প্রিয় শিক্ষার্থীরা,
তোমাদের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের দুয়ারে এসে দাঁড়িয়েছ তোমরা। এই সময়টা যেন এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতির-চোখে স্বপ্নের দীপ্তি, মনে হালকা অজানা শঙ্কা, আর বুকভরা প্রত্যাশা। একজন শিক্ষক হিসেবে আমি খুব কাছ থেকে অনুভব করি এই সময়ের নীরব কম্পন, এই পথচলার সূক্ষ্ম উত্তেজনা। তাই ভালোবাসা আর মমতার পরশ দিয়ে কিছু কথা বলতে চাই, যেন এই সময়টা তোমাদের জন্য একটু সহজ, একটু আলোকময় হয়ে ওঠে। এসএসসি পরীক্ষার একেবারে শেষ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো নিজেকে শান্ত রাখা এবং ইতিমধ্যে যা পড়েছো, সেগুলোকে মনের ভাঁজে যত্ন করে গুছিয়ে নেয়া। নতুন কিছু শুরু করার এই সময় নয়-এতে মন আরও বিভ্রান্ত হয়ে যেতে পারে। বরং যেসব গুরুত্বপূর্ণ টপিক, নোট আর সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন আগে পড়েছো, সেগুলো বারবার মনে করো-তাতে আত্মবিশ্বাস ধীরে ধীরে দীপ্ত হয়ে উঠবে। আগের বছরের বোর্ড প্রশ্নগুলো একটু দেখে নিলে প্রশ্নের ধরন সম্পর্কে একধরনের স্বচ্ছ ধারণা তৈরি হয়, যা পরীক্ষার হলে তোমাকে অনেকটাই নির্ভার রাখবে। পড়াশোনার জন্য একটি সুশৃঙ্খল রুটিন যেন তোমার প্রতিদিনের সঙ্গী হয়। দিনের সময়গুলো এমনভাবে ভাগ করে নাও, যাতে প্রতিটি বিষয়ের জন্য আলাদা করে যত্ন নেয়া যায়। কঠিন বিষয়গুলো আগে শেষ করার চেষ্টা করলে মনে চাপ অনেকটাই কমে আসে। শুধু পড়লেই হবে না-মাঝে মাঝে লিখেও অনুশীলন করো, কারণ এতে লেখার গতি ও উপস্থাপনা দুটোই মসৃণ হয়। গণিত ও ইংরেজির ক্ষেত্রে নিয়মিত লেখার অনুশীলন বিশেষ প্রয়োজন-গণিতে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করতে করতে নিজের দুর্বলতা চিনে নিতে শেখো, আর ইংরেজিতে বারবার লিখে আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলো। পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের মতো বিষয়গুলোতে শুধু মুখস্থ নয়, ধারণার গভীরে পৌঁছানোই সবচেয়ে বড় শক্তি। সূত্রগুলো বুঝে নিয়ে সেগুলোর প্রয়োগে অভ্যস্ত হও, দেখবে অচেনা প্রশ্নও আর ভয় জাগাবে না। তত্ত্বীয় অংশগুলো সংক্ষেপে গুছিয়ে পড়ার অভ্যাস গড়ে তুললে পরীক্ষার হলে সহজেই মনে পড়বে। বাংলা প্রথম পত্রের ক্ষেত্রে অনেকেই প্রথম পরীক্ষা বলে একটু বিচলিত হয়ে পড়ে, ফলে সময়ের সঠিক ব্যবহার করতে পারে না। তাই শুরু থেকেই সময় ভাগ করে উত্তর লেখার অভ্যাস গড়ে তোলো-যাতে কোনো জানা প্রশ্নও বাদ না পড়ে।
এই ব্যস্ত সময়ের মাঝেও মনকে স্রষ্টার দিকে নিবিষ্ট রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টার পর ফলাফলের ভার মহান আল্লাহর হাতে ছেড়ে দাও। তার কাছে সাহায্য চাও, প্রার্থনা করো-তোমার পরিশ্রম যেন সফল হয়, মন যেন শান্ত থাকে। এই আত্মসমর্পণ তোমাকে ভেতর থেকে শক্তি দেবে, অকারণ ভয় আর দুশ্চিন্তা অনেকটাই দূরে সরিয়ে দেবে।
শরীরের যত্ন নেওয়াও ঠিক ততটাই জরুরি। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মস্তিষ্ক ঠিকমতো কাজ করে না-তাই প্রতিদিন অন্তত ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করো। খাবারের দিকেও খেয়াল রাখো-অতিরিক্ত তেল-ঝাল বা ফাস্টফুড এড়িয়ে হালকা ও পুষ্টিকর খাবার খেলে শরীর ভালো থাকবে, মনও পড়াশোনায় স্থির হবে।
পরীক্ষার আগের দিন অতিরিক্ত চাপ না নিয়ে হালকা রিভিশন করাই ভালো। প্রয়োজনীয় জিনিস-যেমন অ্যাডমিট কার্ড, কলম ইত্যাদি-আগেই গুছিয়ে রাখো, যাতে পরীক্ষার দিন কোনো অস্থিরতা না থাকে। পরীক্ষার হলে গিয়ে প্রশ্ন ভালোভাবে পড়ে তারপর উত্তর দেওয়া শুরু করো। যেসব প্রশ্ন ভালো পারো, সেগুলো আগে লিখলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে, সময় ব্যবস্থাপনাও সহজ হয়।
সবচেয়ে বড় কথা-নিজের ওপর বিশ্বাস রাখো। সামান্য ভয় বা দুশ্চিন্তা থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই সফলতা ধরা দেয়। মনে রেখো, এই পরীক্ষা শুধু পড়াশোনার নয়-এটি ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস আর মানসিক দৃঢ়তারও এক অনন্য পরীক্ষা। তুমি যদি শেষ সময়টুকু সঠিকভাবে কাজে লাগাও, তবে ভালো ফলাফল তোমার নাগালেই থাকবে।
সবশেষে, তোমাদের জন্য রইল অন্তরের গভীর থেকে দোয়া ও ভালোবাসা। তোমাদের প্রতিটি পরিশ্রম যেন সার্থক হয়, প্রতিটি স্বপ্ন একদিন বাস্তবের আলোয় দীপ্ত হয়ে ওঠে-এই কামনাই করি। মনে রেখো, ফলাফল যাই হোক না কেন, তোমাদের চেষ্টা, সততা আর অধ্যবসায়ই তোমাদের আসল শক্তি। ভালো থেকো, আত্মবিশ্বাসী থেকো, আর নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ো না। তোমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য রইল অফুরন্ত শুভকামনা।
লেখক –
মোছাঃ আফরোজা খাতুন। সহকারী শিক্ষক(রসায়ন) প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও পরিশোধনকারী। মাস্টার ট্রেইনার(বিজ্ঞান)।এরশাদপুর একাডেমী।
মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.