আকাশ সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ায় বাংলা লোকনাট্যের ঐতিহ্য রংমহল পুতুল নাচ যাত্রা আজ বিলুপ্তি

 

কবীর দুখু মিয়া: আকাশ সংস্কৃতি গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ায় বাংলা লোকনাট্যের ঐতিহ্যাসিক চুয়াডাঙ্গার মর্তুজাপুরের রংমহল পুতুল নাচ যাত্রা আজ বিলুপ্তির। চুয়াডাঙ্গা জেলায় এই পুতুল নাচ লোকনাট্যের একটি প্রাচীন মাধ্যম। পৃষ্ঠাপোষকতার অভাবে চুয়াডাঙ্গার মর্তুজাপুরের লোক সংস্কৃতির অন্যতম ধারক এই রংমহল পুতুল নাচ এখন আর চোখেই পড়ে না। অথচ একটা সময় ছিলো তখন কোনো চিত্র বিনোদন ছিলো না, তখন মানুষের আনন্দ আর চিত্তা বিনোদনের জন্য গ্রামাণী ঐতিহ্যবাহি গড়ে ওঠে পুতুল নাচ। দেশের বিভিন্ন গ্রামীণ মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিলো পুতুল নাচ। যুগের বির্বতনের সাথে সাথে মানুষেরও পরিবর্তন ঘটেছে। আজোও যা আধুনিক কাল তা পুরাতন। তারপরও পারিবারিকভাকে এবং নিত্যান্ত ব্যক্তিগত আগ্রহের ফলে দেশে টিকে আছে কয়েকটি পুতুল নাচ। রং মহল পুতুল দলের স্বত্বাধিকারী চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের মর্তুজাপুর গ্রামের মরহুম বিশারত মিয়া। তিনি ১৯৮০ সালে দিকে রংমহল পুতুল নাচের দল নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে যাত্রা মঞ্চ পালা করে। মরহুম বিশারত মিয়ার পরিবারের সদস্যরা অবেগ জড়ানো কন্ঠে সাংবাদিককে জানায়, পুতুল নাচ যাত্রা মঞ্চ নাটক করা আমাদের ব্যবসা নয়। পুতুল নাচে ছিল দেশ প্রেম আর ভালবাসা। আমরা দেখেছি গভীর রাতে যখন সতী বেহুলার যাত্রা পালায় পুতুল নাচ দেখানো হয়তো হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কেদে চোখের পানি ঝরে পড়ত। আবার পুতুলের জোকার কমিডি দেখে হাসতেন পুতুল নাচ পরিদর্শকেরা। চুয়াডাঙ্গার মর্তুজাপুর গ্রামের রং পুতুল নাচ দলের স্বত্বাধিকারী মরহম বিশারত মিয়ার ছেলে আমিরুল ইসলাম জানায়, ১৯৭৯ সালে দিকে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার সাধুহাটি ইউনিয়নের আসাননগর গ্রামের মরহুম রেজাউল হক তরফদার প্রথম পুতুল নাচ আবিষ্কার করে। ভারতের নদীয়া জেলার ভার্সকর শ্রী.বাসদেব ও নিমাই সন্ন্যসীর সহযোগীতায় বিভিন্ন বিল বাওড় থেকে শোলা সংগ্রহ করে ৭৯টি শোলার পুতুল তৈরি করে পুতুল। প্রতিটি পুতুলের পেছনে সেই সময় অর্থ ব্যায় হয় প্রায় ৩ হাজার টাকা করে। ৭৯টি পুতুলে খরচ ব্যায় দাড়ায় প্রায় দেড় লাখ টাকার ওপরে। পুতুল নাচ যাত্রা ও পালার করার জন্য তৈরি করা হয় রাজা, রাণী, ঘোড়া, বানর, বাঘ, হাতি,সাপ, গলাকাটা র্শিষ, কালি, গনেশ, কমিডিয়ান জোকার, সার্কাসসহ বিভিন্ন অভিনয়ের জন্য পৃথক পৃথক পুতুল। রাখা হয় বড় কাঠের বাক্সে। ১৯৮০ সালে মরহুম রেজাউল হক তরফদার ভারতীয় নিমাই সন্ন্যসীর আয়োজনে ঝিনাইদহের সাধুহাটির বোড়াই আখ সেন্টার সংলগ্ন মাঠে প্রথম সতী বেহুলার পুতুল নাচ যাত্রা পালা মঞ্চ উদ্বোধন করে। পরে মরহুম রেজাউল হক তরফদারের পুতুল নাচ দলটি বিক্রি করে দেয় চুয়াডাঙ্গা সদরের মর্তুজাপুর মরহুম বিশারত মিয়ার কাছে। তিনি এ পুতুল নাচ দলটির স্বত্বাধিকারী মালিক হন। দীর্ঘ ১৭ বছর একটানা দেশের বিভিন্ন স্থানে পুতুল নাচ যাত্রা পরিচালনা করে আসে। পুতুল নাচের ম্যানেজার মর্তুজাপুর গ্রামের মৃর্ত. খোরশেদ মন্ডলের ছেলে আব্দুল বারি মন্ডল জানায়, আমরা পুতুল নাচ দলটি ক্রয়ের পর মালিকের নামের পাশে রং মহল পুতুল নাচ সম্পাদনা করে নিই। মেলা বা গ্রামাঞ্চলে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে রাতে যাত্রা মঞ্চ তৈরি করে নিমাই সন্ন্যসী, রুপবান, রাজা হরিশ্চন্দ্র সাইব্যা, সতী বেহুলা, নৌকা বিলাসসহ বিভিন্ন যাত্রা পালাগান টিকিটের মাধ্যমে গ্রাম বাংলার মানুষের মাঝে প্রদর্শন করে আসি। নাচনীয় মাষ্টার মর্তুজাপুর মৃত. বিসারত মিস্ত্রির ছেলে দাউদ হোসেন, শহিদুল ইসলাম, রাঙ্গাপোতা গ্রামের আবুল হোসেন, ঝিনাইদহের মাটিকুমড়রা গ্রামের আনা মুন্সী, চোরকোল গ্রামের সাবদুল, আলিয়ারপুর গ্রামের যাত্রা মাষ্টার উচমান আলি, হারমোনিয়াম মাষ্টার আয়ুব মন্ডল, ঢোলক বাদক চুয়াডাঙ্গা দৌলাদিয়াড় গ্রামের মো. ইসাহক, আলিয়ারপুরের শ্রী. রবীন্দ্র নাথ, মো. আজিবার মন্ডল, শ্রী. শম্ভুব কর্মকার, সরোজগঞ্জ বাজার বোয়ালিয়া গ্রামের মাইক প্রচার বাদল, আব্দুল আজিজ ও ডাকবাংলা বাথপুকুরিয়ার নৃত্য পরিচালক আব্দুল আজিজ দীর্ঘদিন ধরে পুতুল নাচ যাত্রা দলটি পরিচালনা করে আসছিলে। দেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চাদাবাজি বৃদ্ধি হওয়ায় রাতে পুতুল নাচ যাত্রা মঞ্চ পরিদর্শদ দেখতে সাধারণ মানুষ আসে না। সেই থেকে লাভের চেয়ে লোকশানে পথে যাওয়ায় রং মহল পুতুল নাচ যাত্রা দলটির মালিক মরহুম বিশারত মিয়া তা পরিদর্শদ বন্ধ করে দেয়। এব্যাপারে, মরহুম বিশারত মিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে জানায়, আমরা পুতুল নাচ যাত্রা দলটি বিক্রির পর নতুন করে ৫টি পুতুল নাচ যাত্রা দল তৈরি করি। এতে প্রতিটি পুতুল নাচ যাত্রা দলে আমাদের প্রায় ২লক্ষ টাকা ব্যায় হয়। পরে পুতুল নাচ দলটি চালাতে গিয়ে ঘরের টিনের ছাউনিও বিক্রি করতে হয়। পরিদর্শন করার সময় বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসীদের হামলা ও মারামারিতে পুতুল নাচ যাত্রা দলটি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। লোকশানের বোঝা মাথায় নিয়ে রং মহল পুতুল নাচ যাত্রা দলটি ১৯৯৭ সালে পরিদর্শন বন্ধ করে দেয়া হয়। আমরা রং মহল পুতুল নাচ যাত্রার সকল সমগ্র জিনিসপত্র ব্রাক্ষণবাড়িয়ার শরিফুল ইসলাম, ঝিনাইদহ জেলার বঙ্কিরা গ্রামের ফারুন হোসেন, খুলনা সাতক্ষীরার জহিরুল হক, সিরাজগঞ্জ দেবুর ও পাবনায় এক ব্যাক্তির নিকট বিক্রি করে দিই। পুতুল নাচ যাত্রা দলটি দেশের বিভিন্ন স্থানে এখনো চোখে দেখা মেলে। কিন্তু প্রকৃতি মালিকের নাম বাদ দিয়ে তারা নিজেরা তৈরী মালিক দাবি করে। বাংলাদেশে পুতুল নাচ যাত্রা দল তৈরীর একমাত্র মালিক ছিলেন মরহুম বিশারত মিয়া। পুতুল নাচ যাত্রা দল বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে সাংস্কৃতি নৃত্য বলেন, লোকজ এই মাধ্যমকে সরাসরি বাঁচানো সম্ভব না। বর্তমানের আঙ্গিকেই তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। যারা বাংলার লোকজ ধারা বজায় রেখে পুতুল নাচের আধুনিকায়ন ঘটাবে।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More