রহমান মুকুল
আলমডাঙ্গা উপজেলার খাদিমপুরে সংঘটিত সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনাটি এখন শুধু একটি অপরাধের বিবরণ নয় এটি পরিণত হয়েছে সমাজ, আইনশৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধের এক কঠিন পরীক্ষায়। ঘটনার মূল পরিকল্পনায় এক নারীর সম্পৃক্ততা বিষয়টিকে আরও জটিল ও অস্বস্তিকর করে তুলেছে। তদন্তে নিশ্চিত হয়েছে, ওই নারী কৌশলে ভুক্তভোগীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে তাকে ফাঁদে ফেলেন। বিশ্বাস করে ওই নারীর ডাকে সাড়া দিয়েই ভুক্তভোগী বাড়ি থেকে বের হন, যা শেষ পর্যন্ত তাকে নিয়ে যায় আলমডাঙ্গা উপজেলার খাদিমপুরের একটি নির্জন আমবাগানে-যেখানে আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল সংঘবদ্ধ একটি চক্র। এটি স্পষ্ট করে-ঘটনাটি তাৎক্ষণিক নয়, বরং পূর্বপরিকল্পিত অপরাধ। নারী পরিকল্পনাকারীসহ ধর্ষক-সহযোগী সকলেই গ্রেফতার তবুও প্রশ্ন থামে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, পরিকল্পনায় জড়িত ওই নারীসহ মোট ৬জনকেই গ্রেফতার করা হয়েছে। ফলে গ্রেফতার এড়ানোর সুযোগ রাখেনি পুলিশ প্রশাসন। কিন্তু প্রশ্ন হলো-গ্রেফতারই কি যথেষ্ঠ? একজন নারী যখন আরেকজন নারীকে প্রতারণার মাধ্যমে এমন ভয়াবহতার দিকে ঠেলে দেয়, তখন এটি শুধুই আইনি অপরাধ নয়, বরং সামাজিক আস্থার ভিত্তিকে প্রবলভাবে নাড়িয়ে দেয়। এই নারী পতিতার দালাল কি-না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। আসলেই যদি দালাল হন, তাহলে তার মুখোশ উন্মোচন হওয়া দরকার। যাতে সমাজের আর কোনো নারীর ক্ষতি করার সুযোগ না পান। কেন ঘটল এমন অপরাধ? বিশ্লেষণে কয়েকটি কারণ সামনে আসছে, প্রথমত; বিশ্বাসের অপব্যবহার। পরিচিত একজনের ডাকে সাড়া দেয়া স্বাভাবিক সামাজিক আচরণ। সরল বিশ্বাসের সেই জায়গাটিকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত; পরিকল্পিত দলগত ধর্ষণের ঘৃণিত মানসিকতা। একাধিক ব্যক্তি আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল-এটি প্রমাণ করে অপরাধটি ছিল সংগঠিত এবং লক্ষ্যভিত্তিক ও খুবই ঘৃণিত। তৃতীয়ত; নির্জন এলাকা নির্বাচন। খাদিমপুরের ফাঁকা মাঠ ও আমবাগানের মতো জায়গা দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে পরিচিত। তবুও সেখানে নজরদারির ঘাটতি ছিল স্পষ্ট। চতুর্থত; ভিকটিম সম্পর্কেও যথেষ্ট তদন্ত প্রয়োজন। কারণ তার সম্পর্কেও কিছু নেতিবাচক তথ্য ছড়িয়েছে। আসামিপক্ষও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে ছড়াতে পারেন। অপরাধীরা এমন নিশ্চিন্তে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সাহস পেল কোথা থেকে? আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা? সমাজের দায় কি নেই? এই ঘটনায় সবচেয়ে অস্বস্তিকর দিক-বিশ্বাসের ভাঙন। সমাজে যখন সম্পর্কের ভেতরেই প্রতারণা ঢুকে পড়ে, তখন নিরাপত্তা শুধু বাহ্যিক নয়, অভ্যন্তরীণ সংকটেও পরিণত হয়। এটি কেবল ছয়জন অপরাধীর দায়ে সীমাবদ্ধ নয় বরং এটি সামাজিক অবক্ষয়েরও একটি প্রতিফলন। দগদগে সামাজিক ক্ষত। আইন অনুযায়ী এই অপরাধের কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা অনেক সময় প্রতিরোধকে দুর্বল করে দেয়। এই মামলায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হলে, সমাজে শক্ত বার্তা যাবে না। একইসঙ্গে, প্রয়োজন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি বাড়ানো। সামাজিক সচেতনতা জোরদার করা। পরিচয়ের আড়ালে লুকানো ঝুঁকি সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করা। আলমডাঙ্গার খাদিমপুরের এই ঘটনা শুধু একটি সংবাদ নয়; এটি এক নির্মম বাস্তবতা, যেখানে অপরাধীরা ধরা পড়েছে, কিন্তু প্রশ্নগুলো এখন পুরো সমাজকে প্রশ্নের চাবুকে জর্জিত করছে। দায় কার শুধু ছয়জনের, নাকি আমাদের সবার?