ফেরিঘাটে বাসডুবি : ঝিনাইদহে আর ফ্রি চিকিৎসা সেবা দিতে আসবেন না ডাক্তার আয়েশা আক্তার

 

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি: ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার খন্দকবাড়িয়া গ্রামে যেন নেমে এসেছে শোকের ছায়া। যে পরিবারটি ঈদে গ্রামে ফিরে গরিব-দুঃখী মানুষের জন্য ফ্রি চিকিৎসা সেবা দিত, সেই পরিবারের চিকিৎসক মা ও সাত মাসের কন্যাশিশু এখন আর নেই। ফেরিঘাটে যাত্রীবাহী বাস দুর্ঘটনায় তাদের মৃত্যুতে এলাকাজুড়ে চলছে শোকের মাতম।

ঈদের ছুটি শেষে ঢাকায় ফেরার পথে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিতে যাত্রীবাহী বাসটি পানিতে পড়ে যায়। এতে ঝিনাইদহের চিকিৎসক দম্পতি নুরুজ্জামান ও আয়েশা আক্তারের সাত মাসের কন্যা নওয়ারা আক্তারসহ চিকিৎসক মা আয়েশা আক্তার পানিতে তলিয়ে যান।

সৌভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যান নুরুজ্জামান ও তাদের তিন বছরের ছেলে আরশান। স্বজনদের সৌজন্যে যে ছবিটি পাওয়া গেল তাতে চার বছর বয়সী মেয়ে নওয়ারা আক্তারকে কোলে নিয়ে আছেন নুরুজ্জামান। নওয়ারার কানে গোঁজা লাল রঙের ফুল। পাশে দাঁড়ানো স্ত্রী আয়েশা আক্তারের কোলে ৭ মাসের ছেলে আরশান। ঈদে তোলা এই ছবিটি এখন নুরুজ্জামানের কাছে পারিবারিক সুখস্মৃতির সবশেষ স্মারক।

নুরুজ্জামানের বাবা কামরুজ্জামান জানান, সাভার ও মিরপুর সিআরপি হাসপাতালে চাকরি করতেন আয়েশা-নুরুজ্জামান দম্পতি। সন্তানদের নিয়ে ঈদের কয়েকদিন আগে বাড়ি ফেরেন। বুধবার দুপুরে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে।

নাতি-নাতনিকে বিদায় দেয়ার কয়েক ঘণ্টা পর বিকেলে মোবাইল ফোনে নুরুজ্জামানের কল পান কামরুজ্জামান। ওপর পাশ থেকে কাঁদতে কাঁদতে ছেলে জানান, ‘আব্বা আমার সব শেষ। আপনার বৌমা, আরশান পদ্মায় তলিয়ে গেছে।’ কামরুজ্জামানের সঙ্গে ওই ফোনালাপের সময়ই চিপস কিনতে গিয়ে নিজে বেঁচে যাওয়ার কথা জানান নুরুজ্জামান। ঘাটে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর রাত তিনটার দিকে বাসের ভেতর থেকে তার স্ত্রী ও পুত্র সন্তানের লাশ উদ্ধার হয়।

মানবিক চিকিৎসক আয়েশা: প্রতি বছর ঈদের ছুটিতে নুরুজ্জামানের গ্রামের বাড়িতে বিনামূল্যে মেডিকেল ক্যাম্প বসতো। তার ভাতিজা মোবাস্বির আহেমদ বলেন, তার চাচা-চাচি মিলে এ কাজ করতেন। কিন্তু এবার নিজেরা অসুস্থ থাকায় ক্যাম্প করতে পারেননি।

স্থানীয় কয়েকজন জানান, নিহত আয়েশা আক্তার ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও মানবিক একজন চিকিৎসক। ঈদের সময় গ্রামে এলে তিনি বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দিতেন, অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়াতেন।

প্রতিবেশীরা জানান, তিনি শুধু চিকিৎসা দিতেন না, রোগীদের মনোযোগ দিয়ে পরামর্শও দিতেন। তার মৃত্যুতে এলাকার অনেক গরিব মানুষ আজ দিশেহারা, যারা প্রতি ঈদে তার কাছ থেকে সেবা পেতেন।

ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে গত মঙ্গলবার রাতে আত্মীয় বুলবুল আহমেদের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল নুরুজ্জামানের। বলেছিলেন, ‘ভাগনে বুধবার চলে যাচ্ছি। দেখা হবে না।’ বুলবুল বলেন, সেটি ছিল বিদায়ের আগে সৌজন্যতার আলাপ। কয়েক ঘণ্টা পর পরিবারটির হৃদয় বিদারক কোনো ঘটনার কথা শুনতে হবে তা ভাবনাতেও ছিল না। এমন কিছু কেউ আসলে ভাবেও না।

পরিবার জানায়, বুধবার দুপুরে কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিলেন তারা। পরে দুর্ঘটনার খবর আসে ফেরিঘাট থেকে। তলিয়ে যাওয়া বাসটি বৃহস্পতিবার উদ্ধার হয়েছে। আয়েশা-আরশানসহ শনাক্ত হয়েছে ২৬ জনের মরদেহ। এই ঘটনায় পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া, থেমে গেছে এক মানবিক চিকিৎসা সেবার পথচলা।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More