বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব

সম্পাদকীয়

যুদ্ধ কোনো দেশ বা জাতির জন্যই কল্যাণ বয়ে আনে না। মানুষ যেমন একা বসবাস করতে পারে না, ঠিক তেমনি একটি দেশও কখনো একা চলতে পারে না। বলা যায় এই বিশ্বটা একটা সংসার, প্রতিটি দেশ তার সদস্য। পারস্পরিক ভালোবাসা ও স¤প্রীতি বজায় রেখে সবাই দেশ পরিচালনা করবে এটাই সবার কাম্য। কিন্তু বিশ্বের কোথাও যুদ্ধ পরিস্থিতি দেখা দিলেই প্রথমেই জ্বালানি পণ্যের বাজার অস্থিতিশীল হয়। কারণ, সরবরাহ ও উৎপাদন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়। ইউক্রেন সংকট যদি সাময়িক হয় তবে জ্বালানির বাজার বেশিদিন ঊর্ধ্বমুখী থাকবে না। কিন্তু যদি সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয় তাহলে পরিস্থিতি খারাপের দিকেই যাবে। পেট্রোলিয়াম পণ্য তেল-গ্যাসের দাম বাড়বে।

বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিকারক দেশের জন্য এটা আরও খারাপ খবর। সরকার ভর্তুকি সামাল দিতে তেল-গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করতে চাইবে। এমনটি করলে জনগণের ক্রয় ¶মতা কমে যাবে। অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এই দুটি দেশ খাদ্যশস্য ও পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন এবং রপ্তানিতে বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় দেশ। দেশ দুটির মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় আমদানিকারকরা বিকল্প দেশ থেকে পণ্য নিতে চেষ্টা করছে। গম, ভুট্টা ও সূর্যমুখী তেলের সরবরাহে এক ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সারা বিশ্ব যতো গম রপ্তানি করে তার প্রায় ৩০ শতাংশ করে রাশিয়া ও ইউক্রেন। এছাড়া ভুট্টার প্রায় ২০ শতাংশ রপ্তানি হয় এই দুই দেশ থেকে। গম, ভুট্টা দিয়ে শিশুখাদ্য থেকে শুরু করে প্রাণিজ খাদ্য উৎপাদন হয়। সূর্যমুখী তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশই করে এ দুই দেশ। ফলে ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে চলতি মরসুমে গম ও ভুট্টার সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেবে। ফলে এসব পণ্য থেকে উৎপাদিত দ্রব্যের দাম বাড়বে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম বাড়তে শুরু করেছে। ভুট্টার দামও বেশ চড়া।

ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক বিশাল ধাক্কা যা এখনো মহামারির প্রভাব থেকে বিশ্ব পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করতে পারেনি। সংঘাতটি ইতোমধ্যে ১৯৪৫ সালের পর থেকে ইউরোপের জন্য সবচেয়ে গুরুতর সংকট ও আগ্রাসন। রাশিয়ান বাহিনী বিমান হামলা চালাচ্ছে, সেনাঘাঁটি দখল করছে এবং বেসামরিক লোকজন পালিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে কিয়েভের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলেছেন যে কোনো সময় রাজধানী কিয়েভের পতন হতে পারে এবং এর বিমান প্রতির¶া ব্যবস্থা শেষ হয়ে যেতে পারে। ইউক্রেনে হামলার পর ইতোমধ্যে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে কম্পন শুরু হয়েছে। যেহেতু ইউক্রেন বেঁচে থাকার জন্য সর্বাত্মক লড়াই করছে, পশ্চিমা সরকারগুলোও রাশিয়াকে শাস্তি দেয়ার জন্য বিভিন্ন পদ¶েপ নিচ্ছে। তারা এর মাধ্যমে তাদের নিজ¯^ অর্থনীতিতে সংঘাতের প্রভাবকে বাড়িয়ে তুলতে চাইছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা ইতোমধ্যে রাশিয়ার ব্যাংক, ডলারে বাণিজ্য ও সুইফট নেটওয়ার্কের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দিয়েছে। করোনা মহামারি এমনিতেই বিশ্ব অর্থনীতিতে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং উদ্বেগজনক আর্থিক বাজার তৈরি করেছে এবং বর্তমান ইউক্রেন যুদ্ধ এ দুটি বিষয়কে আরও খারাপ করবে। এমনিতেই অনেক দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হুমকির মুখে রয়েছে। যে পরিবারগুলো তাদের আয়ের একটি বড় অংশ জ্বালানি এবং খাবারের জন্য ব্যয় করে তাদের কাছে অন্যান্য পণ্য ও পরিষেবার জন্য নগদ অর্থ কম ব্যয় করার সুযোগ থাকবে। নিমজ্জিত ও ঝুঁকিপূর্ণ বাজার আরেকটি টানাপোড়েন যোগ করবে, সম্পদ এবং আত্মবিশ্বাসকে আঘাত করবে এবং ফার্মগুলোর বিনিয়োগের জন্য তহবিল ব্যবহার করা কঠিন করে তুলবে।

Comments (0)
Add Comment