মেধার আলোয় আলোকিত এক মানবিক আয়োজন

আফিয়া নূর ফাউন্ডেশনের আফিয়া নূর বৃত্তি প্রকল্প’র বৃত্তি প্রদান : 

রহমান মুকুল / শরিফুল ইসলাম রোকন: শুক্রবার আলমডাঙ্গার প্রভাত যেন একটু আলাদা ছিল মডেল মসজিদের হলরুমে জড়ো হয়েছিল শত স্বাপ্নিক মুখ, ফুটেছিল সহস্র সম্ভাবনার শতদল। মেধা, মনন আর মানবিকতার এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হয় আফিয়া নূর ফাউন্ডেশনের ‘আফিয়া নূর বৃত্তি প্রকল্প’র বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠান।

গতকাল শুক্রবার সকালে আলমডাঙ্গা মডেল মসজিদের হলরুমে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে উপজেলার বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেয়া হয় বৃত্তি, ক্রেস্ট ও সনদ। বেসরকারি উদ্যোগে জেলায় এটিই সবচেয়ে বৃহৎ পরিসরে বৃত্তি প্রদান কর্মসূচি এমনটাই জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

আফিয়া নূর ফাউন্ডেশন ট্যালেন্টপুল, প্রথম গ্রেড, সাধারণ গ্রেড ও বিশেষ বৃত্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের এই উদ্যোগ নেয়। ১ম থেকে ৩য় শ্রেণি, ৪র্থ থেকে ৬ষ্ঠ শ্রেণি, ৭ম থেকে ৯ম শ্রেণি এবং নুরানী বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মোট ১৮০ জন শিক্ষার্থীকে এই বৃত্তি প্রদান করা হয়। বিভিন্ন শ্রেণিতে বৃত্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছে ১ম শ্রেণিতে ২১ জন, ২য় শ্রেণিতে ২৬ জন, ৩য় শ্রেণিতে ১৫ জন, ৪র্থ শ্রেণিতে ২০ জন, ৫ম শ্রেণিতে ২২ জন, ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ১৮ জন, ৭ম শ্রেণিতে ১৩ জন, ৮ম শ্রেণিতে ১৪ জন এবং ৯ম শ্রেণিতে ৭ জন শিক্ষার্থী। নুরানী বিভাগেও ১ম শ্রেণিতে ১০ জন, ২য় শ্রেণিতে ৭ জন ও ৩য় শ্রেণিতে ৭ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি লাভ করে।

প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানে দ্যূতি ছড়িয়েছেন চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাড. মাসুদ পারভেজ রাসেল। তিনি বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের হাতে সম্মাননা তুলে দিয়ে বলেন, একটি শিক্ষিত জাতি গঠনের জন্য মেধাবী শিক্ষার্থীদের যথাযথ মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আফিয়া নূর ফাউন্ডেশন সেই দায়িত্বশীল কাজটি করে যাচ্ছে, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তিনি তরুণ প্রজন্মকে মাদক থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘মাদক আজ সমাজের ভয়াবহ ব্যাধি। এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সচেতন হতে হবে।  মোবাইল ও অনলাইন গেমস প্রসঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রযুক্তি যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনি এর অপব্যবহার মারাত্মক ক্ষতিকর। সময় নষ্ট না করে প্রযুক্তিকে শিক্ষার সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে তিনি নৈতিক শিক্ষা ও ধর্মীয় মূল্যবোধে সন্তানদের গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

আফিয়া নূর ফাউন্ডেশনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক নূর মোহাম্মদ হুসাইন টিপুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা জামায়াতের আইন ও আদালত বিষয়ক সম্পাদক ও নাগদাহ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান দারুস সালাম, উপজেলা জামায়াতের আমির ও আলমডাঙ্গা মহিলা ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক শফিউল আলম বকুল, ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা ও রূপালী ব্যাংক আলমডাঙ্গা শাখার ম্যানেজার আব্দুল খালেক, ফাউন্ডেশনের সদস্য সচিব ডাক্তার আব্দুল্লাহ আল মামুন, আলমডাঙ্গা সরকারি কলেজ শিক্ষক তাপস রশীদ, হাটবোয়ালিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী অধ্যাপক আসিফ জাহান, সহকারী অধ্যাপক আব্দুল কুদ্দুস, প্রভাষক আব্দুল হাই, আলমডাঙ্গা কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও কলেজিয়েট স্কুলের উপাধ্যক্ষ শামীম রেজা, আলমডাঙ্গা বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার আব্দুল্লাহ আল মামুন, যুগ্ম সদস্য সচিব ও অক্সফোর্ড একাডেমির প্রধান শিক্ষক ইলোরা নাজনীন।

নওলামারী আলিম মাদরাসার প্রভাষক মাওলানা সাহিন সাহিদের উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন নওলামারী আলিম মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল আব্দুল লতিফ, আল আরাফা (প্রাঃ) হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিরাজুল ইসলাম, উপজেলা জামায়াতের আমির মামুন রেজাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, ব্যবসায়ী, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকবৃন্দ।

আফিয়া নূর ফাউন্ডেশনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক নূর মোহাম্মদ হুসাইন টিপু বলেন, মেধা কখনো অবহেলার বিষয় নয়। সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে এই শিক্ষার্থীরাই ভবিষ্যতে দেশকে এগিয়ে নেবে। সমাজের সব স্তরের মানুষকে এ ধরনের উদ্যোগে এগিয়ে আসতে হবে।

বিশেষ অতিথি সংগঠনের সদস্য সচিব ডাক্তার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, শুধু বৃত্তি প্রদান নয়, আমরা একটি আলোকিত প্রজন্ম গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখি। আফিয়া নূরের স্মৃতি আমাদের অনুপ্রেরণা এই শিশুদের মধ্যেই আমরা ভবিষ্যতের সম্ভাবনা দেখি। সমাজের বিত্তবান ও সচেতন মানুষ এগিয়ে এলে এমন উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করা সম্ভব।

বিশেষ অতিথি আলমডাঙ্গা সরকারি কলেজের প্রভাষক তাপস রশীদ বলেন, মেধার সঠিক মূল্যায়নই একটি জাতির অগ্রগতির মূল চাবিকাঠি। আজ যারা বৃত্তি পেল, তাদের দায়িত্ব আরও বেড়ে গেল। তাদেরকে শুধু ভালো ফল নয়, ভালো মানুষ হিসেবেও গড়ে উঠতে হবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা। বিশেষ অতিথি সহকারী অধ্যাপক কবি আসিফ জাহান বলেন, জ্ঞান-বিজ্ঞান,প্রযুক্তি,শিল্প-সাহিত্যে বিশ্বকে ডমিনেট করতে সক্ষম, এমন প্রজন্ম গড়ে তুলতে হবে। পঠন-পাঠনমুখি জ্ঞাননির্ভর প্রজন্ম গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য আফিয়া নুর ফাউন্ডেশন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করবে। প্রসঙ্গত, এই ফাউন্ডেশনের পেছনে রয়েছে এক বেদনাময় কিন্তু অনুপ্রেরণার গল্প। চার বছর বয়সী আফিয়া নূর—শেখ নূর মোহাম্মদ হোসাইন টিপুর ছোট মেয়ে ২০২৩ সালের ২৯ নভেম্বর এক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়। আদরের মেয়ের স্মৃতিকে অমর করে রাখতে তার নামেই গড়ে ওঠে এই ফাউন্ডেশন। একটি ছোট্ট প্রাণের হারিয়ে যাওয়া যেন শত শত শিশুর জীবনে আলো হয়ে ফিরে এসেছে। আফিয়া নূরের স্মৃতি আজ আর শুধু একটি নাম নয় এটি এখন মেধার সম্মান, মানবতার উদাহরণ এবং ভবিষ্যতের প্রতি এক উজ্জ্বল অঙ্গীকার।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More