চুয়াডাঙ্গায় দ্বিতীয় দিনে ‘ফুয়েল কার্ড’ বিতরণ : উপজেলা চত্বরগুলোতে দীর্ঘ লাইন
স্টাফ রিপোর্টার: চুয়াডাঙ্গায় জ্বালানি তেলের শৃঙ্খলা ফেরাতে জেলা প্রশাসনের নেয়া ‘ফুয়েল কার্ড’ সংগ্রহের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে প্রাণ হারালেন এক ব্যবসায়ী। গতকাল মঙ্গলবার সকালে আলমডাঙ্গা উপজেলা পরিষদ চত্বরে কার্ড পাওয়ার তীব্র আকাক্সক্ষা আর প্রচণ্ড ভিড়ের চাপে স্ট্রোক করে বখতিয়ার রহমান (৫০) নামে ওই ব্যক্তির মৃত্যু হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনার মধ্যেই গ্রাহকদের উপচে পড়া ভিড় সামাল দিতে এবং হাহাকার কমাতে কার্ড বিতরণের সময়সীমা আরও দুই দিন বৃদ্ধি করেছে প্রশাসন। আগামী ২ এপ্রিল পর্যন্ত কার্ড সংগ্রহ করা যাবে, তবে ৩ এপ্রিল থেকে কার্ড ছাড়া এক ফোঁটা তেলও মিলবে না কোনো যানবাহনে। লাইনের ভিড়ে ঝরলো প্রাণ, গতকাল সকাল থেকেই চুয়াডাঙ্গার চারটি উপজেলা পরিষদে ছিলো তিল ধারণের ঠাঁই নেই অবস্থা। ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন হাজার হাজার চালক ও মালিক। নতুন সময়সীমা ও কড়াকড়ি প্রাথমিকভাবে ৩০ ও ৩১ মার্চ কার্ড বিতরণের কথা থাকলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গ্রাহকদের ব্যাপক চাহিদা ও বিশৃঙ্খলা এড়াতে সময়সীমা বাড়িয়ে ২ এপ্রিল করা হয়েছে। ৩ এপ্রিল থেকে জেলার ২২টি পাম্পে কার্ড ছাড়া জ্বালানি সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে উপজেলা পরিষদগুলোতে কার্ড বিতরণ চলছে এবং তেল বিক্রির সময় নির্ধারণ করা হয়েছে সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। প্রয়োজনীয় নথিপত্র কার্ড পেতে গ্রাহকদের সংশ্লিষ্ট যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন নম্বর, চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি জমা দিতে হচ্ছে। প্রতিটি উপজেলা পরিষদে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে এই নথিগুলো জমা দিচ্ছেন গ্রাহকরা। কৃষকদের জন্য বিশেষ ছাড় কার্ড প্রথা চালু হলেও কৃষিখাতে এর কোনো প্রভাব পড়বে না। বোরো মরসুমের সেচ কাজের গুরুত্ব বিবেচনায় কৃষকদের জন্য এই নিয়ম শিথিল রাখা হয়েছে। কৃষি কাজে ব্যবহৃত ডিজেল আগের মতোই কার্ড ছাড়াই ২৪ ঘণ্টা পাম্প থেকে সংগ্রহ করা যাবে বলে নিশ্চিত করেছে জেলা প্রশাসন। চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বিএম তারিক উজ জামান বলেন, ‘ফুয়েল কার্ডের মূল উদ্দেশ্য হলো তেলের কালোবাজারি রোধ করা এবং পাম্পগুলোতে বিশৃঙ্খলা কমানো। কার্ড প্রথা চালু হলে প্রতিটি যানবাহনের জ্বালানি সংগ্রহের হিসাব থাকবে, যা ব্যবস্থাপনা স্বাভাবিক করতে সাহায্য করবে।’ একদিকে অব্যবস্থাপনায় প্রাণহানির শোক, অন্যদিকে কার্ড পাওয়ার অনিশ্চয়তা সব মিলিয়ে চুয়াডাঙ্গার জ্বালানি বাজার এখন এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনের এই নতুন সময়সীমা সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কতটা কমাতে পারে, এখন সেটাই দেখার বিষয়। ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ১ এপ্রিল থেকে শুধুমাত্র ফুয়েল কার্ডধারী যানবাহনেই জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হবে। প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত জেলার ২২টি পাম্পে একযোগে তেল বিক্রি চলবে এবং চাহিদা অনুযায়ী তেল প্রদান করা হবে। তবে কৃষকদের জন্য এ নিয়ম শিথিল রাখা হয়েছে। কৃষিকাজে ব্যবহৃত ডিজেল আগের মতোই ২৪ ঘণ্টা বিক্রি করা হবে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। এর আগে রোববার চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেনের সভাপতিত্বে জেলায় জ্বালানি তেলের মজুদ, পরিবহন, বিপণন ও ব্যবহার সংক্রান্ত এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ফুয়েল কার্ড বিতরণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং ১ এপ্রিল থেকে কার্ড ছাড়া তেল দেয়া হবে না বলে সিদ্ধান্ত হয়। এরই প্রেক্ষিতে গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে জেলাসহ সকল উপজেলায় কার্ড বিতরণ শুরু করা হয়। এ জেলা শহরে চালকদের ভিড়ে হিমশিম খেতে হয় ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরে মারামারির মতো ঘটনাও ঘটে। পরে দুপুরে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয় জেলার স্ব-স্ব উপজেলা থেকে কার্ড বিতরণ করা হবে। এমন খবরে ভোর রাত থেকে উপজেলা পরিষদ চত্বরে চালকরা ভিড় জমান। এতে দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি হয়।
আলমডাঙ্গা ব্যুরো জানিয়েছে, আলমডাঙ্গায় ফুয়েল কার্ড সংগ্রহ করতে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন বখতিয়ার হোসেন (৫৫) নামে এক ব্যবসায়ী। গতকাল মঙ্গলবার সকালে আলমডাঙ্গা উপজেলাচত্বরে ঘটে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা। বখতিয়ার উপজেলার ভেদামারি গ্রামের ছেলে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল থেকেই ফুয়েল কার্ড সংগ্রহের জন্য মানুষের উপচে পড়া ভিড় ছিল। রোদের তাপ ক্রমেই বাড়ছিল, আর সেই তীব্র গরমের মধ্যেই দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন বখতিয়ার হোসেন। অপেক্ষা যেন শেষ হচ্ছিল না। ক্লান্তি আর গরমে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছিল তার শরীর। হঠাৎ করেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সবার সামনে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। মুহূর্তেই চারপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়রা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে আলমডাঙ্গা শহরের ফাতেমা ক্লিনিকে নিয়ে যান। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর চিকিৎসক জানান সবকিছু শেষ। বখতিয়ার হোসেন আর নেই। চিকিৎসকদের ধারণা, তীব্র গরম ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। নিহত বখতিয়ার হোসেন উপজেলার ভেদামারী গ্রামের হাজি রফি উদ্দিন মোল্লার ছেলে। তিনি গ্রামে সার ও কীটনাশকের ব্যবসা করতেন। পরিবারের জন্য সংগ্রাম করতে করতে একদিন হঠাৎ করেই এভাবে চলে যাবেন এটা যেন কেউই মেনে নিতে পারছেন না। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। একেকজন যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না-সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়া মানুষটি আর ফিরবেন না। এ বিষয়ে আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার বলেন, ‘তিনি আগে থেকেই অসুস্থ ছিলেন। উপজেলা মাঠে ভিড় ও গরমের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে ক্লিনিকে নেয়ার পর তার মৃত্যু হয়। প্রাথমিকভাবে স্ট্রোকের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করছেন চিকিৎসক।’ আলমডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) বাণী ইসরাইল বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, তিনি অসুস্থ অবস্থায় ভিড়ের মধ্যে পড়ে যান। স্থানীয়রা দ্রুত তাকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যান। চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। বিষয়টি স্বাভাবিক মৃত্যু বলেই ধারণা করা হচ্ছে।’ একটি ফুয়েল কার্ডের লাইনে দাঁড়িয়ে জীবন শেষ হয়ে যাওয়ার এই ঘটনা শুধু একটি মৃত্যু নয়-এটি আমাদের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার এক নীরব সাক্ষী। মৃত্যুর পর লাশ গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বাদ আছর জানাজা শেষে লাশ গ্রামের কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
জীবননগর ব্যুরো জানিয়েছে, জীবননগর উপজেলায় ফুয়েল কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ভোর থেকে জীবননগর উপজেলা চত্বরে ফুয়েল কার্ড নিতে কাগজপত্র জমা দিতে দীর্ঘ লাইন শুরু হয়। ফুয়েল কার্ড সংগ্রহ করতে হাজারো মানুষের উপস্থিতি ঘটে। সকাল ১০টা থেকে জীবননগর উপজেলা প্রশাসনের তত্বাবধানে ড্রাইভিং লাইসেন্স ও গাড়ির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করা হয়। পরে দুপুর ২টা থেকে ফুয়েল কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়। ফুয়েল কার্ড নিতে আসা আরিফুল ইসলাম বলেন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে সকাল ৭টা থেকে ফুয়েল কার্ড নেয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছি। অনেক অপেক্ষার পরে কাগজপত্র সব জমা দেয়া হয়েছে। এখন বলছে দুইটার পর থেকে ফুয়েল কার্ড নিতে হবে। এই কার্ডের জন্য আজ সারাদিন কাজ কামাই গেলো। আসাদুর রহমান নামের একজন বলেন, আমার হার্টের সমস্যা আছে। এই দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে কাগজপত্র জমা দেয়া আমরা জন্য কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তবুও প্রয়োজনের তাগিদে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। জীবননগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আশরাফুল আলম রাসেল জানান, মানুষের সুবিধার্থে জীবননগর উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় ৫টি বুথের মাধ্যমে ফুয়েল কার্ডের জন্য কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে জমা নেয়া হচ্ছে। ৫টি পৃথক জায়গা থেকে কাগজপত্র জমা নেয়ার কারণে জনগণের দুর্ভোগ কিছুটা লাঘব হয়েছে। সারাদিনে মোট ২ হাজার কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। তাছাড়াও যারা আজকে কার্ড জমা দিতে পারেননি তাদের বিষয়ে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
এদিকে দীর্ঘ অপেক্ষার পর বিকেল ৪টা থেকে কার্ড বিতরণ শুরু হয়। ফুয়েল কার্ড হাতে পেয়ে উচ্ছ্বাসিত হতে দেখা গেছে অনেকের। কেউ কেউ বলেছেন ফুয়েল কার্ড না এ যেনো সোনার হরিণ হাতে পেলাম। ফুয়েল কার্ড হাতে পাবার পরেও পাম্পে চাহিদা মোতাবেক তেল পাওয়া নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকে।
দামুড়হুদা অফিস জানিয়েছে, চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলায় ফুয়েল কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু করেছে উপজেলা প্রশাসন। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে আনুষ্ঠানিকভাবে এ কার্যক্রম শুরু হয়। উপজেলা পরিষদ চত্বরে ৫টি বুথে সরকারি বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তা, ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা নিয়ে ফুয়েল কার্ড বিতরণ করা হয়। ফুয়েল কার্ড সংগ্রহ করতে ভোর রাত থেকেই নিজ নিজ যানবাহনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে উপজেলা পরিষদে ভিড় জমান মোটরসাইকেল ও যান চালকেরা। ফলে সকাল থেকেই দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে কার্ড সংগ্রহ করতে দেখা যায় তাদের। পরে উপজেলা প্রশাসন সুবিধার্থে ইউনিয়ন ভিত্তিক ভাগ করে সকাল ৮টা থেকে যানবাহনের বৈধ কাগজপত্রের ফটোকপি জমা নিয়ে জেলা প্রশাসক স্বাক্ষরিত কার্ড বিতরণ শুরু করে। এ সময় লাইনের বাইরেও কার্ড বিতরণ নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। তবে কার্ড পেয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন উপকারভোগীরা। দামুড়হুদা উপজেলার সুবলপুর গ্রামের আবুবক্কার মাস্টার জানান, তিনি ভোর ৪টার দিকে এসে লাইনে দাঁড়ান এবং সকাল ৮টার দিকে কার্ড হাতে পান। তিনি বলেন, ‘এই কাডের মাধ্যমে তেল সংগ্রহ করা অনেক সহজ হবে। উপজেলার বদনপুর গ্রামের বাসিন্দা আরিফ বিশ্বাস জানান, এই উদ্যোগ চালকদের জন্য বেশ সহায়ক হবে। ভুক্তভোগী মোমিনুল ইসলাম বিপু বলেন, আমি উপজেলা সমাজসেবা অফিসের বুথে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। দুপুর হলেও যেখানে দাড়িয়ে ছিলাম সেখানেই ছিলাম, একটুও লাইন এগোইনি। বিভিন্ন পাশ থেকে বহিরাগত দের কাগজপত্র জমা দেয়া হচ্ছিল। এটা বন্ধ হলে আমাদের ভোগান্তি কম হতো। এ বিষয়ে দামুড়হুদা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহিন আলম বলেন, ‘সুষ্ঠু ও শৃঙ্খলাপূর্ণভাবে ফুয়েল কার্ড বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব উপকারভোগীর কাছে কার্ড পৌঁছে দেয়া হবে। তিনি আরও বলেন, জেলা প্রশাসনের নিকট থেকে এক হাজার ৬০০ কার্ড পেয়েছি আজই সব শেষ হয়ে গেছে। কার্ড আনতে পাঠানো হয়েছে। আজ বুধবার আবারও যথা সময়ে কার্ড বিতরণ করা হবে।
মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.