স্টাফ রিপোর্টার: ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আচমকা ভয়াবহ হামলায় খামেনিসহ ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব, বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা, গোয়েন্দা প্রধান থেকে শুরু করে প্রায় দুই হাজার ইরানি নিহত হয়েছে। এ অবস্থাতেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে ইরান, পাল্টা হামলায় তারা বিপর্যস্ত করে তুলেছে ইসরায়েলের নগর-জনপদ, মধ্যপ্রাচ্যের সবগুলো মার্কিন ঘাঁটি। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরান আক্রমনের এক মাস পর ইরানের মিত্র হুতিরা ইসরায়েলে মিসাইল ছুড়ে যোগ দিলো যুদ্ধে। এরই মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়ায় সারা বিশ্বে তৈরি হয়ে জ্বালানীর ঘাটতি। আবার ইয়েমেন বাব আল মান্দেব প্রণালী বন্ধ করলে সারাবিশ্ব অসহায় হয়ে পড়বে। যুদ্ধ বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ১৫ দফা প্রস্তাব দিয়েছে, তা প্রত্যাখ্যান করে ইরান ৫ দফা দাবি জানিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলার সময়ই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় করে হামলা চালায়। এখনো তিনি একেকবার একেক কথা বলছেন, তাতে দেশটির মিত্ররাও আস্থা পাচ্ছে না। তিনি একবার বলছেন, যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা চলছে। আবার যে মধ্যপ্রাচ্যে এখনো অবস্থান করছে ৫০ হাজার মার্কিন সেনা, সেখানে আরো ১০ হাজার সেনা যুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন। বিমান হামলায় ইরানের নগর-বন্দর ধ্বংস ও বিপুল সংখ্যক মানুষ হতাহত করার পর এখন যুক্তরাষ্ট্র স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল ট্রাম্প আগুনে ঝাপ দিচ্ছেন কি না, সে প্রশ্ন সামনে আসছে। অন্যদিকে ইরানে হামলার পাশাপাশি লেবাননে স্থল অভিযান চালিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে ইসরায়েল। সেখানে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে ইরানের মিত্র হিজবুল্লাহ। ইসরায়েলে মৃতের সংখ্যা কম হলেও তারা শান্তিতে নেই, একটু পর বিভিন্ন শহরের অধিবাসীদের ছুটতে হচ্ছে নিরাপদ আশ্রয়ে। তেল আবিব, জেরুজালেম, বিরশেবা, ডিমোনা, আরাদ শহরের অনেক ভবন বিধ্বস্ত হয়েছে। ইসরায়েলের ওপর ইয়েমেনের হুতিদের আবার হামলা শুরু হওয়া দেশটির জন্য বাড়তি মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে; যদিও এটি বড় কোনো সামরিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করার সম্ভাবনা কম। তবে হুতিরা যদি লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল লক্ষ্য করে নতুন করে হামলা শুরুর সিদ্ধান্ত নেয়, তবে এর প্রভাব ছড়াবে বিশ্বময়। বর্তমানে সৌদি আরব হরমুজ প্রণালি এড়াতে লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে একটি পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল পাঠাচ্ছে। এশিয়ার বাজারের উদ্দেশ্যে পাঠানো এ তেলের জাহাজগুলো ইয়েমেনের পাশ দিয়ে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫-এর শুরু পর্যন্ত হুতিরা লোহিত সাগরে চলাচলকারী জাহাজে প্রায় ২০০টি হামলা চালিয়েছে। এতে ৩০টির বেশি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া অন্তত একটি জাহাজ ছিনতাই করা হয়েছে। ফলে বাব আল-মানদাব প্রণালি ও সুয়েজ খাল দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গিয়েছিল। ইরান যদি কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় এবং একই সঙ্গে হুতিরা লোহিত সাগরের পথটিও বন্ধ করে দেয়, তবে দুটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথের এ যুগপৎ বন্ধ হওয়া বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য বিপর্যয়কর হয়ে দাঁড়াবে। নতুন ফ্রন্টে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় ইসরায়েল আরো চাপে পড়লো। লেবাননে স্থল অভিযানে ইসরায়েল মার খেতে শুরু করেছে, হিজবুল্লাহ একের পর এক আক্রমন চালাচ্ছে ইসরায়েল বাহিনীর ওপর। এরই মধ্যে কয়েকজন ইসরায়েলি সেনা মারা গেছে, আহত হয়েছে শতাধিক। ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্স, আইডিএফের প্রধান লেবাননে সৈন্য সংকটের কথা তুলে ধরেছেন ইসরায়েলের মন্ত্রিসভার বৈঠকে। ইরান ও হিজবুল্লাহর মিসাইল ঠেকাতে ইসরায়েলের বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা ব্যর্থ হচ্ছে। এজন্য ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা লেপিড নেতানিয়াহুর সমালোচনা করেছেন। বাস্তবে ইসরায়েলের আয়রন ডোম, স্ট্রিং, এ্যারো এবং থার্ড প্রতিরোধ ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর ফুরিয়ে আসছে বলে গভীর সংকটে আছে দেশটি। এর মধ্যে হুতিদের মিসাইল ঠেকাতে তাদের আরও ইন্টারসেপ্টর খরচ হবে, ভয়াবহ চাপে পড়বে ইসরায়েল। নতুন ফ্রন্ট সামলানোর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে ইসরায়েল কতটুকু সক্ষম হবে, তার ওপর নির্ভর করছে জয়-পরাজয়। গত ২১ মার্চ রাতে প্রায় তিন ঘণ্টার ব্যবধানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি আরাদ ও ডিমোনার দুটি আবাসিক এলাকায় আঘাত হানে। এতে দুই শহরের অনেক ভবন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয়, বসবাস অযোগ্য হয়ে পড়ে। হামলায় ১১৫ জনের বেশি মানুষ আহত হন। তাদের মধ্যে ১১ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এখন পর্যন্ত ব্যাখ্যা দেয়নি, ঠিক কী কারণে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি ব্যর্থ হলো। এই হামলা নতুন করে কিছু প্রশ্ন সামনে এনেছে। ইসরায়েলের কাছে পর্যাপ্ত ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি দেখা দিয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের আশঙ্কায় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো রক্ষায় সেনাবাহিনী এই ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সাশ্রয় বা সংরক্ষণ করছে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্পর্শকাতর পারমাণবিক স্থাপনা থাকায় ডিমোনা শহরটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুগুলোর একটি। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ কিছুটা বাড়িয়ে বললেও তার মতে, সুরক্ষিত ডিমোনায় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে ইসরায়েলের ব্যর্থতা বড় মোড় পরিবর্তনকারী একটি ঘটনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলের আকাশ এখন অরক্ষিত।’ তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার চলমান শান্তি আলোচনা যদি কোনো কারণে ফলপ্রসূ না হয়, তবে ইরানজুড়ে এক ভয়াবহ ‘চূড়ান্ত হামলার’ পরিকল্পনা করছে মার্কিন বাহিনী। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শান্তি আলোচনার সমান্তরালে এই সামরিক প্রস্তুতির নির্দেশ দিয়েছেন। এই পরিকল্পনায় ইরানে ব্যাপক বিমান হামলার পাশাপাশি প্রথমবারের মতো বড় ধরনের স্থলবাহিনী নামানোর চিন্তাও রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। তেহরানকে আলোচনার টেবিলে নতি স্বীকারে বাধ্য করতেই এই দ্বিমুখী কৌশল গ্রহণ করেছে হোয়াইট হাউস। পেন্টাগনের সম্ভাব্য হামলার তালিকায় খার্ক, লারাক এবং আবু মুসার মতো কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপগুলো রয়েছে। বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালালে তা শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রকে বাড়তি সুবিধা এনে দিতে পারে। বর্তমানে তুরস্ক, পাকিস্তান ও মিশর এই দুই দেশের মধ্যে একটি টেকসই সংলাপ আয়োজনের জন্য ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানে এখন পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিও রয়েছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানও দমে না গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে নিশানা বানিয়ে পাল্টা হামলা অব্যাহত রেখেছে। জর্ডান, ইরাক, সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অন্তত এক ডজন দেশে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আঘাত হেনেছে। এক মাস ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ফলে কেবল বিপুল প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতিই হয়নি, বরং মধ্যপ্রাচ্যের বিমান চলাচল ব্যবস্থা পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। এই সংঘাতের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি পণ্যের বাজারে এক চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। ওয়াশিংটন বর্তমানে শান্তি আলোচনার ওপর জোর দিলেও তাদের সামরিক প্রস্তুতি নির্দেশ দিচ্ছে যে পরিস্থিতি যেকোনো সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। যদি পাকিস্তান বা তুরস্কের মধ্যস্থতায় দ্রুত কোনো সমঝোতা না হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্য এক দীর্ঘস্থায়ী ও বিধ্বংসী যুদ্ধের কবলে পড়বে। আপাতত পুরো বিশ্ব তাকিয়ে আছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে, যা নির্ধারণ করবে এই সংঘাত কি আলোচনার টেবিলে থামবে নাকি এক ‘চূড়ান্ত ধ্বংসলীলায়’ রূপ নেবে। ইরানে আগ্রাসন বন্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া ১৫ দফা আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে নতুন দাবি জানিয়েছে তেহরান। গত সপ্তাহের বুধবার তারা বলেছে, বিশ্ব জ্বালানি করিডোর হরমুজ প্রণালির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ, সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আগ্রাসনের ক্ষতিপূরণ, লেবাননে হামলা বন্ধসহ বেশ কয়েকটি দাবি মেনে নিতে হবে কোনো শর্ত ছাড়াই। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে ইরান তার শান্তি পরিকল্পনার প্রধান বিষয়গুলোতে (যেমন পারমাণবিক অস্ত্রের উচ্চাকাক্সক্ষা ত্যাগ করা) সম্মত হয়েছে। তবে তেহরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম অনুযায়ী, তারা মধ্যস্থতাকারীদের জানিয়েছে যে ট্রাম্পের পরিকল্পনা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ইরানি আইনপ্রণেতারা এর পরিবর্তে নিজস্ব একটি চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছেন, যেখানে হরমুজ প্রণালির ওপর ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পূর্ণ কর্তৃত্ব এবং এর পাশাপাশি বিদেশে তাদের ছায়া গোষ্ঠীগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি), যারা বর্তমানে তেহরানের শাসনব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার করছে, ঘোষণা করেছে যে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সব মার্কিন ঘাঁটি প্রত্যাহার এবং ইরানের ওপর হামলার ক্ষতিপূরণ না দেয়া পর্যন্ত তারা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করবে না। ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল সরবরাহকারী গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ চলাচল পথ হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। এই পরিবর্তনের ফলে মিশর যেভাবে সুয়েজ খাল থেকে শুল্ক আদায় করে, ইরানও সেভাবে এই পথ দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলো থেকে ফি সংগ্রহ করতে পারবে। তেহরানের এই দাবিগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে ইরানের ওপর থেকে সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং একটি নতুন আয়ের উৎস নিশ্চিত করা। এছাড়া ইরান এই যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তির পাশাপাশি লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরাইলের সামরিক অভিযান বন্ধের দাবি জানিয়েছে। এই দাবিতে পরমাণু কর্মসূচির কথা উল্লেখ না করা হলেও বলা হয়েছে যে, ইরানকে তার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বজায় রাখার অনুমতি দিতে হবে এবং এটি সীমিত করার বিষয়ে কোনো আলোচনা করা হবে না। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। হামলার প্রথম দিনেই ইরানের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ভয়াবহ হামলায় দেড় শতাধিক শিশুর প্রাণ গেছে। ইরানে প্রায় দুই হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ৩০ লাখের বেশি মানুষ হয়েছে বাস্তুহারা। যুদ্ধের প্রভাবে ইরানের অভ্যন্তরে মানবিক সংকট তীব্র হচ্ছে। সংঘাত শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশটিতে ৯৩ হাজারের বেশি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২৮২টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ৬০০টি স্কুল ও প্রায় ৬৫ হাজার ঘরবাড়ি রয়েছে। ইরান যুদ্ধে চরম মূল্য দিতে হচ্ছে লেবাননকে, ১১শর বেশি মানুষের প্রাণ গেছে ইসরায়েলের বর্বরতায়। ইরানের মিত্র সশস্ত্র হিজবুল্লাকে নিশ্চিহ্ন করতে ইসরায়েলি সেনারা লেবানের ভেতরে ঢুকে তাণ্ডব চালাচ্ছে। ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্স, আইডিএফ জানিয়েছে, তারা ৭৭০ হিজবুল্লাহ যোদ্ধাকে খতম করেছে। লেবাননের ১০ লক্ষাধিক মানুষ উচ্ছেদ করেছে ইসরায়েল, এসব মানুষ এখন উদ্বাস্তু। দেশটিতে ভয়াবহ মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দক্ষিণ লেবাননের বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়ার যে নির্দেশ দিয়েছে, উচ্ছেদ এলাকা প্রতিদিন বাড়ছে। ইসরায়েল সীমান্ত থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তরে লিটানি নদী ছাড়িয়ে এখন জাহরানি নদীর উত্তর দিক পর্যন্ত এই উচ্ছেদ আদেশ কার্যকর করা হয়েছে। ইসরায়েলের এই ঢালাও উচ্ছেদ আদেশের কবলে পড়েছে লেবাননের ১ হাজার ৪৭০ বর্গকিলোমিটার এলাকা। এটি দেশটির মোট ভূখণ্ডের প্রায় ১৪ শতাংশ। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এমন নির্দেশের কারণে এখন পর্যন্ত লেবাননের ১০০টিরও বেশি শহর ও গ্রামের মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। ইসরায়েলি পদাতিক বাহিনী এখন দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় তাদের দখলদারি আরও বাড়াচ্ছে। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা সেখানে একটি ‘বাফার জোন’ বা নিরাপদ অঞ্চল গড়ে তুলতে চায়। লেবাননের জনসংখ্যার ১৮ শতাংশ মানুষই ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। অনেক পরিবার মাথা গোঁজার ঠাঁই না পেয়ে রাস্তা, যানবাহন বা খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছেন। কয়েক লাখ মানুষ লেবানন ছেড়ে অন্য দেশে চলে গেছেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের প্রাণহানি কম, সম্পদহানি বেশি। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র ১৩ জন এবং ইসরায়েল ২০ জনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছে। ইসরায়েল সাড়ে ৫ হাজার এবং যুক্তরাষ্ট্র দুই শতাধিক আহত হওয়ার তথ্য দিয়েছে। তবে বাস্তবে হতাহতের সংখ্যা বহুগুণ বেশি। আবার ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরাকে মার্কিনপন্থি ও ইরানপন্থি ৯৬জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া মার্কিন মিত্র ইসাবে পরিচিত সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১১ জন, কুয়েতে ৬ জন, বাহরাইনে ৩ জন এবং সৌদি আরবে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিরপেক্ষ দেশ ওমানেরও ৩ নাগরিক নিহত হয়েছেন। প্রায় দুই হাজার ইরানি নিহত হলেও যুদ্ধ শুরুর প্রায় এক মাস পর ক্রমেই লড়াইয়ের ময়দানে দাপট দেখাচ্ছে ইরান। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর থেকে চার সপ্তাহ ধরে কার্যত বন্ধ রয়েছে জ্বালানি বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। ইরানের হুমকি এবং হামলার আশঙ্কায় এ সংকীর্ণ সমুদ্রপথের উভয় পাশে প্রায় দুই হাজার জাহাজ আটকে আছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়েই পরিবহন করা হয়। এ ছাড়া বিশ্বের খাদ্য উৎপাদনে প্রয়োজনীয় সার সরবরাহের প্রধান পথও এটি। জ্বালানিসংকট আরও ঘনীভূত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অবরোধ তুলে নিতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালালেও খুব একটা সফল হতে পারেননি। তবে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে অনেক ক্ষেত্রেই ইরানের পাল্লা এখনো ভারী। এর একটি বড় কারণ, দেশটির অপ্রচলিত যুদ্ধপদ্ধতি, যেমন সস্তা ড্রোন ও সামুদ্রিক মাইনের ব্যবহার। অন্য কারণটি হলো ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান। এ তিন বাস্তবতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য দেশগুলোর পক্ষে এ পথে জাহাজ সুরক্ষা করা বা সামরিকভাবে এ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরানের প্রায় এক হাজার মাইল দীর্ঘ উপকূল রয়েছে, যেখান থেকে তারা জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করতে পারে। এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারিগুলো স্থানান্তরযোগ্য হওয়ায় সেগুলো ধ্বংস করা বেশ কঠিন। আর বিশাল উপকূলের কারণে ইরান কেবল এই প্রণালি নয়, এর বাইরেও হামলা চালাতে সক্ষম। এর মধ্যে ইরানে আক্রমন করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক বোমারু বিমান এফ-৩৫ এবং এফ-১৮ ইরানের হামলার শিকার হয়েছে। তাছাড়া ইরাক, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব, জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ ঘাঁটিতে ক্ষেপনাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। অনেকগুলো ঘাঁটি বসবাসের উপযোগী না থাকায় মার্কিন সেনারা জীবন বাঁচাতে আশপাশের হোটেল ও অফিসে আশ্রয় নিয়েছে। সেসব স্থানে হামলার ঘোষণা দিয়েছে ইরান, সেই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের মার্কিন ঘাঁটি ও অবস্থান থেকে দূরে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এক মাস যুদ্ধ চলার পর এখন ইরান পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। যুদ্ধ বন্ধে ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে নিজের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা ঘনিয়ে আসায় চাপে পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একদিকে যুদ্ধ থামানোর অভ্যন্তরীণ চাপ। অন্যদিকে তেহরানের ‘অতি উচ্চাকাক্সক্ষা’ দেশটিকে আগের চেয়ে আরও বিপজ্জনক আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত করেছে বলে মিত্র দেশগুলোর উদ্বেগ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন এই দুই বিপরীতমুখী চাপে কোণঠাসা। আর যুক্তরাষ্ট্রও বিপাকে পড়ে পারমানবিক অস্ত্র ব্যবহার করে বসে কি না সে শঙ্কাও দেখা দিয়েছে শান্তিকামী বিশ্ববাসীর কাছে। ইরানে হামলার পর সেদেশের জনগণ ক্ষমতাসীন রেজিমের প্রতি সহানুভূতি বেড়ে গেছে। কয়েক মাস আগে যারা ইরানের ইসলামিক শাসনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিল, তারা খোমেনিসহ শীর্ষ সামরিক নেতাদের মৃত্যু এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের নির্বিচার বিমান হামলায় দুই হাজার মানুষের মৃত্যুর পর মন বদল করেছেন। ইরানের নারীরা তাদের স্বর্ণালঙ্কার দান করছেন ক্ষেপনাস্ত্র ও অস্ত্র কেনার জন্য। আর ইরানের রাজনীতির কট্টরপন্থিরা পারমানবিক চুক্তি থেকে বের হয়ে যেতে চাপ দিচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত ইরান যুদ্ধ সমস্ত সীমা-পরিসীমা ছাড়িয়ে বিশ্বে জ্বালানী, সার, খাদ্য, ওষুধসহ সব ক্ষেত্রে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.