রাশিয়ার ড্রোন যুদ্ধের শিক্ষা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কাজে লাগাচ্ছে ইরান

মাথাভাঙ্গা মনিটর: ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়াদের চলতি সপ্তাহে প্রকাশ করা ভিডিও ক্লিপগুলো ইউক্রেন যুদ্ধ অনুসরণকারী যেকোনো ব্যক্তির কাছে পরিচিত মনে হয়েছে। ফাইবার অপটিক তার দিয়ে নিয়ন্ত্রিত ড্রোন, যেগুলোকে জ্যামিং করে অকার্যকর করা যায় না, সেগুলো বাগদাদে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের একটি ঘাঁটির ওপর দিয়ে উড়ে বেড়াচ্ছিল। এরপর এফপিভি নামে পরিচিত ড্রোনগুলো হঠাৎ নিচে নেমে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। আর সে লক্ষ্যবস্তু হলো, মাটিতে থাকা একটি মার্কিন ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার এবং একটি আকাশ প্রতিরক্ষা রাডার ব্যবস্থা। এটি যুদ্ধের একটি নতুন কৌশল। আর এই কৌশলের প্রয়োগ ঘটছে মধ্যপ্রাচ্যে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে হাজার হাজার মার্কিন সেনা পাঠিয়েছেন। তার সর্বশেষ কূটনৈতিক উদ্যোগ ব্যর্থ হলে তিনি হরমুজ প্রণালি আবার চালু করা এবং ইরানকে যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য করতে স্থল ও নৌ অভিযান পরিচালনার বিষয়টি বিবেচনা করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের এসব মেরিন ও সেনাসদস্যরা ইরানে অবতরণ করলে তাঁরা এমন একটি ড্রোন-নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের মুখোমুখি হবেন, যা ইরাক ও আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের আগের সামরিক অভিযানের সঙ্গে খুব কমই মিল রয়েছে, সেখানে প্রধান হুমকি ছিল ছোট অস্ত্রের গুলি এবং মাটির নিচে পুঁতে রাখা বিস্ফোরক (আইইডি)। যুক্তরাজ্যের বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল মার্টিন স্যাম্পসন বলেন, পারস্য উপসাগরে মোতায়েন করা যেকোনো মার্কিন স্থলসেনা বা যুদ্ধজাহাজ ‘হাতের কাছের লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে গণ্য হবে এবং উভয় পক্ষই এফপিভি ড্রোন ব্যবহারে সক্ষম। বর্তমানে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ নামের একটি চিন্তন প্রতিষ্ঠানের মধ্যপ্রাচ্য শাখার প্রধান হিসেবে আছেন তিন তারকা জেনারেল পদমর্যাদার সাবেক এই বিমানবাহিনী কর্মকর্তা। তিনি আরও বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধে জ্যামারের পাশাপাশি ড্রোনের আক্রমণ ঠেকাতে যানবাহনে যে ধরনের সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে আসা মার্কিন বাহিনী বা তাদের ল্যান্ডিং ক্র্যাফটগুলোয় (উভচর নৌযান) তেমন সরঞ্জামের অভাব রয়েছে। স্যাম্পসন বলেন, ইরান সম্ভবত এ দুর্বলতা আগে থেকেই আঁচ করতে পেরেছে এবং রাশিয়ার কাছ থেকে এ বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে যে কীভাবে এ সুযোগ কাজে লাগানো যায়। তবে এ বিষয়ে পেন্টাগন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তারা বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছে। সেন্টকম মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযান তদারক করে থাকে। সেন্ট্রাল কমান্ডের একজন মুখপাত্রও ইরান কীভাবে ইউক্রেন যুদ্ধের শিক্ষা কাজে লাগাচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এফপিভি ড্রোন ছাড়াও যুদ্ধের কৌশলে আমূল পরিবর্তন এসেছে। ইরানের মতো ইউক্রেনের প্রথাগত নৌবাহিনীও অনেকটা ধ্বংস হয়ে গেছে। তবু তারা সমুদ্রপথে ড্রোন ব্যবহার করে রুশ যুদ্ধজাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে এবং রাশিয়ার ব্ল্যাক সি ফ্লিট বা কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহরকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। ফলে ওদেসার মতো প্রধান বন্দরসহ কৃষ্ণসাগরের পশ্চিমাঞ্চলীয় নৌপথগুলো রুশ নৌবাহিনীর জন্য এখন এক নিষিদ্ধ এলাকা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের সামুদ্রিক ড্রোনগুলো ইউক্রেনের মতো অতটা উন্নত নয় এবং এগুলোয় স্টারলিংকের মতো নেভিগেশন-সুবিধাও নেই। তবু হরমুজ প্রণালির মতো সরু জলপথে এগুলো যুদ্ধজাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। চলতি সপ্তাহে বাগদাদে ইরাকি মিলিশিয়াদের ব্যবহৃত ফাইবার অপটিক তারযুক্ত এফপিভি ড্রোন এবং ইরানের ইসলামি রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কাছে থাকা এ ধরনের বিপুলসংখ্যক ড্রোন একটি উদ্বেগজনক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। কারণ, বর্তমান ইলেকট্রনিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব ড্রোন থামানো সম্ভব নয়।

২০২৪ সালের শেষ দিকে রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলের ইউক্রেনীয় নিয়ন্ত্রিত অংশ পুনর্দখলের অভিযানে ‘ওয়ার গাইডেড’ বা তার–নিয়ন্ত্রিত ড্রোনের বিধ্বংসী ব্যবহার শুরু করে মস্কো। পশ্চিমা ও ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের মতে, মস্কো ইরানের নকশা করা দূরপাল্লার ‘শাহেদ’ ড্রোনগুলোকে আরও আধুনিক ও উন্নত করেছে। পাশাপাশি তেহরানের সঙ্গে সামরিক প্রযুক্তিতে নিবিড় সহযোগিতা এবং কয়েক দশকের মধ্যে ইউরোপের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী (ইউক্রেন) যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বিনিময় করছে রাশিয়া।

কিয়েভভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর ডিফেন্স স্ট্র্যাটেজিস’-এর প্রধান ও ইউক্রেনের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রি জাগোরোদনিয়ুক বলেন, রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে একটি জোট রয়েছে। মিত্র হিসেবে তারা সব সময় সক্রিয়ভাবে অভিজ্ঞতা, গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তি বিনিময় করছে। প্রকৃত মিত্র হিসেবে ইরানিরা এ যুদ্ধের শিক্ষাগুলো গ্রহণ করছেন এবং আরও শেখার চেষ্টা করবেন। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি ইরানের দ্বীপ বা উপকূলীয় এলাকা দখলের জন্য স্থল অভিযানের নির্দেশ দেন, তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী এ নতুন ধরনের যুদ্ধক্ষেত্রের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে তাদের রণকৌশল কতটা পরিবর্তন করেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ বিষয়ে জানাশোনা আছে এমন একজন রুশ শিক্ষাবিদ বলেন, ‘রাশিয়ার মতো একজন ভালো শিক্ষক পেয়েছে ইরান এবং তারা এ যুদ্ধ থেকে শিখতে আগ্রহী। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আমি তেমন আগ্রহ দেখছি না।’ ইউক্রেনের সহায়তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে চলতি মাসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীর ইউক্রেনীয় অভিজ্ঞতার কোনো প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, ‘ড্রোন প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় আমাদের তাদের সাহায্যের দরকার নেই। আমরা ড্রোন সম্পর্কে যে কারও চেয়ে বেশি জানি।’

বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন মেরিন কোর সাম্প্রতিক মাসগুলোয় এফপিভি ড্রোন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছে। তাদের প্রথম এফপিভি দলগুলোকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, যা কেবল প্রাথমিক ধাপ মাত্র। ওয়াশিংটনভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান ‘কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’-এর সিনিয়র ফেলো মাইকেল কফম্যান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইউনিটগুলো এফপিভি প্রযুক্তি এবং বাহিনী ও বর্তমান যুদ্ধকৌশলে এর প্রভাব বোঝার প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ইউক্রেন বর্তমানে যে প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতায় পৌঁছেছে, সেখানে যেতে আমাদের এখনো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।’

যুক্তরাষ্ট্র ও দেশটির নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর শীর্ষ কমান্ডাররা দীর্ঘদিন ধরে ইউক্রেনের এই ড্রোন বিপ্লবের গুরুত্বকে উপেক্ষা করে আসছিলেন। তাদের যুক্তি ছিল, পশ্চিমা সামরিক বাহিনী তাদের আকাশপথের একচ্ছত্র আধিপত্য ও নিখুঁত হামলার সক্ষমতার মাধ্যমে ভিন্ন কায়দায় যুদ্ধ করবে। ভূরাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘রাসমুসেন গ্লোবাল’-এর প্রধান নির্বাহী এবং ন্যাটোর সাবেক নীতি-পরিকল্পনা পরিচালক ফাব্রিস পতিয়ের বলেন, ‘ন্যাটোর শীর্ষ পর্যায়সহ এখনো একধরনের ঔদ্ধত্যের দেয়াল রয়েছে। কারণ, আমাদের অনেক উন্নত ব্যবস্থা আছে। কিন্তু বাস্তবে এখন ইউক্রেনীয়দের চেয়েও এ খাতে বেশি অগ্রগামী হওয়া প্রয়োজন। ইউক্রেনে যা ঘটছে এবং ইরান যেভাবে বিমান হামলা মোকাবিলা করছে, তা একটি সতর্কবার্তা।’ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু হওয়া বিমান হামলা এখন পর্যন্ত পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো বা ইসরায়েলের ওপর পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বন্ধ করতে পারেনি। এমনকি বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল–গ্যাস পরিবহনের পথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতাও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে রণক্ষেত্রের বেশির ভাগ হতাহতের কারণ হিসেবে দেখা গেছে এফপিভি ড্রোনকে। সেখানে যুদ্ধের সম্মুখরেখার উভয় পাশে ২০ মাইলের বেশি এলাকাজুড়ে ড্রোনের এক ‘কিল জোন’ বা মৃত্যুপুরী তৈরি হয়েছে। এ ড্রোনগুলোর বেশির ভাগই এখন ফাইবার অপটিক তারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কিছু মডেলের ড্রোন ৩০ মাইল পর্যন্ত তারের সংযোগ বজায় রাখতে পারে, যা হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশের প্রস্থের সমান।

ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো ও ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখভাগ নিয়মিত পরিদর্শন করা মেরিন কোরের সাবেক পদাতিক কর্মকর্তা রব লি বলেন, ফাইবার অপটিক এফপিভি ড্রোন মোকাবিলার জন্য ইউক্রেনে উদ্ভাবিত সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো, ড্রোনগুলো ওড়ানোর আগেই সংশ্লিষ্ট ড্রোন টিমগুলোকে শনাক্ত করে নির্মূল করা।

নিউইয়র্কভিত্তিক কৌশলগত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘হরাইজন এনগেজ’-এর গবেষণাপ্রধান মাইকেল নাইটস বলেন, দূরপাল্লার অস্ত্র এবং গোয়েন্দা তথ্য ও নজরদারি ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের যে শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে, তা ব্যবহার করে ড্রোন ক্রুদের দমন করা সম্ভব। এই গবেষক আরও বলেন, ‘আমরা যদি হরমুজ প্রণালিতে অভিযান পরিচালনা করি, তবে সেখানে আমাদের অত্যন্ত নিবিড় নিরাপত্তাবলয় থাকবে। যদি ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারে বিশ্বের সবচেয়ে সক্ষম সামরিক বাহিনী ৩০ মাইল বাই ৩০ মাইল একটি এলাকায় নজর দেয়, তবে সেখানে এফপিভি ড্রোন কার্যকরভাবে ব্যবহার করা অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়বে।’

যদিও ইউক্রেনীয়রা এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারছে না। ইউক্রেনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাভলো ক্লিমকিন বলেন, প্রযুক্তিগতভাবে, মানসিকভাবে কিংবা অভিজ্ঞতার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় কোনো সশস্ত্র বাহিনীই এই চ্যালেঞ্জের জন্য প্রস্তুত নয়।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More