জনজীবন নাকাল হলেও আজ বৃষ্টি কমে আসার আভাস

স্টাফ রিপোর্টার: ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদের প্রভাবে অসময়ের ভারী বর্ষণে কপাল পুড়েছে কৃষকের। টানা বৃষ্টিপাতে হাজার হাজার একর ফসলের ক্ষেত তলিয়ে গেছে। এসব ফসলের মধ্যে আমন ধান, পেঁয়াজ, রসুন, মসুর ও শাকসবজি রয়েছে। পানিতে ধান কলিয়ে (অঙ্কুরোদগম) হয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বছরের খোরাকি বৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় মাথায় হাত পড়েছে কৃষকের। তিনদিন ধরে সূর্যের দেখা মেলেনি। বৃষ্টি আর দমকা বাতাস যেনো পাকা ধানে মই দিয়ে গেছে আমনের মাঠে। হাজার হাজার বিঘা কাচা-পাকা আমন ধান শুয়ে পড়েছে। কাটা ধানও মাঠে রয়েছে কৃষকের। বিশেষ করে বাঁধাকপি, ফুলকপি, সিম, পাকা আমন ধান, বোরো বীজতলা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন সাধারণ কৃষকরা। কৃষকরা জানান, আলু, গম, বোরোর বীজতলা, সরিষাসহ শীতকালীন ফসলের ক্ষেতে পানি জমে গেছে। পানি না সরলে এসব ফসল নষ্ট হয়ে যাবে।
জাওয়াদের প্রভাবে শীতের আগে অবিশ্রান্ত বর্ষণে গতকাল জনজীবন নাকাল হলেও আজ বৃষ্টি কমে আসার আভাস মিলেছে। আবহাওয়া অধিদফতরের আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেছেন, নিম্নচাপটি দুর্বল হয়ে সুস্পষ্ট লঘুচাপে পরিণত হয়েছে। এটি আরও দুর্বল হয়ে গতকাল সন্ধ্যা নাগাদ লঘুচাপে পরিণত হয়। সন্ধ্যার পর বৃষ্টির বেগ না কমলেও আজ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে বলে আভাস দেন এই আবহাওয়াবিদ। বঙ্গোসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদ উপকূলে পৌঁছার আগেই শক্তি হারিয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। লঘুচাপে পরিণত হওয়ার পর তা এখন পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ উপকূলে বৃষ্টি ঝরিয়ে যাচ্ছে। একজন আবহাওয়াবিদ বলেন, আগামী ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে। পশ্চিমাঞ্চলে রাতের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে। দেশের অন্যত্র দিন ও রাতের তাপমাত্রা অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
জীবননগর ব্যুরো জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদের প্রভাবে গত ৩ দিনের একটানা বৃষ্টিতে এ উপজেলার ফসলের ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়েছে। বিশেষ করে আলুচাষিদের মাথায় হাত পড়েছে। এ উপজেলার আলুর জোন হিসেবে খ্যাত বৈদ্যনাথপুরের আলু চাষিদের মাঝে কান্নার রোল বয়ে চলেছে। এ ছাড়াও ক্ষেতে কেটে রাখা পাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। ক্ষতি হয়েছে উঠতি ফসলসহ গমের। ক্ষতির পরিমাণ নিরুপনে কাজ করছে উপজেলা কৃষি বিভাগ।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, এ বছর জীবননগর উপজেলায় লক্ষ্যমাত্রার অধিক ১৬ হাজার ১৭৪ হেক্টর জমিতে আমন ধানের চাষ করা হয়েছে। যা থেকে চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৮ হাজার ১৯৮ মেট্রিক টন; কিন্তু টানা বৃষ্টির কারণে কৃষকের সেই স্বপ্ন ধূলিষ্যাত হতে চলেছে। ক্ষেতে কেটে রাখা পাকা ধান তলিয়ে গেছে। বৃষ্টির কারণে ক্ষেতেই এ ধান হতে কল বেরিয়ে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এবার এ উপজেলায় ৩০ হেক্টর জমিতে আগাম জাতের গোল আলু চাষ করা হয়েছে। যা বয়স এক সপ্তাহের ভেতর। অতি বৃষ্টির কারণে ক্ষেতেই এ আলু বীজ বিনষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শারমিন আক্তার জানান, বৃষ্টির কারণে ফসলের ক্ষতির পরিমাণ নিরুপনের কাজ চলছে। ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনতে কৃষকদের সার্বক্ষণিক পরামর্শ দেয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
কালীগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, নি¤œচাপের প্রভাবে মাঠভরা পাকা ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। উপজেলার অধিকাংশ পাকা আমনের ক্ষেত এখন কাদা পানিতে একাকার। এভাবে কয়েকদিন থাকলে খরচের টাকাও আসবে না কৃষকের ঘরে। কোন কোনো ক্ষেতের ধান বৃষ্টির আগেই কেটে গোখাদ্যের জন্য রয়েছে ফেলে রাখা হয়েছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেতের ধান না কাটলেও বৃষ্টি ও বাতাসে মাটিতে নুয়ে পড়ে এখন পানির নিচে। ক্ষেতের ধান নিয়ে এমন বেকায়দায় সব আমন চাষিই। কৃষকের স্বপ্ন এখন পানিতে। কৃষকদের ধান এখন মাঠে কেটে রেখেছে। আবার বোরো ধানের বীজতলা, রবি ফসল, আলুক্ষেত ও নষ্ট হয়েছে। কৃষি অফিস বলছেন মাঠে এখন ও প্রায় ১ হাজার বিঘা জমিতে পাকা ধান রয়েছে।
কালীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন মাঠে গেলে দেখা যায়, দুদিনের বৃষ্টিতে বাতাসে ক্ষেতের বাইল ভারী সব ধান গাছ মাটিতে শুয়ে পড়েছে। অসময়ের এ বৃষ্টিতে নিচু মাঠের জমিগুলোতে আরও বেগতিক অবস্থা। বিল এলাকার ধানে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, প্রতিটি ক্ষেতের ধান এখন পানিতে ভাসছে। কৃষকরা বলছে, অসময়ের বৃষ্টিতে সব শেষ হয়ে গেছে। এখন না খেয়ে মরতে হবে। ক্ষেতের ধান বাঁচাতে হলে দ্রতই ভেজা ধান শুকাতে হবে। সে জন্য ভেজা ধান ক্ষেতে পানি থেকে উঠিয়ে অপেক্ষাকৃত উঁচুস্থানে রাখতে হবে। কিন্তু অঝরে পানি পড়তেই আছে কৃষকরা কোনো ভাবেই মাঠে যেতে পারছে না।
একতারপুর গ্রামের নজরুল ইসলাম জানান, ক্ষেতের ধান গোখাদ্য বিচালি খড়ের জন্য শুকাচ্ছিলেন। কিন্তু তা তো হলোই না বরং ধান পানির মধ্যে তলিয়ে নষ্ট হচ্ছে। আর গোখাদ্যের মূল্যবান বিচাল পঁচে গলে নষ্ট হচ্ছে। কালুখালি, মধুপুর,কোলাবাজার, কামালহাট, বিনোতপুরের কৃষকরা বলছেন, এ মরসুমে আমন ধানের বিচালি বা খড় অনেক বেশি দামে বিক্রি হবে। প্রতি বিঘা জমির বিচালি এখনই বিক্রি হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা। কিন্তু বৃষ্টির পানিতে ধান ও বিচালি উভয়ই চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অবস্থা এমন এবার মানুষ হয়তো ধার-দেনা করে বাঁচতে পারবে কিন্তু কৃষকের সম্পদ গবাদি পশু কিভাবে বাঁচবে।
কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সিকদার মোহাম্মদ মোহায়মেন আক্তার জানান, চলতি আমন মরসুমে এ উপজেলার ধানচাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৫শ’ হেক্টর। কিন্তু চাষ হয়েছে ১৮ হাজার ৭শ’ ৫০ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২শ’ ৫০ হেক্টর বেশি জমিতে আমন চাষ হয়েছে। তন্মধ্যে প্রায় ৮০ ভাগ জমির ধান কৃষকেরা ঘরে তুলতে পেরেছেন। বাকিটা ক্ষেতের ধান নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। এভাবে পানি জমে থাকলে রবি ফসল, আমন ধান, ও বোরো ধানের বীজতলা সবই নষ্ট হয়ে যাবে। এবার বোরো ধান রোপনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা করা হয়েছে ১৪ হাজার হেক্টর জমিতে এবং বোরো ধানের বীজতলা রোপণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সাড়ে ৬শ বিঘা জমিতে। কৃষি কর্মকর্তা বলছেন, বোরো ধানের বীজ ক্ষেত, আমন ধান ও রবি ফসলের জমিতে পানি জমে থাকলে কৃষকের অনেকটা ক্ষতি হবে।
গাংনী প্রতিনিধি জনিয়েছেন, গত শনিবার রাত ও রবিবার এবং সোমবারের হালকা থেকে মাঝারী, কখনও ভারী বর্ষণে ডুবে গেছে গম, মসুরি, ভুট্টা ও তামাকের ক্ষেত। পানিতে ভেসে রয়েছে কাটা আমন ধান। সেচের পরপরই ভারী বর্ষণে অনেকেরই গম, মসুরি ও ভুট্টা পঁচে গেছে বলে জানিয়েছেন। জেলার গাংনী উপজেলার কাথুলী ইউনিয়নের মাইলমারীসহ একাধিক গ্রামের চাষিদের এমনটাই অভিযোগ। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবছর গাংনী উপজেলার অধিকাংশ চাষিরা আগাম ফসল বুনে ফেলেছেন। কিন্তু বৃষ্টির কারণে তাদের বোনা ফসলে পঁচা লেগেছে। অতিকষ্টে অর্থ যোগান দিয়ে চাষকাজ, বীজ, সার ক্রয়সহ সেচ কাজ সম্পন্ন করেছেন। এমতবস্থায় তাদের বোনা ফসল পঁচে গেছে, কেউ কেউ পঁচে যাবার আশংকাতেও রয়েছেন। নতুন করে আবারও চাষ, বীজ, সার ক্রয় করা চাষিদের পক্ষে খুবই কষ্টকর। কেউ কেউ পরের জমি লিজ নিয়েও চাষ কাজ করছেন। সুতরাং আবারও সকল কিছু ক্রয় করে ফসল ফলানো তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাদের ক্ষতি পুষিয়ে নতুনভাবে ফসল ফলানোর জন্য প্রয়োজনীয় বীজ, সারসহ সকল উপকরণ সরবরাহের জন্য গাংনী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সুদৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন ভুক্তভোগী চাষিরা। এব্যাপারে গাংনী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি কর্মকর্তাসহ উর্ধতন কর্তৃপক্ষ বিনামূল্যে বীজ, সারসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করে তাদের ফসল ফলানোর সুযোগ করে সাধারণ ভাবে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করবেন এমনটাই তারা আশাবাদী।

 

Comments (0)
Add Comment