চুয়াডাঙ্গার দুই ডিলারের নিবন্ধন বাতিল, জামানত বাজেয়াপ্ত

 দামুড়হুদা ব্যুরো,

অনলাইন ডেস্ক: চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদায় খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির সরকারি চাল পাচারের ঘটনায় দুই ডিলারের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার ১৪ এপ্রিল উপজেলা খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি পরিচালনা কমিটির সভায় তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা শেষে সর্বসম্মতিক্রমে ওই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।  এ সংক্রান্তে মঙ্গলবার বিকেলে উপজেলা খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি পরিচালনা কমিটির সভাপতি দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহিী অফিসার এসএম মুনিম লিংকনের সভাপতিত্বে জরুরিসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় তদন্ত কমিটির দেয়া প্রতিবেদন পাঠ শেষে নিয়ম বর্হি:ভূতভাবে সরকারি চাল লোকনাথপুর গোডাউন থেকে বাস্তুপুর গোডাউনে স্থানান্তর করাসহ চাল বিতরণের মাস্টার রোলের সাথে স্টক রেজিস্ট্রারে গড়মিল পরিলক্ষিত হয়। তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা শেষে সর্বসম্মতিক্রমে অভিযুক্ত ওই দুই ডিলার আব্দুস সাত্তার এবং গিয়াস উদ্দীনের লাইসেন্স বাতিলসহ জামানতের টাকা বাজেয়াপ্ত করা হয়। সেই সাথে নতুন ডিলার নিয়োগ না দেয়া পর্যন্ত পার্শবর্তী ডিলারের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

উল্লেখ্য, গত ৮ এপ্রিল বুধবার সন্ধ্যার পর খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজির ২৯ বস্তা চাল আলমসাধু করে লোকনাথপুর গোডাউন থেকে বাস্তপুর গোডাউনে নেয়ার সময় স্থানীয় লোকজন বাধা সৃষ্টি করে। কিন্ত ডিলারের প্রতিনিধি আরিফ জোর করে ওই ২৯ বস্তা চাল বাস্তুপুর গোডাউনে নেয়। ঘটনাটি নিয়ে এলাকাবাসির মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। মুহুর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে সরকারি চাল পাচারের খবর। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী অফিসারকেও তাৎক্ষনিকভাবে জানানো হয়। এ সময় চাল পাচারের সাথে জড়িত সন্দেহে স্থানীয় ইউপি সদস্য রিকাত আলীকে শারীরিকভাবে লাঞ্চিত করে এবং লোকনাথপুরস্থ কনিকা সীডের অফিসের অদুরে একটি ক্লাব ঘরে তাকে আটকে রাখে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসি।

খবর পেয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মহি উদ্দিনকে সাথে নিয়ে লোকনাথপুরে ছুটে যান দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী অফিসার এসএম মুনিম লিংকন। বিষয়টি জানার পরপরই সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌছান দামুড়হুদা মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল খালেক। তিনি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেন এবং উত্তেজিত গ্রামবাসিকে শান্ত থাকার আহবান জানান।

ঘটনাটি সরেজমিন তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের লক্ষে ডিলার গিয়াস উদ্দীন ডেলিসের বাস্তুপুরস্থ গোডাউন পরিদর্শণ করেন দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী অফিসার এসএম মুনিম লিংকন। গোডাউন চেক করে মোট ৬৫ বস্তা সরকারি চাল মজুদ পাওয়া যায়। তিনি তাৎক্ষনিক ওই গোডাউনে থাকা ৬৫ বস্তা চালসহ গোডাউনের চাবি এবং চাল বিতরণের মাস্টাররোল নিজ হেফাজতে নেন। তিনি আবারও ফিরে যান লোকনাথপুরে। ওখানে ডিলার আব্দুস সাত্তারের গোডাউন পরিদর্শন করেন এবং চাল পাচারের সাথে জড়িত নয় মর্মে প্রতিয়মান হলে গ্রামবাসিকর্তৃক অবরুদ্ধ ইউপি সদস্যকে ছেড়ে দেয়া হয়। তিনি ঘটনাটি তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহনের লক্ষে দামুড়হুদা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা অভিজিত কুমার বিশ্বাসকে প্রধান এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আশরাফ হোসেনকে সদস্য করে দুই সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তিনি তদন্ত কমিটিকে গত ১৩ এপ্রিল সোমবারের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য নির্দেশ দেন। তদন্ত কমিটি তদন্ত শেষে সোমবার ১৩ এপ্রিল উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। ৬০ পৃষ্ঠা সম্বলিত তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১১ এপ্রিল পুরাতন বাস্তুপুরস্থ খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির ডিলার গিয়াস উদ্দীনের গোডাউন পরিদর্শণ করা হয়। উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের সহকারী উপখাদ্য পরিদর্শক সামসুল আলম ও ডিলার গিয়াস উদ্দীনের পক্ষে তার প্রতিনিধি আরিফ উদ্দীন তদন্তকাজে সহযোগিতা করেন। তদন্তকালিন দেখা যায় মাস্টাররোলে বিতরণ মোতাবেক গোডাউনে ৩৯ বস্তা চাল থাকার কথা। কিন্ত গোডাউনে ৬৫ বস্তা চাল পাওয়া যায়। স্টক রেজিস্ট্রার পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, ৫৩০টি কার্ডের চাল বিতরণ করা হয়েছে। কিন্ত মাস্টাররোল পরীক্ষান্তে দেখা যায় ৫১৯ টি কার্ডের চাল বিতরণ হয়েছে। ১১ টি কার্ডের মাস্টাররোল পাওয়া যায়নি। এ প্রসঙ্গে আরিফ উদ্দীনকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি। এরপর লোকনাথপুরস্থ ডিলার আব্দুস ছাত্তারের গোডাউন পরিদর্শণ করা হয়। এ সময় লোকনাথপুর গোডাউনে সাড়ে ৩৪ বস্তা চাল পাওয়া যায়। স্টক রেজিস্ট্রার মোতাবেক গোডাউনে থাকবে ২১ বস্তা। তবে ৯৪ টি কার্ড সংশোধন হওয়ায় ওই কার্ডের চালসহ ৫৭ বস্তা চাল গোডাউনে থাকার কথা। কিন্ত চাল পাওয়া যায় মাত্র সাড়ে ৩৪ বস্তা। হিসাবান্তে লোকনাথপুর গোডাউনে ২২ বস্তা চাল কম পাওয়া যায়। স্টক রেজিস্ট্রার পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, ৫৬১ টি কার্ডের চাল বিতরণ করা হয়েছে। ওই এলাকায় ৯৪ টি কার্ড সংশোধন হওয়ায় ৫০১ টি কার্ডের চাল বিতরণ হওয়ার কথা। হিসাবান্তে দেখা যায় ৬০ টি কার্ডের চাল বেশী বিতরণ করা হয়েছে। মাস্টাররোল পরীক্ষান্তে দেখা যায় যে, ৪৫৪ টি কার্ডের চাল বিতরণ করা হয়েছে। ১০৭ টি কার্ডের কোন মাস্টাররোল নেই। এ বিষয়ে উপস্থিত ডিলার আব্দুস সাত্তার এবং প্রতিনিধি আরিফ উদ্দীনের নিকট জানতে চাওয়া হলে তারা কোন সদুত্তর দিতে পারেননি। তদন্ত কমিটি কর্তৃক সরেজমিন তদন্ত ও কাগজপত্র যাচাইয়ান্তে প্রতীয়মান হয় যে, চাল লোকনাথপুর গোডাউন থেকে বাস্তুপুর গোডাউনে স্থানান্তরের ঘটনাটি সত্য এবং নিয়ম বহির্ভূত। মাস্টাররোল যাচাইয়ান্তে যে অনিয়ম পরিলক্ষিত হয় তার কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তারা। তদন্ত কাজ শেষে বাস্তুপুর গোডাউনের তালা সিলগালা করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে ১৪ এপ্রিল মঙ্গলবার বিকেলে উপজেলা খাদ্য বান্ধব কর্মসূচি পরিচালনা কমিটির জরুরিসভায় সর্বসম্মতিক্রমে ওই দুই ডিলারের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সভায় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা খাদ্য বান্ধব কর্মসূচি পরিচালনা কমিটির সদস্য উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান সাহিদা খাতুন, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আশরাফ হোসেন, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক রেজাউল ইসলাম, সাংবাদিক বখতিয়ার হোসেন বকুল, উপজেলা খাদ্য পরিদর্শক দেলোয়ার হোসেন, দর্শনা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহিদুর রহমান, সহকারী  উপখাদ্য পরিদর্শক শামসুল আলম চপল, উপজেলা পরিসংখ্যান অফিসের ইমরান হোসেন এবং মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের অফিস সহায়ক সাথি খাতুন।

 

সম্পাদনায়, আলম আশরাফ

Comments (0)
Add Comment