অবৈধ হাসপাতাল নিয়ে হার্ডলাইনে সরকার শুরু হচ্ছে অভিযান

 

স্টাফ রিপোর্টার: সারাদেশের বিভিন্ন স্থানের অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার নিয়ে হার্ডলাইনে যাচ্ছে সরকার। অবৈধ স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে আগামী রোববার (২৯ মার্চ) থেকে নিয়মিত অভিযানে যাবে দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে সারাদেশে নির্দেশনা পাঠিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, মানুষের আস্থা বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষের নিরাপদ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে এই অভিযান পরিচালনা করা হবে। সেই সঙ্গে দেশজুড়ে অবৈধ ও মানহীন হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান শুরু হবে। যাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম, লাইসেন্সবিহীন কার্যক্রম এবং নি¤œমানের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

স্বাস্থ্য বিভাগের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারাদেশে ১ হাজার ২৮৫টি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার অবৈধভাবে চলছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪১৫টি অবৈধ প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিভাগে। এরপর রংপুরে ১১১, ময়মনসিংহে ২৫২, রাজশাহীতে ৫৫, চট্টগ্রামে ২৪০, বরিশালে ৪৮, খুলনায় ১৫৬ এবং সিলেটে রয়েছে ৮টি।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে আরও জানা গেছে, সারাদেশে অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে বিভিন্ন হাসপাতালের অনিয়ম দূরীকরণ এবং স্বাস্থ্য খাতে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা হবে। অভিযানের অংশ হিসেবে লাইসেন্স যাচাই, চিকিৎসা সরঞ্জামের মান পরীক্ষা, স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ এবং চিকিৎসকদের বৈধ সনদপত্র যাচাই করা হবে। যেখানে অনিয়ম পাওয়া যাবে, সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে জরিমানা, সিলগালা বা কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়ার মতো ব্যবস্থা নেয়া হবে। সেই সঙ্গে ভুয়া ডাক্তার, নার্স ও মেডিকেল টেকনিশিয়ানদের বিরুদ্ধেও যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের নিষ্ক্রিয়তা ও তৎপরতার অভাবে সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাঙের ছাতার মতো হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠছে। স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম নিয়ে যখনই কোনো আলোচনা ওঠে, তখনই শুধু অভিযান পরিচালনা করা হয়। কিছুদিন পর আবার অদৃশ্য কারণে অভিযান থেমে যায়। তাই অভিযান নিয়মিতভাবে পরিচালনা করতে হবে। সেই সঙ্গে বেআইনি কোনো ঘটনা যেন না ঘটে, সে ব্যাপারেও মনোযোগ দিতে হবে।

তারা আরও বলেন, এ ধরনের অভিযান নিয়মিতভাবে পরিচালিত হলে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষও নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে আস্থা ফিরে পাবে। মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে কোনো ছাড় দেয়া যাবে না। ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে কোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিক পরিচালনা করতে দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে দেশের স্বাস্থ্যসেবায় সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. লেনিন চৌধুরী ঢাকা মেইলকে বলেন, অবৈধ হাসপাতাল কেন হয়, এর কারণ খুঁজে বের করতে হবে। যারা হাসপাতালের লাইসেন্স দিচ্ছেন, সেখানে কোনো অনিয়ম হচ্ছে কি না, অথবা এমন কোনো শর্ত আছে কি না, যার কারণে লাইসেন্স পেতে দেরি হয়—সেগুলোও দেখতে হবে। প্রত্যেকটি হাসপাতালের অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট মান থাকতে হবে। সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় লোকবল ঠিকমতো আছে কি না, সেটিও যাচাই করতে হবে।

তিনি বলেন, যারা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠান করবেন, তাদের পটভূমিও খতিয়ে দেখতে হবে। দেখা যায়, কেউ আগে মুদি দোকান করতেন, পরে অর্থবিত্ত হওয়ার পর হাসপাতাল করতে চান; এ ধরনের প্রবণতা নিরুৎসাহিত করা দরকার। মেডিকেল সংশ্লিষ্ট বা হাসপাতাল পরিচালনায় সক্ষম ব্যক্তিদেরই হাসপাতাল পরিচালনার অনুমতি দেয়া উচিত। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দায়িত্ব হবে নিয়মিত অভিযান ও পর্যবেক্ষণ করা।

অধ্যাপক ডা. লেনিন চৌধুরী আরও বলেন, ভুয়া ডাক্তার, নার্স ও মেডিকেল টেকনিশিয়ানদের মাধ্যমে প্রতারণা করা হচ্ছে। যারা প্রকৃতপক্ষে ডাক্তার, নার্স বা মেডিকেল টেকনিশিয়ান না হয়েও পরিচয় দিচ্ছেন, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে। এই কার্যক্রমে স্থানীয় সরকার এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদেরও যুক্ত করা দরকার। একজন কমিশনার বা মেম্বার এলাকার নতুন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে খোঁজখবর রাখতে পারেন। নতুন কেউ এলে যাচাই-বাছাই করতে হবে। যারা ভুয়া ডাক্তার, নার্স বা মেডিকেল টেকনিশিয়ান নিয়োগ দেন, তাদেরও সচেতন করতে হবে এবং আইনের আওতায় আনতে হবে।

জানতে চাইলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, কিছু সময় ধরে ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু এবং ভুল চিকিৎসার খবর পাওয়া যাচ্ছে। অনিবন্ধিত হাসপাতাল ও ভুয়া চিকিৎসক দিয়ে অস্ত্রোপচার করাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। এসব বিষয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। অবৈধ ও মানহীন হাসপাতাল বন্ধ করে দিতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে, যাতে দেশের স্বাস্থ্য খাত মানুষের আস্থা ও ভরসার ঠিকানা হয়ে ওঠে।

তিনি আরও বলেন, সরকারি হাসপাতালের দালাল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এই সিন্ডিকেট সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগীদের মানহীন ও অবৈধ হাসপাতালে পাঠায়। পরে রোগীরা সেখানে গিয়ে প্রতারিত হন। রোগীদেরও সচেতন থাকতে হবে—কার কাছে চিকিৎসা নেবেন এবং হাসপাতালের মান কেমন। বিভিন্ন বিষয় পর্যবেক্ষণ করে চিকিৎসা নিতে হবে। কারণ, ভুল চিকিৎসা বা ভুল ওষুধ প্রয়োগে জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই রোগী ও তাঁদের স্বজনদের সচেতন হওয়া জরুরি।

জানা গেছে, গত ২৩, ২৪ ও ২৫ মার্চ এই তিন দিনে ১৬টি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করার পেছনে বেশ কয়েকটি গুরুতর অনিয়ম পাওয়া গেছে। পরিদর্শনকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও তদন্তকারী দল এসব প্রতিষ্ঠানে গুরুতর অনিয়ম শনাক্ত করেন। পরিদর্শনের সময় কয়েকজন ব্যক্তিকে পাওয়া যায়, যারা ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছিলেন। কিছু হাসপাতালে কোনো অনুমোদিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না। হাসপাতালের পরিবেশ অত্যন্ত নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পাওয়া গেছে, যা রোগীদের মধ্যে নতুন করে জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করছিল।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সর্দার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, যেকোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিক ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবার মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দেয়া হবে। কোনো ধরনের ছাড় দেয়া হবে না। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করতে কোনো আপস করা হবে না।

তিনি আরও জানান, রাজধানী থেকে শুরু হওয়া এই অভিযান ধাপে ধাপে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত করা হবে। একই সঙ্গে যারা অবৈধভাবে হাসপাতাল বা ক্লিনিক পরিচালনা করছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

 

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More