যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে হুতিরা : ড্রোন দিচ্ছে রাশিয়া 

ইসরাইলে সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ

স্টাফ রিপোর্টার: ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে ইয়েমেনের হুতিরা। তারা শনিবার ইসরাইলে সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এর মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধে নিজেরা অংশগ্রহণের কথা নিশ্চিত করেছে। ফলে বিপদ বাড়ছে ইসরাইলের। ইরান, লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি- কাকে রেখে কাকে সামাল দেবে নেতানিয়াহুর সরকার! সেই সঙ্গে আছে রাশিয়ার সরাসরি ইরানকে দেয়া সমর্থন। ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহৃত শাহেদ ড্রোনের উন্নত সংস্করণও ইরানে পাঠাচ্ছে তারা। বলাবলি আছে, চীনও সমর্থন দিচ্ছে ইরানকে। আর উত্তর কোরিয়া তো সুযোগ খুঁজছেই। এখানেই শেষ নয়। একদিকে ইরান বন্ধ করে দিয়েছে হরমুজ প্রণালি। অন্যদিকে লোহিত সাগর উপকূলে অবস্থিত ইয়ানবু বন্দর বন্ধ করে দিতে পারে ইয়েমেনের হুতিরা। সঙ্গে তারা বন্ধ করে দিতে পারে বাব আল মানদাব প্রণালি। এমনটা ঘটলে বিশ্ব বাণিজ্য অচল হয়ে পড়তে পারে। ইয়ানবু বন্দর দিয়ে একটি পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ দেয়া হয়। হুতিরা যদি এই বন্দরটি নিয়ন্ত্রণে নেয়, বাব আল-মানদাব প্রণালি বন্ধ করে দেয় তাহলে এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের শুরু পর্যন্ত লোহিত সাগরে চলাচলকারী জাহাজে প্রায় ২০০ হামলা চালিয়েছে হুতিরা। তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩০টির বেশি জাহাজ। এবার যদি হুতিরা এই বাব আল মানদাব প্রণালিটি বন্ধ করে দেয়, তাহলে বিশ্ব বাণিজ্যে ভয়াবহ এক বিপর্যয় নেমে আসবে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে ইরান ‘শাহেদ’ ড্রোন দিয়ে সহায়তা করেছে। সেটা ব্যবহার করে রাশিয়া ‘শাহেদ’ ড্রোনকে আরও উন্নত করেছে। সেই উন্নত সংস্করণের ড্রোন তারা ইরানকে পাঠাচ্ছে। মার্কিন ও ইউরোপীয় কর্মকর্তারা এ সপ্তাহে এ তথ্য জানিয়েছেন। মূলত ইরানের তৈরি অত্যাধুনিক শাহেদ ড্রোনই ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহার করে আসছিল রাশিয়া। তবে এ ড্রোনে এখন জেট ইঞ্জিন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নেভিগেশন, উন্নত জ্যামার-প্রতিরোধী ব্যবস্থা ও স্টারলিংক ইন্টারনেট ডিভাইস যুক্ত করে আরও শক্তিশালী করেছে মস্কো। সেই উন্নত ড্রোনই এখন তেহরানে পাঠানো হচ্ছে। আজারবাইজান হয়ে মানবিক সহায়তার নামে ট্রাকে করে এই ড্রোন পরিবহন করা হচ্ছে বলে ধারণা করছেন ইউরোপীয় কর্মকর্তারা। তবে চালানটি কত বড় এবং এটি একবারে সরবরাহ করা নাকি ধারাবাহিকভাবে করা সরবরাহের অংশ, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এ খবরকে ‘মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেন, অন্য কোনো দেশ ইরানকে যা-ই সরবরাহ করুক না কেন, তা আমাদের অভিযানের সাফল্যে কোনো প্রভাব ফেলবে না। আগে থেকেই লেবাননের যোদ্ধাগোষ্ঠী হিজবুল্লাহ এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। তার সঙ্গে শনিবার হুতিরা জড়িয়ে পড়ায় যুদ্ধের পরিধি আরও বেড়ে গেছে। যুদ্ধ বন্ধে পাকিস্তান, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশ যখন মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তখন এ খবর নিশ্চয়ই আতঙ্ক বাড়ায়। এক বিবৃতিতে হুতিরা জানায়, ‘ইয়েমেনি সশস্ত্র বাহিনী মহান আল্লাহ্র সহায়তায়, দক্ষিণে দখলীকৃত ফিলিস্তিনে অবস্থিত সংবেদনশীল ইসরাইলি সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রথম সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে।’ ইসরাইল ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ) আগে জানিয়েছিল, ইয়েমেন থেকে ইসরাইলের দিকে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে এবং তা প্রতিহত করার চেষ্টা চলছিল। হুতিদের বিবৃতিতে বলা হয়, তাদের ‘এই হামলা ছিল ক্রমাগত সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি, অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা এবং লেবানন, ইরান, ইরাক ও ফিলিস্তিনে আমাদের ভাইদের বিরুদ্ধে অপরাধ ও গণহত্যার’- বদলা। এর আগে এক হুতি কর্মকর্তা সিএনএনকে জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল তাদের হামলা বাড়ালে তারা ইরানের পক্ষে যুদ্ধে যোগ দিতে প্রস্তুত। ইয়েমেন উপকূলের বাব আল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগরকে বৈশ্বিক বাণিজ্যপথের সঙ্গে যুক্ত করে। এই প্রণালি বন্ধ করে দেয়াও ‘বাস্তবসম্মত বিকল্প’- বলে জানিয়েছেন হুতিদের তথ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ মনসুর। ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত হুতি গোষ্ঠী ‘আনসার আল্লাহ’ নামেও পরিচিত। ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের একটি প্রধান পক্ষ তারা। ১৯৯০-এর দশকে তাদের উত্থান ঘটে। তখন নেতা হুসেইন আল-হুতি ‘বিলিভিং ইয়ুথ’- নামে একটি ধর্মীয় আন্দোলন শুরু করেন। আল-হুতির আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল জুদাইজমের প্রতিনিধিত্ব করা এবং সৌদি আরব থেকে আসা ওয়াহাবি মতাদর্শসহ কট্টরপন্থি সুন্নিবাদের বিরোধিতা করা। তার অনুসারীরাই পরে ‘হুতি’ নামে পরিচিত হয়। ২০১৪ সালে হুতিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সৌদি সমর্থিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। ২০১৫ সালে সৌদি-নেতৃত্বাধীন জোট হস্তক্ষেপ করলে সংঘাত বড় আকার ধারণ করে। ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি হলেও ছয় মাস পর তা ভেঙে যায়, তবে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ আর শুরু হয়নি। হুতিরা ইরানের সমর্থন পায়। ২০১৪ সালে গৃহযুদ্ধ তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরান তাদের সহায়তা বাড়ায়। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ২০২১ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান হুতিদের সমুদ্র মাইন, ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে। হুতিরা ইরানের তথাকথিত ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’-এর অংশ। এটি ইসরাইল ও পশ্চিমবিরোধী আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর একটি জোট।

মার্কিন কর্মকর্তারা লক্ষ্য করেছেন যে, হুতিদের নিজস্বভাবে তৈরি ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা, নির্ভুলতা ও ধ্বংসক্ষমতা ক্রমাগত বাড়ছে। শুরুতে তারা ইরানি উপাদানগুলো গোপনে এনে সংযোজন করে অস্ত্র তৈরি করে। তারা অতীতে ড্রোন ও জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার পর লোহিত সাগরে অবস্থানরত মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস কার্নি জরুরি সহায়তা সংকেতে সাড়া দিয়েছিল।

টিম লিস্টার সিএনএন-এ লিখেছেন, হুতিদের যুদ্ধে যোগদান মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানি ও সমুদ্রপথে পরিবহনকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। হরমুজ প্রণালি এক মাস ধরে কার্যত বন্ধ রয়েছে। এখন হুতিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালিকেও হুমকির মুখে ফেলতে পারে, যা লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরকে যুক্ত করেছে। ‘বাব আল-মান্দেব’ অর্থ ‘অশ্রুর দ্বার’। কঠিন নৌপথের কারণে এর এমন নাম। এর সবচেয়ে সরু অংশ মাত্র ২৯ কিলোমিটার। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের প্রথম ১১ মাসে এই প্রণালি দিয়ে ৩০ মিলিয়ন টনের বেশি প্রাকৃতিক গ্যাস এবং বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় ১২ ভাগ সরবরাহ করা হয়েছে। গাজায় ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবরের হামলার পর ইসরাইল সামরিক অভিযান শুরু করলে হুতিরা লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে।

গত নভেম্বর হামলা স্থগিতের ঘোষণা দেয়ার আগে তারা ১০০টির বেশি জাহাজে আঘাত হানে। এই হামলার কারণে শত শত জাহাজ আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যেতে বাধ্য হয়। ফলে সময় ও খরচ বেড়ে যায়। হুতিদের তথ্য মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মোহাম্মদ মনসুর আবারও বলেছেন, এই প্রণালি বন্ধ করা ‘বাস্তবসম্মত বিকল্প’। ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম এক সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, যদি যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি খুলতে চেষ্টা করে, তাহলে ‘আরও একটি প্রণালি সংকটের মুখে পড়তে পারে’ এবং ইরান পরিস্থিতি আরও তীব্র করতে প্রস্তুত। হরমুজে চলাচল কমে যাওয়ায় সৌদি আরব এখন তাদের তেল রপ্তানি পশ্চিম উপকূলের ইয়ানবু বন্দরে পাইপলাইনের মাধ্যমে পাঠাচ্ছে। এর সক্ষমতা দৈনিক ৭ মিলিয়ন ব্যারেল। ফলে লোহিত সাগরে তেলবাহী জাহাজ চলাচল বেড়ে গেছে।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More