ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে বেড়েছে সেবার মান

শুধু অ্যাম্বুলেন্সে খরচ কমেছে বছরে ৩৫ লাখ টাকা

 

 

খাইরুল ইসলাম নিরব, ঝিনাইদহ: হাসপাতালের রোগী আনা নেয়ার কাজে ব্যবহৃত তিনটি এ্যাম্বুলেন্সে ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ৬৫ লাখ টাকার জ্বালানি খরচ হয়েছিল। সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের ৮ মাসে ১৮ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। বাকি চার মাসে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা খরচ হতে পারে। মোট খরচ দাড়াতে পারে ৩০ লাখের মত। ফলে এখানে সরকারের খরচ কমবে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা। জ্বালানি খরচে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এ্যাম্বুলেন্সে জিপিএস ট্রাকার লাগানোর ফলে এটা সম্ভব হয়েছে। এটি ঝিনাইদহ ২৫০ শয্যার সদর হাসপাতালের রোগী সেবার একটি চিত্র।

ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার মোস্তাফিজুর রহমান হাসপাতালে যোগদান পর বদলে গেছে চিকিৎসা সেবার মান। হাসপাতালের ডাক্তার ও কর্মচারীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বায়োমেট্রিক্যাল হাজিরা পদ্ধতি স্থাপন করা হয়েছে।

ভারত সীমান্তবর্তী জেলা ঝিনাইদহের ২০ লাখ মানুষের সেবা দেয়ার জন্য ২৫০ শয্যা এ হাসপাতালে ৮৭ ডাক্তারের পদ থাকলেও কর্মরত রয়েছে ৩৭ জন। ৯৭ জন নার্সের বিপরীতে ৮২ জন দ্বায়িত্ব পালন করছেন। তবে বিশাল এ হাসপাতালে ক্লিনার পদ রয়েছে মাত্র ৬ জন। যাদের দিয়ে বিশাল এই জনমানুষের হাসপাতালটি প্রতিদিন পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ করা হয়ে থাকে। একসময় যা ছিল অপরিস্কার অপরিচ্ছন্ন ও ময়লার ভাগাড়। পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও জনবল সংকট থাকলেও শতভাগ সেবা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বর্তমান তত্বাবধায়ক মোস্তাফিজুর রহমান।

বর্তমান ত্বাবধায়ক দ্বায়িত্ব নেয়ার পর হাসপাতালের আয় বেড়েছে। হাসপাতালে প্রতিটি কেনাকাটায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে। শুধু রক্ত পরীক্ষায় পূর্বের থেকে লাখ লাখ টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। হাসপাতালের সাইকেল স্টান্ডে পূর্বে টেন্ডারে ৮০ হাজারের উপর দর ওঠেনি। কিন্তু বর্তমান তত্বাবধায়ক যোগদানের পর প্রথম উন্মুক্ত টেন্ডারে ৫ লাখ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। যে আয়ের একটি অংশ থেকে মসজিদ সংস্কারে ব্যয় করা হয়েছে। বাকি অংশে রোগী কল্যাণ সমিতির তহবিলে প্রদান করা হয়েছে। এভাবেই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এ সেবা প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে সেবার মান বাড়ানো হয়েছে বলছেন রোগীরা।

হাসপাতালে এক সময় মূমুর্ষ রোগীদের জন্য সিলিন্ডিারের মাধ্যমে অক্সিজেন সরবরাহ করা হতো। এরজন্য নানা রকম হয়রানির স্বীকার হতে হতো রোগীদের। এখন রোগীর প্রয়োজনীয় অক্সিজেন বেডে বসেই পাইপ লাইনের মাধ্যমে পাচ্ছেন। পাইপ লাইনের মাধ্যমে প্রতিটি বেডে এ অক্সিজেন সুবিধা রাখা হয়েছে। যা অত্যাধুনিক প্লান্টের মাধ্যমে বায়ু ব্যবহার করে সয়ংক্রিয়ভাবে অক্সিজেন উৎপাদন করা হচ্ছে। হাসপাতালে স্থাপিত এ অক্সিজেন প্লান্টে প্রতি বছর সরকারের ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা সাশ্রয় হচ্ছে।

হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাতপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের সরকারী নিয়মানুযায়ি খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে। খাবার রান্নায় স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা হয়েছে। রাধুনীদের ইউনিফর্ম ব্যবহার ও পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা হয়েছে। সপ্তাহে দুইদিন ছাগলের মাংস পরিবেশন করা হচ্ছে। একসময় রোগীরা হাসপাতালে খাবার নিতে চাইতো না। বর্তমান তত্বাবধায়ক যোগদানের পর থেকে রোগী ও তার স্বজনরা আগ্রহ করে হাসপাতালে রান্না খাবার গ্রহন করছেন। এ কাজ করতে ডাক্তারদের একটি টিম খাবারের মান পরীক্ষা ও তদারকির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

হাসপাতালে গর্ভবতী মায়েদের চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়ন করা হয়েছে। আধুনিক অপারেশন থিয়েটারের মাধ্যমে প্রতিদিন রোগীদের অপারেশন করা হচ্ছে। গর্ভবতী মায়েদের সিজার না করার জন্য নিয়মিত কাউন্সিলিং করা হয়ে থাকে। বর্তমানে সিজারের থেকে নরমাল ডেলিভারি বেশি বলে হাসপাতালের রেকর্ড বই থেকে জানা গেছে।

জেলার ২০ লাখ মানুষের একমাত্র চিকিৎসাসেবার ভরসাস্থল এ হাসপাতাল সরকারের রাজস্ব ব্যয় হলেও চিকিৎসার মান ছিল একেবারেই পিছিয়ে। ফলে বাধ্য হয়ে এ জেলার মানুষ বেসরকারী হাসপাতালগুলো চিকিৎসাসেবা নিত। উন্নয়নের লক্ষ্যে নতুন তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোস্তাফিজুর রহমানের যোগদানের পর দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। তার কাজের স্বীকৃতি স্বরুপ ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে ইলেক্ট্রনিক ডাটা ট্রাকিং প্রক্রিয়ায় জরায়ু ক্যান্সার প্রতিরোধে ভূমিকা রাখায় জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কৃত হয়েছেন।

একসময় হাসপাতালের অনিয়ম আর দালাল চক্রের কবলে পড়ে সেবা নিতে আসা মানুষ বিপাকে পড়তেন। হাসপাতাল চত্ত্বরে দালাল চক্র রুখকে নিয়মিত নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেটের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। সরকারী ওষুধ সরবরাহ থাকলেও সুষ্ঠ্য ব্যবস্থাপনা ছিল না। বর্তমান তত্বাবধায়ক যোগদানের দেড় বছরে আমুল পরিবর্তন এনেছেন। এখন রোগীদের মধ্যে নিয়মিত সরকারি ওষুধ সরবরাহ করছেন। হাসপাতালের স্টোররুম নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে। চিছকে চোর ও মাদকাসক্তদের অবাধ বিচরণ বন্ধ করা হয়েছে। রোগী ও তার স্বজনদের কথা চিন্তা করে দৈনিক ৭ হাজার ৫০০ লিটার বিশুদ্ধ পানি উত্তোলনে সক্ষম প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে।

এর আগে রোগীরা টিউবওয়েল চেপে অথবা দুর থেকে পানি সংগ্রহ করতেন। নিয়মিত হাসপাতালের অভ্যন্তর ও বাইরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা হচ্ছে। হাসপাতাল অভ্যন্তরে প্রতিদিন তিনবার পরিস্কার করা হচ্ছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ইউনিফর্ম ও পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। হাসপাতাল চত্তর শোভাবর্ধনে ফলজ ও বনজ বৃক্ষ রোপন করা হয়েছে। গত দেড় বছরে তা দৃষ্টিনন্দন হয়ে দেখা দিয়েছে, যা হাসপাতালে আগতদের দৃষ্টি কাড়ছে। হাসপাতাল চত্তরে অবস্থিত মসজিদে আগত মুসল্লিদের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে এসি স্থাপন করা হয়েছে।

এছাড়াও প্রান্তিক রোগীদের কথা চিন্তা করে হাসপাতালে ডিজিটাল এক্স-রে, ইকো, প্যাথোলোজিক্যাল পরীক্ষা, ডোপ টেষ্ট, ইলেক্ট্রোলাইট, ইসিজি পরীক্ষা সুবিধা নিয়মিত প্রদান করা হচ্ছে। এরমধ্যে ডিজিটাল এক্স-রে, ইলেক্ট্রোলাইট ও ইকো ছিল না। ইলেক্ট্রোলাইট হলো রক্তের এক ধরনের পরীক্ষা যা বাইরে ১২০০ টাকা খরচ হয়। যা হাসপাতালে এখন মাত্র ২০০ টাকায় করা সম্ভব হচ্ছে। এছাড়া হার্টের কালার ইকো কার্ডিয়াগ্রাম করা হচ্ছে।

হাসপাতালের গাইনি ওয়ার্ডে ভর্তি হালিমা খাতুন জানান, হাসপাতালে খাবারের মান খুবই ভালো। দিনে কয়েকবার পরিস্কার করা হচ্ছে। আমি আগেও এ হাসপাতালে এসেছি কিন্তু পূর্বের থেকে অনেক ভালো পরিবেশ, কোন দুর্গন্ধ নেই।

হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডাক্তার এসএম আশরাফুজ্জামান সজিব জানান, বর্তমান তত্ত্ববধায়ক স্যারের নির্দেশনায় হাসপাতালের পরিস্কার পরিচ্ছন্নতাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে শৃংখলা ফিরেছে। পূর্বের থেকে রোগীসেবার মান বেড়েছে। ভর্তি রোগীদের স্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হচ্ছে।

হাসপাতালের তত্বাবধায়ক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ঝিনাইদহে যোগদানের পর আমার দ্বায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেছি, এর বাইরে কিছু নয়। সরকারের দেয়া নিয়ম অনুযায়ি সকল খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেই রোগীদের সেবা দেয়ার চেষ্টা করি। তার মধ্যে যেমন খাবার পরিবেশন, ক্রয় ও পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার কাজে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। আমার একটাই লক্ষ্য সরকারের দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ি নাগরিক সেবা দেয়া।

 

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More