দ্বিতীয় পদ্মা সেতু : দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

রহমান মুকুল
দীর্ঘদিনের অবহেলা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা আর উন্নয়ন বৈষম্যের কারণে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল সবসময়ই পিছিয়ে পড়া এক জনপদ হিসেবে চিহ্নিত। চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়া এই চার জেলার মানুষের জীবনযাত্রায় উন্নয়নের ছোঁয়া এসেছে ধীরে ধীরে। কিন্তু কাক্সিক্ষত অগ্রগতি এখনও অধরা। এই বাস্তবতায় দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর সম্ভাবনা নতুন করে আশার আলো জাগিয়েছে। সরকারি নীতিনির্ধারণী মহলের সর্বশেষ পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩২ সালের মধ্যে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, ২০৩৩ সালে দ্বিতীয় যমুনা সেতু এবং ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। সেতু বিভাগ ইতোমধ্যে নতুন পদ্মা সেতু নির্মাণের সম্ভাব্য স্থান হিসেবে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া করিডোর বিবেচনা করছে। অন্যদিকে যমুনা সেতুর সম্ভাব্য রুট হিসেবে বগুড়া-জামালপুর, গাইবান্ধার বালাসী ঘাট থেকে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জসহ একাধিক বিকল্প আলোচনায় রয়েছে। সেতু বিভাগের এক সাম্প্রতিক বৈঠকের নথি অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রাক্কলন এবং পরবর্তী দুই অর্থবছরের ব্যয়ের পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ। এমনকি সেতু বিভাগের সচিব জানিয়েছেন, দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর বিষয়ে প্রাথমিক সমীক্ষা (প্রাইমারি স্টাডি) ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। পুরনো একটি সমীক্ষা থাকলেও, নতুন করে আরও বিস্তারিতভাবে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে, যাতে সঠিক স্থানে সেতু নির্মাণ নিশ্চিত করা যায়।
যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন: দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। বর্তমানে ঢাকামুখী যাত্রায় সময় ও ব্যয়; দুই-ই বেশি লাগে। নতুন সেতুটি হলে ঢাকার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ আরও সহজ ও দ্রুত হবে। এর ফলে চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়ার মানুষ ব্যবসা, শিক্ষা ও চিকিৎসার জন্য সহজেই রাজধানীতে যেতে পারবে। বিশেষ করে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া বা বিকল্প কোনো করিডোর দিয়ে নতুন সেতু হলে ঢাকার সাথে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সংযোগ আরও শক্তিশালী হবে। এর মাধ্যমে মংলা বন্দর পর্যন্ত পণ্য পরিবহন সহজ হবে, সময় কমবে এবং পরিবহন খরচও হ্রাস পাবে।
মংলা বন্দরের সাথে সরাসরি সংযোগ: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো মংলা বন্দরের ব্যবহার বৃদ্ধি। নতুন পদ্মা সেতুর মাধ্যমে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে মংলা বন্দরের সরাসরি ও কার্যকর সংযোগ তৈরি হবে। ফলে এই বন্দর আরও সক্রিয় হয়ে উঠবে। চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়া অঞ্চলে বন্যা, প্লাবনের মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ নেই। ফলে এই জেলাগুলি থেকে পণ্য-বিশেষ করে কৃষিপণ্য, শিল্পপণ্য ও হালকা উৎপাদিত পণ্য-সহজেই মংলা বন্দরের মাধ্যমে রপ্তানি করা সম্ভব হবে। এতে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা সরাসরি লাভবান হবেন।
কৃষি ও শিল্পে নতুন সম্ভাবনা: এই অঞ্চলের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। নতুন সেতুর ফলে কৃষিপণ্যের দ্রুত পরিবহন নিশ্চিত হবে। ধান, পাট, সবজি ও অন্যান্য ফসল সহজে রাজধানী ও বন্দরমুখী বাজারে পৌঁছাতে পারবে। এতে কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পাবেন এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমবে। এছাড়া যোগাযোগ সহজ হলে এই অঞ্চলে শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে। বিনিয়োগকারীরা এখানে বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন। চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়ার মতো জেলায় ছোট ও মাঝারি শিল্প বিকাশের সুযোগ তৈরি হবে।
বিদেশি বিনিয়োগের নতুন দ্বার: দ্বিতীয় পদ্মা সেতু শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগই নয়, বিদেশি বিনিয়োগের জন্যও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সহজ বন্দর সংযোগ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করবে। বিদেশি কোম্পানিগুলো এখানে শিল্প স্থাপন করলে কর্মসংস্থান বাড়বে, প্রযুক্তি আসবে এবং স্থানীয় অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে উঠলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়বে।
কর্মসংস্থান ও জীবনমানের উন্নয়ন: নতুন সেতু নির্মাণ হলে শুধু পরিবহন নয়, কর্মসংস্থানেও বড় পরিবর্তন আসবে। স্থানীয় যুবকরা নতুন কাজের সুযোগ পাবেন। নির্মাণ, পরিবহন, লজিস্টিকস, ব্যবসা—সব ক্ষেত্রেই নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে।এর ফলে মানুষের আয় বাড়বে, জীবনমান উন্নত হবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগও আরও সহজ হবে।
মানসিক দূরত্বের অবসান: এই সেতু শুধু দুই প্রান্তের ভৌগোলিক দূরত্বই কমাবে না, বরং মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের মানসিক দূরত্বও দূর করবে। নদীর দুই কুলে বসবাসকারী মানুষ এখন আরও সহজে যোগাযোগ করতে পারবে। আত্মীয়তা, ব্যবসা ও সামাজিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে। এটি একটি প্রতীকী পরিবর্তন-যেখানে বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং সংযোগই হবে মূল শক্তি।
উন্নয়নের সুযোগ কাজে লাগাতে করণীয়: তবে শুধু সেতু নির্মাণ করলেই হবে না, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলবাসীকেও কিছু দায়িত্ব নিতে হবে। স্থানীয়দের দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা হতে উৎসাহিত হতে হবে। কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। পরিবেশ সংরক্ষণে সচেতন থাকতে হবে। স্থানীয় নেতৃত্বকে উন্নয়নমুখী পরিকল্পনায় এগিয়ে আসতে হবে।
শেষ কথা: দ্বিতীয় পদ্মা সেতু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য একটি সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে। এটি শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়-এটি হতে পারে উন্নয়ন, সংযোগ এবং সম্ভাবনার এক নতুন যুগের সূচনা। চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়ার মানুষ যদি এই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারে, তবে তাদের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন বঞ্চনার অবসান ঘটতে পারে। এই সেতু শুধু ইট-পাথরের স্থাপনা নয় এটি একটি নতুন ভবিষ্যতের সেতুবন্ধন, যা দুই কূলের মানুষের হৃদয়কেও এক সুতোয় বাঁধতে পারে।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More