পেটের ক্ষুধা মেটাতে ১২ বছরের আব্দুর রহমান ও ৭ মাসের আব্দুল্লাহ কে নিয়ে পথে পথে ঘোরে পঙ্গু মা আমিনা।জোটেনি প্রতিবন্ধি ভাতা।

ইসলাম রকিব: সাতক্ষিরা জেলার মাধবকাঠির বলেঙ্গা গ্রাম থেকে যশোর মনিরামপুরের বাদাম বিক্রেতা আক্তার বিশ্বাসের সাথে ১৩ বছর আগে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন আমিনা খাতুৃন(৩১)। বাবার অভাবের সংসার থেকে দরিদ্র বাদাম বিক্রেতা স্বামী আক্তারের সংসারে এসেও পিছু ছাড়েনি ভয়াবহ দারিদ্রতা।আমিনার স্বপ্ন ছিল স্বামীকে নিয়ে ছোট্ট একটি সংসার হবে। সংসারে থাকবে দুটি সন্তান। তাদের লেখা-পড়া করানো হবে। স্বামী সন্তানদের নিয়ে গড়ে তুলবে একটি ছোট্ট সুখের সংসার। সে স্বপ্ন নিয়ে সাতক্ষিরা থেকে আমিনা খাতুন স¦ামী আক্তার বিশ্বাসের হাত ধরে চলে আসেন যশোহর শহরে। থাকতেন একটি জীর্ণ বস্তিতে। স্বামীর বাদাম বিক্রির টাকা দিয়ে কোন মতে চলতো তাদের সংসার। বছর ঘুরতে না ঘুরতে আমিনার কোল ঝুড়ে আসে আব্দুর রহমান। তাইতো স্বামীর স্বপ্ল আয় থেকে কিছু কিছু টাকা জমাতে থাকে আমিনা খাতুন।স্বপ্ন অনুযায়ী ২০১৮ সালে খুলনার শিরোমনির গিলাতলা মোহাম্মদীয়া হাফেজিয়া মাদরাসায় ভর্তি করান আব্দুর রহমানকে। ট্রেনে ট্রেনে বাদাম বিক্রি করার ফাঁকে ফাঁকে ট্রেন যোগে খুলনায় আব্দুর রহমানকে দেখা ও মাঝে মাঝে পড়ার খোঁজ-খবর নেওয়াও চলছিল। কষ্ট হলেও নিজেদের অর্জিত আয় থেকে ছেলেকে লেখা-পড়া করনোর আনন্দটা সকল কষ্টকে ভুলিয়ে রাখতো। কিন্তু ২০১৯ সালের মার্চে সারাদেশে করোনা ছড়িয়ে পড়লে আব্দুর রহমানকে মাদরাসা থেকে বাড়ি চলে আসতে বলে কর্তৃপক্ষ। আব্দুর রহমান হাফেজিয়া পড়ার পাশা-পাশি ওই মাদরাসায় দ্বিতীয় শ্রেনীতে পড়া-লেখা করতো। করোনার লকডাউনে খুলনা ছেড়ে চলে আসে যশোহরস্থ বাবা-মায়ের জীর্ণ কুঠিরে। করোনার করাল গ্রাসে বাবা আক্তার বিশ্বাসের আয়-ইনকামও কমে যায়। ফলে ৩ সদস্যের সংসারে কোন কোন দিন দু-বেলা খাবারই জুটতো না। ফলে বেশী আয় করার আশায় ট্রেনযোগে ভাগ্যেও চাকা ঘোরাতে আক্তার বিশ্বাস ও আমিনা খাতুন সন্তান আব্দুর রহমানকে নিয়ে চলে আসে চুয়াডাঙ্গায়। বসবাস করতে থাকে রেললাইন সংলগ্ন হক পাড়ার এক জীর্ণ ঘরে। স্বামীর বাদাম বিক্রিতে সহযোগিতা করলেও আয়-রোজগার খুব বেশী বাড়েনি। কিন্তু এ অভাব ও করোনার ভয়াবহতার মধ্যে আমিনার পেটে আসে আব্দুল্লাহ নামের আরেক নুতুন অতিথী। কি করবে আমিনা ও আক্তার বিশ্বাস। এমনিতেই সংসার চলে না। তার উপর আসলো আরেক অতিথী। অভাব আর কষ্টকে আরো বাড়িয়ে দিতে ২০২০ সালের অক্টোম্বর মাসে প্রসব বেদনা ওঠে মা আমিনা খাতুনের। তার গগন বিদারী কান্নায় বস্তির বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। বস্তির অনেকেই ছুটে আসলেও কষ্টের ভাগ কেউ শেয়ার করতে পারেনি। অনাগত সন্তান আর স্ত্রীর মরোনাপন্ন অবস্থা দেখে যে সম্বল ছিল তা নিয়ে স্বামী আক্তার বিশ্বাস আমিনা খাতুনকে ভর্তি করান হাসপাতালে। কিন্ত ততক্ষনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ডাক্তারের মতে একলেমশিয়া হয়ে আমিনার শরীরের কমর থেকে নিচের অংশ অসাড় হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে একটি চোখ। অনেক কষ্ট করে আব্দুল্লাহ পৃথিবীর আলোর মুখ দেখলেও আজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যায় আমিনা খাতুন।সন্তান প্রসবের বেদনা ও কাটা নাড়ীর ঘাঁ শুকাতে না শুকাতে আরেকটি দুঃসংবাদ যেন আমিনার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। চলতি বছরের (২০২১) ১৫ ফেব্রুয়ারীতে বাদাম বিক্রতো স্বামী আক্তার বিশ্বাসকে একটি ট্রাক পিছন থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। তাকে পথচারীরা উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করালেও টাকার অভাবে ভাল চিকিৎসা না হওয়ায় সেও পঙ্গুত্ব বরণ করে এখন বিছানাগত। তাইতো স্বামী সন্তানদের মুখে একবেলা খাবার তুলে দিতে আমিনা খাতুন অন্যের দেওয়া হুইল চেয়ার নিয়ে আব্দুর রহমান ও আব্দুল্লাহকে নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে ও পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। আব্দুল্লাহর বয়স এখন মাত্র ৭ মাস। হুইল চেয়ারে বসে আব্দুল্লাহকে কোলে করে অন্যের দেওয়া হুইল চেয়ার ও ছোট্ট একটি সাউন্ড সিসটেম নিয়ে পথে পথে ঘোরে আমিনা খাতুন। আর এ হুইল চেয়ার ঠেলতে ঠেলতে ক্লান্ত হয়ে যায় বড় ছেলে আব্দুর রহমান। যার বয়স এখন মাত্র ১২ বছর। এই বয়সে তার হাতে থাকার কথা বই,খাতা-কলম। অথচ পঙ্গু পিতা-মাতা ও ছোট্ট ভাইয়ের মুখে খাবার তুলে দিতে আব্দুর রহমানকে ঠেলতে হচ্ছে হুইল চেয়ার। গতকাল মঙ্গলবার চুয়াডাঙ্গা রেল বাজারের একটি সড়কে এভাবেই হুইল ঠেলে ঘুরতে দেখা গেছে আমিনা খাতুন ও তার দু-সস্তানকে। কেন তার এ অবস্থা এ কথা জানতে চাইলে কান্না জড়িত কন্ঠে আমিনা খাতুন এ প্রতিবেদককে উপরোক্ত কথা গুলো বলেন। আমিনা খাতুন আরো বলেন, এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলর বা পৌরসভা থেকে তাকে কোন প্রতিবন্ধি ভাতা বা কার্ড করে দেওয়া হয়নি। যদিও আমিনা খাতুন বলেছেন, কে যেন আমার(তার) নাম ঠিকানা লিখে নিয়ে গেছে। কিন্তু কোন সুবিধা সে আজ অবধি পায়নি।
মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য এই অমর কথাটি স্বরণ করে সমাজের কোন মানুষ,জনপ্রতিনিধি বা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা যদি একটু এগিয়ে আসেন ,তাহলে হয়তো পবিত্র রমজান মাসে মা আমিনা খাতুন,আক্তার বিশ্বাস ও তাদের সন্তান আব্দুর রহমান- আব্দুল্লাহর মুখে একটু হাসি ফুঁটে উঠতে পারে।

 

Comments (0)
Add Comment