মোবাইলফোনে যোগাযোগ করেই অনুপ্রবেশ করায় দু’দেশের দালাল

স্টাফ রিপোর্টার: দেশে করোনার ভারতীয় ধরণ ছড়ানো ও সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় সীমান্তবর্তী অনেক জেলায় বিশেষ লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ঝিনাইদহের সীমান্তবর্তী মহেশপুর উপজেলায়ও জারি করা হয়েছে বিশেষ বিধিনিষেধ। জোরদার করা হয়েছে বিজিবির টহল। এরপরও থামছে না অবৈধ অনুপ্রবেশ। দালালদের দৌরাত্ম্যে ঝিনাইদহের মহেশপুরে সীমান্ত দিয়ে বেড়েছে ভারত থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ।
অভিযোগ রয়েছে, মোবাইলফোনে দ’দেশের দালালরা যোগাযোগ করে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে রাতের আঁধারে লোক পারাপার করছে। এমন অবৈধ পারাপার করোনার ভারতীয় ধরণ ছড়ানোর ক্ষেত্রে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিকিৎসকরা জানান। পাসপোর্ট অধ্যাদেশ আইনের দুর্বলতা ও মোবাইল ব্যবহারের নজরদারির ঘাটতিও অনেকটা দায়ী বলে মনে করেন আইনজীবীরা। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, গত এক মাসে জেলায় করোনা সংক্রমণের হার ১২ দশমিক ৯৯ শতাংশ। অবৈধভাবে ভারত থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের সময় বিজিবির হাতে আটক ছয়জনের দেহে করোনা শনাক্ত হলেও এটি ভারতীয় ধরন ছিল কি-না তা আজও জানা সম্ভব হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিভিন্ন সময় ভারতে থাকা বাংলাদেশিদের সঙ্গে ওপারের দালালরা যোগাযোগ রাখে। মোটাঅঙ্কের অর্থের বিনিময়ে রাতের আঁধারে এপারের দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। সীমান্তে প্রবেশের সময় কিছু মানুষ আটক হলেও বেশিরভাগ অধরা থেকে যায়। অন্যদিকে আটকের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের ছাড়াতে আদালতপাড়ায় ভিড় করেন দালাল চক্রের সদস্যরা।
আদালতপাড়ায় কথা হয় দালাল চক্রের এক সদস্যের সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘ভারতে অপু ভাই নামে একজন আছেন, তিনি নদীতে নৌকা চালান। তার সঙ্গে কথা হয় হোয়াটসঅ্যাপে। কখনো তাকে দেখিনি। ওপারে তার একটি গোডাউন রয়েছে। সেখানে বাংলাদেশে প্রবেশকারীদের এনে রাখা হয়। বর্ডারে তার লোক আছে। রাতে সুযোগ বুঝে গ্রুপ করে তাদের কাছে এসব মানুষদের ছেড়ে দেয়। এপারে (বাংলাদেশ) সাইফুলদা তাদের বুঝে নেন।’
দালাল চক্রের এ সদস্য আরও বলেন, ‘ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় যারা বিজিবির হাতে আটক হয়, তাদের নাম-ঠিকানা ও আইডিকার্ড অপুদা ভারত থেকে আমাদের কাছে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দেন। আমাদের টাকা পাঠান বিকাশে। এরপর আমরা তাদের ছাড়ানোর ব্যবস্থা করি। বাংলাদেশ থেকে সাইফুলদা যাদের পাঠায় ভারতে অপুদা বুঝে নেন। এ কাজে একাধিক চক্র আছে।’
৫৮ বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৫ মে পর্যন্ত ৭৭৭ জনকে আটক করেছিল বিজিবি। যারা সবাই বাংলাদেশ থেকে অবৈধপথে ভারতে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। যাদের বিরুদ্ধে সীমান্তবর্তী মহেশপুর থানায় পাসপোর্ট আইনে ১৪৯ মামলা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ১৭৫ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২৭০, মার্চে ২২২, এপ্রিলে ১০৬ এবং মে মাসের পাঁচদিনে মাত্র চারজন আটক হয়েছে। সর্বশেষ এখন পর্যন্ত আট শতাধিক আটক হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২৬ এপ্রিল থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ভারত থেকে বাংলাদেশে অবৈধ অনুপ্রবেশ বেড়েছে। ১০ মে থেকে এখন পর্যন্ত অবৈধভাবে ভারত থেকে অনুপ্রবেশের সময় বিজিবির হাতে আটক হয়েছেন ৬৫ জন। এসব অবৈধ অনুপ্রবেশের ফলে সীমান্ত এলাকাসহ দেশে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে।
ঝিনাইদহে ভারতীয় সীমান্ত এলাকা রয়েছে ৭০ কিলোমিটার। এর মধ্যে কাঁটাতারবিহীন এলাকা প্রায় ১০.৫ কিলোমিটার। এসব এলাকা দিয়ে প্রায়ই অবৈধভাবে মানুষ যাতায়াত করে। বিশেষ করে রাতের আঁধারে বেশি যাতায়াত হয় বলে স্থানীয় বাসিন্দা, বিজিবি ও পুলিশ জানিয়েছে।
এসব এলাকায় ৫৮-বিজিবির ১০টি বিওপি ক্যাম্প রয়েছে। এগুলো হলো যাদবপুর, মাটিলা, সামান্তা, পলিয়ানপুর, বাঘাডাঙ্গা, খোসালপুর, লড়াইঘাট, বেনিপুর, কুসুমপুর ও শ্রীনাথপুর। ৫৮-বিজিবির আওতাধীন আরও নয়টি বিওপি ক্যাম্প রয়েছে, যা পার্শ্ববর্তী জেলা চুয়াডাঙ্গার মধ্যে পড়েছে।
সীমান্তের মাটিলা গ্রামে বসবাসকারী নুরুন নবী জানান, সীমান্তের বিভিন্ন এলাকা দিয়ে ভারত থেকে লোক আসে। তারা সীমানা অতিক্রম করে বিভিন্ন বাড়িতে আশ্রয় নেন। একইভাবে বাংলাদেশ থেকে ভারতে যান। এরা মূলত একশ্রেণির দালালের মাধ্যমে এপার ওপার গিয়ে যান। যাদের কাছে কোনো দেশেরই বৈধ পাসপোর্ট বা ভিসা নেই।
ভারতের নাগরিক সত্যচরণ সরকার। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কোলঘেঁষা গ্রাম কাশিপুর গ্রামের বাসিন্দা। এ গ্রামটি ভারতে উত্তর ২৪ পরগোনার বাগদা এলাকায়। সত্যচরণ কাঁটাতারের বেড়া অতিক্রম করে প্রতিদিনই কৃষিকাজ করতে আসেন।
তিনি বলেন, ‘বহুকাল ধরেই আমরা (উভয় দেশের নাগরিক) পাশাপাশি জমিতে কৃষিকাজ করে আসছি। সম্পর্কের খাতিরে আমরা প্রতিবেশী বাংলাদেশিদের বাড়ি যাই। তারাও আমাদের বাড়ি আসে। কিন্তু ভারতে করোনার মহামারী দেখা দেয়ার পর বিজিবি ভারত বাংলাদেশের সীমানা রেখা পার হতে নিষেধ করেছে। যে কারণে পাশাপাশি জমিতে কাজ করলেও আমরা বাংলাদেশের মাটিতে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি।’
বিজিবির হাতে আটক কয়েকজন অনুপ্রবেশকারী বলেন, গুজরাট থেকে একজন বলেছিল দালালের কথা। তার মাধ্যমে বর্ডারে এলে সেই রাতেই বর্ডার পার করিয়ে দেয়ার কথা। সারাদিন তারা গাড়িতে ঘুরিয়েছে অনেক জায়গায়। রাত আড়াইটার দিকে পার হয়েছিলাম। ভারত থেকে দালালরা আমাদের মহেশপুরের দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেয়। কিন্তু তারা তাদের নাম বলে না। তারা আরও বলেন, আমাদের কাগজপত্র নেই। অবৈধপথ ছাড়া আমরা কীভাবে আসবো।
অনুপ্রবেশের বিষয়ে জানতে চাইলে বিজিবির হাতে আটক দালাল ঝিনাইদহ মহেশপুরের হাদি বাহিনীর প্রধান হাদিসুর রহমান বলেন, ‘আমি কোনো কিছু জানি না। ওপারে যোগাযোগ হয় মেইন মেইন মানুষের সঙ্গে। বেনাপোলের লোক আছে ওদের সঙ্গে তাদের সব যোগাযোগ হয়। ওখান থেকে গাড়িতে তুলে ফোন দিয়ে বলে দেয়, একটা গাড়ি যাচ্ছে। তাদের অন্য আরেকটা গাড়িতে তুলে দিও। আমি তাদের অন্য একটা গাড়িতে তুলে দিতাম।’ তিনি আরও বলেন, ‘বেনাপোল থেকে রাজু জহুরুর, ছালাম আর মহেশপুরের কিতাব, আশা, হান্নানসহ আরও অনেকে জড়িত এ কাজের সঙ্গে।’
ঝিনাইদহের মহেশপুর ভারতীয় সীমান্তের যাদবপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান এবিএম শাহীদুল ইসলাম বলেন, ‘ভারত থেকে এখন আমাদের দেশে কেউ প্রবেশ করা মানে বিপদ ডেকে আনা। অবৈধ যাতায়াত ঠেকাতে হলে সীমান্তে বসবাসকারী স্থানীয়দের সহযোগিতা দরকার।’
ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. মিথিলা ইসলাম বলেন, ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা যারা ধরা পড়ছে তাদের আমরা কোয়ারেন্টাইনে রাখছি। যারা ধরা পড়ছে না তাদের ব্যাপারে আরও বেশি তৎপর হাওয়া প্রয়োজন। কারণ এদের মধ্যে যারা করোনা পজিটিভ হবেন, তাদের থেকে ভারতীয় ধরন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
ঝিনাইদহ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া মিলন বলেন, ‘১৯৭৩ সালের পাসপোর্ট অধ্যাদেশ আইনে সীমান্ত অনুপ্রবেশে ২ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে ছয় মাসের জেল। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ২ হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে আদালত থেকে জামিন পেয়ে যান ভারত থেকে বাংলাদেশে আসা অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সীমান্ত এলাকায় মোবাইল সিমকার্ড ব্যবহারে তদারকি বৃদ্ধির পাশাপাশি ১৯৭৩ সালের পাসপোর্ট অধ্যাদেশ আইনকেও যুগোপযোগী করতে হবে। কেননা আইনের দুর্বলতার সুযোগেও এমন অবৈধ অনুপ্রবেশ ঘটছে ‘
ঝিনাইদহ মহেশপুর ৫৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের পরিচালক লে. কর্নেল কামরুল আহসান বলেন, ‘সীমান্তে বিজিবি টহল জোরদার করা হয়েছে। অবৈধ পথে কেউ যেন বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে এজন্য সীমান্তে বসবাসকারীদের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে তাদেরও সীমান্ত অতিক্রম না করার জন্য বলা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সীমান্তে টহলের জন্য আমাদের কোনো পথ নেই। মাঠ-ঘাট বাগান দিয়ে আমাদের নজরদারি করতে হয়। এছাড়া আমাদের তেমন কোনো যানবাহনও নেই। ফলে সাইকেল চালিয়ে মেঠো পথেই আমাদের সদস্যরা সীমান্ত পাহারা দিচ্ছেন, যা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।’
ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক মজিবর রহমান বলেন, ‘আমাদের মহেশপুর সীমান্ত এলাকার জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে মিটিং করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তারা মিটিং করেছেন এবং সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে মানুষকে আনা নেয়ার কাজে কেউ যেন সহযোগিতা না করে। আমরা এর সুফল পাচ্ছি। এ সীমান্ত এলাকা দিয়ে একদিনে ২৮ জন এসেছি। এরপর প্রশাসন কঠোর অবস্থান নেয়ায় এখন আর সেভাবে আসছে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বিজিবি যেভাবে কাজ করছে তাতে আমরা আশা করছি এ সীমান্ত দিয়ে সেভাবে কেউ প্রবেশ করছে না। প্রবেশ যদি করে তাহলে তাদের আমরা আইনের আওতায় এনে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইন পাঠাচ্ছি।’

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More