চাকরির প্রলোভনে কম্বোডিয়ায় দাসত্ব চুয়াডাঙ্গা-ঝিনাইদহের যুবকেরা মানবপাচার চক্রের ফাঁদে নির্যাতনে এক যুবকের মৃত্যু, জীবনের ঝুঁকিতে আরও অনেকে

ফাইজার চৌধুরী: চাকরির স্বপ্ন দেখিয়ে কম্বোডিয়ায় পাঠিয়ে বাংলাদেশি যুবকদের আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধ চক্রের কাছে বিক্রি করার ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহ জেলার একটি সংঘবদ্ধ মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পাচারের পর তাদের পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে জোরপূর্বক অপরাধমূলক কাজে বাধ্য করা হয়। অস্বীকৃতি জানালে চালানো হয় অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। ইতোমধ্যে এক যুবক নির্যাতনের শিকার হয়ে কম্বোডিয়ায় মৃত্যুবরণ করেছেন। প্রাণনাশের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন আরও কয়েকজন।
চুয়াডাঙ্গার দুই যুবক সাইবার দাসত্বের শিকার।
এই মানবপাচারের শিকার হয়েছেন, চুয়াডাঙ্গা শহরের ইসলামপাড়ার বাসিন্দা ইনসান আলী (২৩) এবং সদর উপজেলার গাড়াবাড়িয়া গ্রামের ছাগলাপাড়ার মৃত আব্দুল গফুরের ছেলে শাহজালাল (৩৯)। তাদের অভিযোগের তীর গাড়াবাড়িয়া এলাকার খলিলের ছেলে মামুন ও তার স্ত্রী শিউলি আক্তার মালার দিকে।
ভুক্তভোগী ইনসান আলীর পরিবার জানায়, মাস তিনেক আগে মামুন ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাকে কম্বোডিয়ায় পাঠান। সেখানে পৌঁছানোর পরই ইনসান আলীকে একটি আন্তর্জাতিক সাইবার স্ক্যাম চক্রের কাছে ‘পণ্য’ হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয়। অবৈধ ও প্রতারণামূলক কাজে যুক্ত হতে অস্বীকৃতি জানালে শুরু হয় নির্যাতন। একপর্যায়ে তার পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে তাকে বন্দি করে রাখা হয়।
পরিবারের অভিযোগ, গতকাল সোমবার দুপুরে মামুন ইনসান আলীর কাছ থেকে আরও ৭শ ডলার আদায় করে। রাত ৮টা পর্যন্ত তার পাসপোর্ট ফেরত দেওয়া হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, নিজেকে বিএনপি নেতা পরিচয় দেওয়া মামুন সাংবাদিকদের কাছে তথ্য দেওয়ার ‘অপরাধে’ ইনসান আলীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে তার পক্ষে একটি ভিডিও স্টেটমেন্ট দিতে বাধ্য করার চেষ্টা করছে।
এ ঘটনায় চার দিন আগে (১ জানুয়ারি ২০২৬) ভুক্তভোগী ইনসানের মা তারজিনা খাতুন চুয়াডাঙ্গা সদর থানায় মামুন ও তার স্ত্রী মালার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। সদর থানার ওসি মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
বর্তমানে কোনোভাবে বন্দিদশা থেকে বের হলেও, পাসপোর্ট ও আইনি কাগজপত্র না থাকায় ইনসান আলী কম্বোডিয়ার নমপেন শহরে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। খাবার, চিকিৎসা ও নিরাপত্তাহীন অবস্থায় দিন কাটছে তার। পরিবার বলছে, যে-কোনো সময় তার প্রাণনাশের আশঙ্কা রয়েছে।
একই চক্রের শিকার গাড়াবাড়িয়া গ্রামের শাহজালালও। তিনি জানান, ৭ মাস আগে চাকরির নামে কম্বোডিয়ায় নিয়ে গিয়ে তাকে সাইবার প্রতারণামূলক কাজে বাধ্য করা হয়। রাজি না হওয়ায় তাকে মারধর ও মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে।
ঝিনাইদহের যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু।
এদিকে মানবপাচারকারীদের নির্যাতনের শিকার হয়ে কম্বোডিয়ায় এক যুবকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিহত যুবকের নাম সোহাগ মোল্লা (১৯)। তিনি ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার বাহির রয়েড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং বিল্লাল মোল্লার ছেলে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, শৈলকূপা উপজেলার রয়েড়া গ্রামের জামিরুল শেখের ছেলে মানব পাচারকারী চক্রের সদস্য রয়েল শেখ প্রায় ৮ মাস আগে মাসে দেড় লক্ষ টাকা বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে ৫ লক্ষ টাকার বিনিময়ে সোহাগ মোল্লাকে কম্বোডিয়ায় নিয়ে যান।
সেখানে রয়েল শেখ জোরপূর্বক সোহাগকে অবৈধ কাজে বাধ্য করতেন। নিয়মিত খাবার ও বেতন দেওয়া হতো না। প্রতিবাদ করলেই চালানো হতো নির্যাতন। সর্বশেষ গত ডিসেম্বর মাসে নির্যাতনের ফলে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন সোহাগ মোল্লা। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১ জানুয়ারি ২০২৬ কম্বোডিয়ায় তার মৃত্যু হয়।
অভিযোগ রয়েছে, মৃত্যুর পরও পাচারকারী রয়েল শেখ নিহতের মরদেহ দেশে আনার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ফলে মরদেহ ফেরত নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে পরিবার।
উল্লেখ্য, সোহাগ মোল্লার সঙ্গে একই ফ্লাইটে তার চাচাতো ভাই ইব্রাহীম মোল্লাও কম্বোডিয়া গিয়েছিলেন। তিনি গত ২ জানুয়ারি দেশে ফিরে সব ঘটনা পরিবারকে জানালে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। নিহত সোহাগের পরিবার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
কম্বোডিয়া : মানবপাচার ও সাইবার দাসত্বের নতুন কেন্দ্র
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক বছরে কম্বোডিয়া মানবপাচার ও সাইবার দাসত্বের অন্যতম হটস্পটে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেশটিকে সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডের ‘নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কম্পাউন্ডে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের তরুণদের আটকে রেখে অনলাইন প্রতারণায় বাধ্য করা হয়। পালানোর চেষ্টা করলে মারধর, বৈদ্যুতিক শক এমনকি হত্যার ঘটনাও ঘটছে।
ভুক্তভোগী ইনসান আলী, শাহজালাল ও নিহত সোহাগ মোল্লার পরিবারের সদস্যরা দ্রুত সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। একই সঙ্গে মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করে দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More