চুয়াডাঙ্গায় সমতল ভূমিতে কমলা লেবুর চাষ: বদলে দিয়েছে কৃষি, অর্থনীতি, জীবনের গল্প

মিরাজুল ইসলাম মিরাজ: চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার মানিকপুর গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়ে সবুজের সমারোহ। কাছাকাছি যেতেই দেখা মেলে, ডালে থোকায় থোকায় ঝুলে আছে হলুদ কমলা। শীতের মিষ্টি রোদে ফলের শরীরে আলো পড়ে ঝিলমিল করছে। এই কমলাই বদলে দিচ্ছে চুয়াডাঙ্গার কৃষি অর্থনীতি আর বহু শিক্ষিত তরুণের জীবনের গল্প।

জীবননগরের মানিকপুর গ্রামের সজল আহমেদ তেমনি একজন। এসএসসি পাসের পর বড় কোনো পুঁজি ছিল না; ছিল না নিজের জমি। ২০০৯ সালে অন্যের কাছ থেকে সাত বিঘা জমি লিজ নিয়ে শুরু করেন বরই আর পেয়ারা চাষ। প্রথম বছরেই লাভ। সেই লাভই তাঁকে সাহস দেয়। এরপর কৃষিবিষয়ক ইউটিউব চ্যানেল ‘কৃষি বায়োস্কোপ’-এর প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি বুঝতে পারেন কৃষি দিয়ে জীবিকা নয়, ভবিষ্যৎও গড়া যায়। হাতেকলমে শেখা, মাটিতে নেমে কাজ করা– সেখান থেকেই কৃষিকে নতুনভাবে দেখতে শুরু করেন সজল। পরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি-কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্প থেকে তিন দিনের প্রশিক্ষণ নেন। ওই প্রশিক্ষণই যেন তাঁর চোখ খুলে দেয়।

সাত বিঘা থেকে শুরু হওয়া সেই বাগান এখন ১৩৯ বিঘায় দাঁড়িয়েছে। দেশি-বিদেশি ফলের মিশ্র বাগান। সজলের বাগানে এখন অন্তত ৫৫০ প্রজাতির ফল উৎপাদিত হচ্ছে। এর মধ্যে ১৯৭ প্রজাতির মালটা ও কমলা আছে। চলতি উৎপাদন মৌসুমেই খরচ বাদ দিয়ে লাভ করেছেন অন্তত এক কোটি টাকা। বাগানে নিয়মিত কাজ করেন ৪২ শ্রমিক, সঙ্গে মৌসুমভিত্তিক আরও ১০ থেকে ১২ জন।

সজল বলেন, ফল চাষের শুরুতে পারিবারিকভাবে সমর্থন পাইনি। তবে এখন সবাই সাধ্যমতো সহযোগিতা করছেন। বিভিন্ন সূত্রে খবর পেয়ে সারাদেশ থেকে অসংখ্য দর্শনার্থী ছুটে আসছেন মানিকপুরে। দেশের শিক্ষিত তরুণরা এভাবে ফলের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করলে দেশের বেকার সমস্যার বড় অংশের সমাধান হবে। ফলের আমদানিনির্ভরতা কমবে। ২০৩০ সালের মধ্যে গোটা বাংলাদেশ ফলের রাজ্যে পরিণত হবে। দেশে ফলকেন্দ্রিক এগ্রো ট্যুরিজম গড়ে উঠবে।

❝কমলায় বদলে যাওয়া অর্থনীতি❞

চুয়াডাঙ্গায় বাণিজ্যিকভাবে কমলা চাষ শুরু হয় ২০১৬ সালের দিকে। শুরুটা ছোট হলেও সাড়া পড়ে দ্রুত। কৃষকরা বুঝতে পারেন খরচ তুলনামূলক কম, লাভ নিশ্চিত।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের
তথ্য বলছে, চুয়াডাঙ্গায় এই অর্থবছর পর্যন্ত ৭৮ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের কমলা চাষ হয়েছে। যেখান থেকে অন্তত ৩৯০ টন কমলা উৎপাদন হয়েছে। বিঘাপ্রতি উৎপাদন হয়েছে ১৫০ থেকে ১৭০ মণ। এসব কমলা বিক্রি হয়েছে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি দরে, যার আনুমানিক বাজার দাঁড়ায় প্রায় ৫৩ কোটি টাকা। জেলায় কমলা চাষ ঘিরে নতুন করে কাজের সুযোগ মিলেছে পাঁচ থেকে ছয় হাজার শ্রমিকের। কেউ বাগানের শ্রমিক, কেউ পরিবহন, কেউ আড়তদার, কেউ চারা উৎপাদনে যুক্ত।

চুয়াডাঙ্গার চার উপজেলায় চায়না-৩, দার্জিলিং, সাউথ আফ্রিকাসহ বিভিন্ন জাতের সর্বমোট কমলা লেবুর চাষ হয়েছে ৭৮ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলায় ৫ হেক্টর, আলমডাঙ্গায় ১০ হেক্টর, দামুড়হুদায় ১১ হেক্টর ও জীবননগরের ৫২ হেক্টর জমিতে।

 

জানা গেছে, পরিকল্পিত চাষ পদ্ধতি ও সঠিক পরিচর্যায় বিদেশি ফল চাষে বদলে গেছে চুয়াডাঙ্গার চাষীদের জীবন। কম খরচে অধিক লাভ হওয়ায় কমলা চাষে ঝুকছেন অনেকে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ওই ফল পাঠানো হচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। বিদেশি ফলের উৎপাদন বাড়াতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ। এক সময় শুধুমাত্র পাহাড়ি অঞ্চলে চাষ হলেও এখন সমতল ভূমিতেও চাষ হচ্ছে কমলা লেবুর। চুয়াডাঙ্গা জেলার সমতল ভূমিতেও বাণিজ্যিক উপায়ে চাষ শুরু হয়েছে কমলা লেবুর। চুয়াডাঙ্গার জীবননগর ও দামুড়হুদা উপজেলায় চায়না কমলা চাষে ব্যাপক সফলতা এসেছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কমলা চাষের মাধ্যমে একটি উদীয়মান জেলা হিসেবে পরিচিত পাচ্ছে চুয়াডাঙ্গা। ধীরে ধীরে কমলা চাষে বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠছে এ জেলা। জেলার জীবননগর উপজেলার নিধিকুণ্ডু গ্রামের কৃষক ওমর ফারুক চায়না কমলা চাষ করে প্রথম দিকে ব্যাপক সাড়া ফেলে দেন। তাঁর সাফল্য অনেককে অনুপ্রাণিত করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চুয়াডাঙ্গার কৃষকেরা বিভিন্ন জাতের চায়না কমলা, দার্জিলিং কমলা, রামরঙ্গন কমলা চাষে সফল হয়েছেন। স্থানীয় কৃষি বিভাগ এই চাষকে সম্প্রসারিত করতে এবং চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে সার্বিক সহায়তা করে আসছেন।

❝ব্যর্থতা থেকে সাফল্যের পথে আব্দুল্লাহ❞

মো. আব্দুল্লাহর গল্পটা অনেক তরুণের মতোই। নানা ব্যবসায় হোঁচট খেয়ে একসময় ছিলেন দিশেহারা। ছয় বছর আগে এক সহকর্মীর পরামর্শে দুই বিঘা জমিতে কমলালেবুর বাগান করেন। দুই বছরের মাথায় তিন লাখ টাকার ফল বিক্রি করেন। সেখান থেকেই মোড় ঘুরে যায়। চার বছরে কমলা বিক্রি করে আয় করেন ২৪ লাখ টাকা। চারা বিক্রি করে আরও ৩০ লাখ টাকা আয় করেন। এখন প্রায় ২০ বিঘা জমিতে তাঁর কমলা বাগান। আব্দুল্লাহ বলেন, বসে না থেকে সঠিক জাতের চারা কিনে বাগান করলে সফল হওয়া যায়।

❝ফারুকের হাত ধরেই যাত্রা❞

জেলায় কমলা চাষের শুরুটা হয়েছিল জীবননগরের নিধিকুণ্ডু গ্রামে। ওমর ফারুক খান ২০১৫ সালে খুলনায় বন্ধুর বাড়ির উঠান থেকে কমলা গাছের ডাল এনে কলম করেছিলেন। ২০১৬ সালে এক বিঘা জমিতে রোপণ। দুই বছর পর ফল আসে। ২০১৯ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রথম চায়না কমলা চাষি হিসেবে জাতীয় কৃষি পুরস্কার পান। তাঁর সাফল্য দেখেই আশপাশের কৃষকরা আগ্রহী হন।

❝দুই ভাই, এক বাগান, নতুন জীবন❞

দামুড়হুদার জয়রামপুর গ্রামের আনিছুর রহমান তারিক ও জামাল উদ্দীন আগে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। করোনার সময় চাকরি হারিয়ে ফিরে আসেন গ্রামে। ইউটিউবে বিদেশি ফলের বাগান দেখে শুরু করেন মালটা ও কমলার চাষ। এখন তাদের বাগানে প্রতি বিঘায় লাভ প্রায় চার লাখ টাকা। গত বছর খরচ বাদে লাভ হয়েছিল ৯ লাখ, এ বছর প্রত্যাশা ১৩ লাখ টাকা।

আনিছুর রহমান জানান, মালটা ও কমলা চাষে প্রতি বিঘায় খরচ হয় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। প্রতি বিঘায় লাভ প্রায় চার লাখ টাকা। প্রতি গাছে কমলা পাওয়া যায় ৮০ থেকে ১০০ কেজি। প্রতি গাছে মালটা পাওয়া যায় ১০০ থেকে ১২০ কেজি। ইতোমধ্যে মালটা ও কমলার বেচাবিক্রি শুরু হয়েছে। এ বছর ১৩ লাখ টাকা লাভের প্রত্যাশা এই কৃষি উদ্যোক্তাদের।

রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি চুয়াডাঙ্গা জেলা ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক হামিদুর রহমান বলেন, চাষী আব্দুল্লার কমলা বাগান পরিদর্শন করে বুঝেছি এটি একটি সম্ভাবনাময় চাষ। এ বাগানের কমলা যেমন দর্শনীয় তেমনি সুস্বাদু। আমি নিজেও এমন একটা বাগান করার পরিকল্পনা করছি।

❝সম্ভাবনা❞

জীবননগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন বলেন, জেলায় সর্বপ্রথম কমলার চাষ হয় এ উপজেলায়। বর্তমানে এখানে ৫২ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের কমলা চাষ হয়। আমরা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক চাষিদের পরামর্শসহ নানাভাবে সহযোগিতা করে আসছি।

দামুড়হুদা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শারমিন আক্তার বলেন, জেলায় কমলা চাষে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে এ উপজেলা। এখানে ১১ হেক্টর জমিতে কমলালেবুর চাষ হয়েছে। এ ফলের উৎপাদন বাড়াতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক তালহা জুবাইর মাশরুর বলেন, এই জেলার কমলা দেখিয়ে দেয় সঠিক প্রশিক্ষণ, ধৈর্য আর সাহস থাকলে কৃষি হতে পারে সম্মানজনক পেশা, বড় বিনিয়োগ। বয়স্ক কৃষকরা সনাতন পদ্ধতির কৃষিকে আঁকড়ে রাখলেও তরুণরা ঝুঁকি নিয়ে ফল-ফসলের আবাদে মনোনিবেশ করছেন, যা কৃষিতে ইতিবাচক দিক হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তরুণদের টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্প থেকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এস এম সোহরাব উদ্দিন বলেন, দেশে বর্তমানে যে কমলা চাষ হচ্ছে সেগুলোর চেয়ে চুয়াডাঙ্গার কমলা স্বাদে অনেক ভালো। আর আমদানি করা কমলার চেয়ে এর রংটাও আকর্ষণীয়। তিনি বলেন, কমলা চাষে তুলনামূলক কম খরচে বেশি মুনাফা অর্জন সম্ভব। প্রায় এক লাখ টাকা খরচে দুই বছরের মধ্যে তিন থেকে চার গুণ লাভ সম্ভব। কমলা চাষের পাশাপাশি লেবু ও আদার মতো সাথি ফসল চাষ করায় আয় অনেক বেড়েছে।