শিক্ষা উপকরণের দাম বৃদ্ধি: দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা ঝরে পড়ার আশঙ্কা

স্টাফ রিপোর্টার: কাগজের বাড়তি দামে ধুঁকছে মুদ্রণশিল্প। নতুন বছর নতুন বই পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা ভর করেছে আগেই। দাম বেড়েছে সব ধরনের সৃজনশীল কিংবা সহায়ক বইয়ের। অন্য শিক্ষা উপকরণেও স্বস্তি নেই। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ভালোমানের একটি পেন্সিলের দাম খুচরায় এখন ২০ টাকা, যা মাসখানেক আগেও ১৫ টাকা ছিলো। পেন্সিলের দাগ মুছতে ব্যবহৃত ইরেজার বা রাবারের দাম হয়েছে দ্বিগুণ। কলমের দাম মানভেদে বেড়েছে দুই থেকে ২০ টাকা। আর বাড়তি দামের এ বোঝা বইতে হচ্ছে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের। নতুন বছরের জন্য যা খুব সুখকর নয়। শিক্ষা উপকরণ ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমনটা জানা যায়। গত কয়েক মাসে দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এভাবেই এসে লেগেছে শিক্ষা উপকরণেও। বই, খাতা, কাগজ, কলম পেন্সিলসহ প্রায় সব ধরনের শিক্ষা উপকরণের দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে, যা ভোগাচ্ছে সব শ্রেণির মানুষকে।

বাজার ঘুরে জানা যায়, পেন্সিল, রাবারের পাশাপাশি কলমের দাম ডজনপ্রতি বেড়েছে ১০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত। ইকোনো ব্র্যান্ডের সাধারণ মানের কলম প্রতি বক্স (২০ পিস) এখন ৬০ থেকে বেড়ে হয়েছে ১০০ টাকা। অর্থাৎ পাইকারিতে ৩ টাকা দামের কলম এখন ৫ টাকা হয়েছে। একইভাবে বেড়েছে ম্যাটাডোর, ফ্রেশসহ অন্যান্য ব্র্যান্ডের কলমের দামও। বই, কাগজ, খাতা, কলম-পেন্সিল, স্কুলের পোশাক, ব্যাগসহ প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন অভিভাবকরা।

স্টেশনারি মিজান হক বলেন, আগে প্রায় সব কোম্পানি ৫ টাকার মধ্যে সাধারণ মানের কলমের খুচরা দাম রাখতো। এখন ভালো কোম্পানিগুলোর পাইকারি দামই ৫ টাকার ওপরে। খুচরায় সেগুলো মানভেদে ৭-১০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। তিনি বলেন, একদম সাধারণ একটা কলমের দাম ২ টাকা, মধ্যম মানেরগুলো ৪-৫ টাকা আর দামি কলমের ক্ষেত্রে প্রতিটি ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। লিংক ব্র্যান্ডের কলম আগে প্রতিটি পাইকারি ১০ টাকা ছিলো। সেটা এখন এক ধাক্কায় ১৫ টাকা হয়েছে। খুচরায় এগুলো ২০ টাকাও বিক্রি হবে। স্টেশনারি দোকানগুলোতে ফেবার ক্যাস্টেল পেন্সিল প্রতি ডজন এখন বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকায়। অর্থাৎ প্রতিটির দাম ১৮ টাকার বেশি পড়ছে। এগুলো খুচরায় ২০ টাকা বিক্রি হয়, যা আগে ১৫০ টাকা ডজন ছিলো। খুচরা বিক্রি হতো ১৫ টাকা দরে। এর চেয়ে নিম্নমানের কিছু পেন্সিলও বাজারে রয়েছে। সেগুলো এখন কোম্পানিভেদে ১২০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ৫০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে ছিলো। এসব পেন্সিল এখন খুচরা বিক্রেতারা ১০ টাকায় বিক্রি করছেন। আগে যা ৫ টাকায়ও পাওয়া যেতো। একইভাবে বেড়েছে পরীক্ষার জন্য ব্যবহৃত বোর্ডের দামও। ৫০-৬০ টাকার ম্যাটাডোর বোর্ডগুলো এখন বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়। স্টেশনারি পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জুই ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মহসীন বলেন, কলম, পেন্সিল ও বোর্ডের ক্ষেত্রে কাঁচামালের দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে। এছাড়া আমদানি ও দেশের অভ্যন্তরে পরিবহন ভাড়া বাড়ার কারণেও দাম বেড়েছে। ডলারের দামের কারণে বিদেশ থেকেও এখন পণ্য আমদানি কমেছে। দেশি কোম্পানিগুলো এ পরিস্থিতি বুঝে দাম সমন্বয় করেছে। এদিকে সাধারণ কলম, পেন্সিলের মতো একই হারে বেড়েছে রঙ পেন্সিল, মার্কারসহ অন্যান্য পণ্যের দামও। প্রতিটি রং পেন্সিল এখন ৫ টাকা থেকে বেড়ে ৭ টাকা এবং মার্কার পেন প্রতি পিস ২৫ থেকে বেড়ে ৩০ টাকা হয়েছে। প্লাস্টিক ও স্টিলের স্কেলে ডজনপ্রতি বেড়েছে ২০ থেকে ৫০ টাকা। শিক্ষা উপকরণ কিনতে আসা অভিভাবক সাজ্জাদুল করিম বলেন, এমন অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি আমাদের মতো মধ্যবিত্তের জন্য মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। কিন্তু শিক্ষা উপকরণের দাম বাড়ার বিষয় সেভাবে আলোচনায় আসে না। কেউ দেখেও না। সরকারেরও কোনো মাথাব্যথা নেই। নিম্নবিত্ত মানুষরা পড়াশোনা চালাতে নিরুৎসাহিত হবে। এমনকি পড়াশোনা বন্ধও করে দিতে পারে কেউ কেউ। যেটা ওই পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হবে। দোকানে কথা হয় কলেজ শিক্ষার্থী রোমানা ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রতিটি শিক্ষা উপকরণের দাম বেড়েছে। কিন্তু সেটা নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। অন্যান্য সব খরচ বাড়ার কারণে নিজের খরচ চালাতেই হিমশিম খাই। সঙ্গে শিক্ষা উপকরণের মূল্যবৃদ্ধিতে পড়ালেখা অসহনীয় হয়ে যাচ্ছে। আমরা কোনোভাবে সেটা কাটিয়ে চালিয়ে নিলেও এমন পরিস্থিতির কারণে অনেক দরিদ্র পরিবারের সন্তান শিক্ষা থেকে ঝরে পড়বে। ছয় বছর বয়সী ছেলের জন্য শিক্ষা উপকরণ সামগ্রী কিনতে আসা আরিফুল হক নামের এক অভিভাবক বলেন, ‘বাজারে দাম বাড়েনি এমন জিনিস খুব কম খুঁজে পাওয়া যাবে। কিন্তু আমার ইনকাম বাড়ছে না। অনেক কৌশলে সংসার চালাতে হচ্ছে। এখন আবার শুনতে মনে হচ্ছে শিক্ষা উপকরণের দাম। কিন্তু বাসা ভাড়া, দ্রব্যমূল্য সব যেভাবে বাড়ছে তাতে সংসার চালিয়ে সন্তানের লেখাপড়া চালাতে বেগ পোয়াতে হচ্ছে।’ শুধু আরিফুলই নয়; নগরীর আরও বেশ কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যে পরিবারে দুই বা তিন সন্তান লেখাপড়া করছে ওই পরিবারগুলোতে সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ চালাতে নাভিশ্বাস উঠেছে।

Comments (0)
Add Comment