এখনো অক্ষত ইরানের অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র

স্টাফ রিপোর্টার: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক সামরিক হামলার পরও ইরানের অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা এখনো অক্ষত রয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সাম্প্রতিক মূল্যায়নে এ তথ্য উঠে এসেছে। এদিকে গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের দুটি যুদ্ধবিমান ধ্বংসের দাবি করেছে ইরান। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে আধুনিক পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান এফ-৩৫। এ ছাড়াও কুয়েতে তেল শোধনাগার, সংযুক্ত আরব আমিরাতের গ্যাস প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্র ও মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওরাকলের ডেটা সেন্টারে হামলা চালিয়েছে ইরান। জবাবে বিমান হামলা চালিয়ে ইরানে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে উঁচু সেতু বি-১ ধ্বংস করেছে মার্কিন-ইসরায়েলি বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এবার ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুতে হামলা চালানো হবে। জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা চালিয়ে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যাবে না। এদিকে যুদ্ধের মাঝেই মার্কিন সেনাপ্রধান ও অ্যাটর্নি জেনারেলকে বরখাস্ত করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ইরানের প্রায় অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা (লঞ্চার) এখনো অক্ষত রয়েছে। পাশাপাশি দেশটির অস্ত্রভান্ডারে হাজার হাজার ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক ড্রোন মজুত আছে। ইরান এখনো পুরো অঞ্চলে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি করার সক্ষমতা ধরে রেখেছে। কিছু লঞ্চার হামলার কারণে মাটির নিচে চাপা পড়ে গেছে বা অচল হয়ে পড়েছে, তবে সেগুলো পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা- ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের একটি বড় অংশ অক্ষত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এসব উপকূলীয় সামরিক স্থাপনায় তুলনামূলক কম হামলা চালানোয় এগুলো রক্ষা পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের ৩৫তম দিনেও ড্রোন ও মিসাইল হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান। গতকালও ইসরায়েলের বিভিন্ন শহর লক্ষ্য করে ড্রোন ও মিসাইল ছুড়ে আইআরজিসি। এ ছাড়াও উপসাগরীয় এলাকায় দুটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ধ্বংসের দাবি করেছে দেশটি। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক পঞ্চম প্রজন্মের একটি যুদ্ধবিমান এফ-৩৫ ধ্বংস করা হয়। আইআরজিসি জানায়, তারা যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় আরেকটি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। যুদ্ধবিমানটি যখন মধ্য ইরানের ওপর দিয়ে উড়ছিল, তখন সেটিকে গুলি করে নামানো হয়। এতে বিমানটি ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ হয়েছে। বিমানটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পাইলট সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। এর আগে, পারস্য উপসাগরের কেশম দ্বীপের দক্ষিণে ‘শত্রুপক্ষের’ একটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করে আইআরজিসি। পৃথক বিবৃতিতে তারা জানায়, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সফলভাবে যুদ্ধবিমানটিকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। তবে বিমানটি ঠিক কোন দেশের, বিবৃতিতে তা সুনির্দিষ্টভাবে জানানো হয়নি। এ ছাড়াও কুয়েতের প্রধান তেল শোধনাগার মিনা আল-আহমাদি শোধনাগার ও রপ্তানি কেন্দ্রে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। কুয়েত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলার ফলে শোধনাগারের কয়েকটি ইউনিটে আগুন ধরে যায়। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। সংযুক্ত আরব আমিরাতেও প্রধান গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র হাবশান গ্যাস কমপ্লেক্সে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।আকাশপথে আসা একটি ক্ষপণাস্ত্র বা ড্রোন প্রতিহত করার পর সেটির ধ্বংসাবশেষ আছড়ে পড়লে এ আগুনের সূত্রপাত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গ্যাসক্ষেত্রের সব ধরনের কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে। এ ছাড়াও দুবাইয়ে মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওরাকলের একটি ডেটা সেন্টারে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। তবে ডেটা সেন্টারে হামলার দাবি নাকচ করেছে দুবাই মিডিয়া অফিস। সংস্থাটি জানিয়েছে, আমিরাতের কোনো ডেটা সেন্টারে হামলার খবর সঠিক নয়। এর আগে বাহরাইনে এডব্লিউএসের (অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিস) একটি ডেটা সেন্টারেও হামলা চালানোর দাবি করেছে আইআরজিসি। আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গতকাল ইরান থেকে আমিরাত লক্ষ্য করে ১৮টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ৪টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৪৭টি ড্রোন ছোড়া হয়। সবই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে প্রতিহত করা হয়েছে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানের কারাজ, বুশেহর ও কেশম দ্বীপে বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন-ইসরায়েলি বাহিনী। বিমান হামলায় কারাজ শহরের বি-১ সেতুর মধ্যভাগ ভেঙে পড়ে। এতে আটজন নিহত ও ১০০ জন আহত হয়েছেন। দক্ষিণ ইরানের বুশেহর প্রদেশের চোগাদাক এলাকায় রেড ক্রিসেন্টের একটি গুদামে ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে, যাতে দুটি কনটেইনার ধ্বংস হয়েছে। কেশম দ্বীপের বন্দর এলাকা থেকেও ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে, যা হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্বকে আরও সামনে এনেছে। এবার ইরানের সেতু-বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালানো হবে, বললেন ট্রাম্প : ইরানে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে উঁচু সেতুতে হামলার ভিডিও প্রকাশ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এবার ইরানের সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালানো হবে। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প বলেন, ইরানে যা অবশিষ্ট আছে, তা ধ্বংস করা আমরা এখনো শুরু করিনি। এরপর লক্ষ্য হবে সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র। ইরানের নেতৃত্ব জানে কী করতে হবে এবং তা দ্রুত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, মার্কিন সেনাবাহিনী বিশ্বে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে শক্তিধর। তারা এবার ইরানের সেতুগুলোকে, তারপর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে। টাইম সাময়িকীকে দেয়া পৃথক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইসরায়েল খুব ভালো সহযোগী, আমি যা বলব তারা সেটাই করবে। আমি যখন থামব, ওরাও তখনই থামবে। উসকানি না পেলে তারা লড়াই থামিয়ে দেবে। তবে উসকানি দেয়া হলে তাদের সামনে কোনো পথ থাকবে না। মোদ্দাকথা হলো, আমি থামলে ওরাও থামবে। বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক পতনের বার্তা, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী : ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলা দেশটির নৈতিক পতনের বার্তা। বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা চালিয়ে তারা ইরানকে পিছু হটাতে পারবে না। গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি ক্ষতিগ্রস্ত সেতুর ছবি দিয়ে তিনি বলেন, বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা, নির্মাণাধীন সেতুগুলোতে হামলা চালিয়ে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যাবে না। এ ধরনের কর্মকাণ্ড শত্রুর পরাজয় এবং নৈতিক পতনের বার্তা দেয়। কুয়েতের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পানি শোধনাগারে হামলা, ইসরায়েলকে দুষছে ইরান : কুয়েতের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পানি শোধনাগারে (লবণাক্ত পানি স্বাদু করার স্থাপনা) হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে এই হামলার জন্য ইসরায়েলকে দুষছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। তাদের দাবি, ইসরায়েল এই অবৈধ হামলা চালিয়েছে। এ ধরনের হামলা জায়নবাদী দখলদারি ইসরায়েলের নীচুতাকে তুলে ধরে। আইআরজিসি এমন অমানবিক কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানায়। আইআরজিসির বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মার্কিন ঘাঁটি ও সামরিক সদস্য এবং অধিকৃত ফিলিস্তিনি অঞ্চলে জায়নবাদী শাসনের সামরিক ও নিরাপত্তা কেন্দ্র আইআরজিসির হামলার লক্ষ্যবস্তু। মার্কিন সেনাপ্রধান ও অ্যাটর্নি জেনারেলকে বরখাস্ত : যুদ্ধের মাঝেই মার্কিন সেনাপ্রধান ও অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডিকে বরখাস্ত করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। গতকাল মার্কিন সেনাপ্রধান জেনারেল র্যান্ডি জর্জকে বরখাস্ত করেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। পেন্টাগনের শীর্ষ পর্যায়ে বড় ধরনের রদবদলের অংশ হিসেবে তাকে বরখাস্ত করা হয়। তবে পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল এক বিবৃতিতে জানান, জর্জ ৪১তম চিফ অব স্টাফের দায়িত্ব থেকে অবসর নিয়েছেন। এর পরপরই অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডিকে বরখাস্তের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া পোস্টে তিনি জানান, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ সাময়িকভাবে অন্তর্বর্তী অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তবে বন্ডিকে সরানোর নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করেননি ট্রাম্প। স্থল অভিযান হলে কোনো শত্রুসেনাই যেন জীবিত না ফেরে, কমান্ডারদের ইরানি সেনাপ্রধান : যেকোনো হামলার জন্য ইরানি কমান্ডারদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়ে দেশটির সেনাপ্রধান আমির হাতামি বলেছেন, প্রতিপক্ষ যদি স্থল অভিযান চালানোর চেষ্টা করে, তাহলে কোনো শত্রুসেনাই যেন জীবিত না ফেরে। শত্রুর প্রতিটি পদক্ষেপ ও কার্যক্রম অত্যন্ত সতর্কতা ও নিখুঁতভাবে, নজরদারি করা জরুরি। পাশাপাশি তাদের হামলার কৌশলের বিরুদ্ধে যথাসময়ে প্রতিরোধমূলক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More