া ফেরদৌস জানান, তেঁতুলিয়া নদী বেষ্টিত চরবোরহান ইউনিয়নের সম্পূর্ণ, দশমিনা ইউনিয়নের চরহাদি এবং বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে।মনপুরা (ভোলা) প্রতিনিধি জানান, সব নৌযান ও মাছ ধরার ট্রলার চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে উপজেলা প্রশাসন। বিচ্ছিন্ন চরের বাসিন্দাদের সর্তক করতে ও নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য মাইকিং করা হলেও তেমন সাড়া নেই তাদের।চরফ্যাশন প্রতিনিধি জানান, উপজেলা প্রশাসনের ইতোমধ্যে ঢালচর, কুকরিমুকরি, চর পাতিলা, চরহাছিনা, চর আলমচননিজামসহ ঝুঁকিপূর্ণ ১১টি চর থেকে ১ লাখ মানুষকে সরিয়ে আনার কাজ শুরু হয়েছে। মানুষদের সতর্ক করতে বিভিন্ন এলাকায় রেড ক্রিসেন্ট ও সিপিবির কর্মীরা মাইকিং করছেন।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More