শীতল বৃষ্টির ফোঁটা আর দমকা বাতাসে কাবু নিম্ন আয়ের মানুষ

ধান ও আমের জন্য মাঘের বৃষ্টি আর্শিবাদ হলেও আলুসহ রবি ফসলের জন্য সর্বনাশ

স্টাফ রিপোর্টার: মাঘের এই শেষ সময়ে হাড় কাঁপানো শীত নামার কথা। কিন্তু নেমেছে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার দিনভর দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি ধান ও আমের জন্য আর্শিবাদ হয়ে এলেও আলুসহ বিভিন্ন রবি ফসলের জন্য সর্বনাশ ডেকে এনেছে। হিমেল হাওয়ার ঝাপটা ভোগান্তিতে ফেলেছে হতদরিদ্র শীতার্ত মানুষদের। পরিসংখ্যান বলছে, ফেব্রুয়ারি মাসের এ সময়ে এতো বেশি বৃষ্টিপাত বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে আর হয়নি। এ যেন মাঘ মাসে আষাঢ় নেমে এসেছে। ফলে চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরসহ দেশের বেশির ভাগ এলাকার জনজীবন যেন অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছে। নানা কাজে বাইরে যারা বের হয়েছেন, তারা শীতল বৃষ্টির ফোঁটা আর দমকা বাতাসে কাবু হয়ে পড়েছেন। বর্ষার মতো বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট কাদায় মাখামাখি হয়ে পড়েছে। তবে আগামী তিনদিন বৃষ্টির প্রবণতা থাকতে পারে। এই তিনদিনের শেষভাগে বৃষ্টির এমন প্রবণতা কেটে যেতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বৃষ্টিপাতের প্রবণতায় এ সময়ে সারাদেশে রাতের তাপমাত্রা অপরিবর্তিত থাকতে পারে। তবে দিনের তাপমাত্রা ২ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমে যেতে পারে। তবে শনিবার সকাল থেকে ঝলমলে রোদ ছড়াতে পারে স্বস্তির আবহাওয়া।
এদিকে শৈত্যপ্রবাহ না থাকলেও শুক্রবার দেশের বেশির ভাগ এলাকায় শীত বেশি অনুভূত হয়েছে। এর কারণ হিসেবে আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, শুক্রবার মেঘাচ্ছন্ন আকাশে রোদ ছিলো না। ফলে রাত ও দিনের তাপমাত্রার পার্থক্য কমে এসেছে। সেই সঙ্গে বৃষ্টি থাকায় শীতের অনুভূতি বেশি লাগছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, গত কয়েকদিন ধরে বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলে তীব্র শীত অনুভূত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পশ্চিমা লঘুচাপ। এর প্রভাবে ঢাকা, রাজশাহী রংপুর ও খুলনা বিভাগের অধিকাংশ এলাকায় বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির সঙ্গে রয়েছে হালকা দমকা হাওয়া। উত্তরাঞ্চল ও খুলনা বিভাগের জেলাগুলোতে বৃষ্টি বেশি হয়েছে। এতে করে ধান বাদে রবি শস্য, আলু, মসুর, পেঁয়াজ, রসুনসহ বিভিন্ন ফসল নিয়ে বিপাকে পড়েছেন চাষিরা। দিনভর বৃষ্টি ও জোরে বয়ে চলা শীতল বাতাসে কাজের খোঁজে পথে নামা শ্রমজীবি মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছে। হতদরিদ্র ভাসমান মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দিয়েছে এই শীতল হাওয়া ও বৃষ্টি।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মাঘের শেষ সময়ে এই বৃষ্টিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শীত আরও জেঁকে বসতে পারে। রোববার থেকে বৃষ্টি কমবে তবে তাপমাত্রও কমবে। শুক্রবার দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে তেঁতুলিয়ায় ১১ দশকি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। চুয়াডাঙ্গায় সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিলো প্রায় একই। শুক্রবার চুয়াডাঙ্গায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড ১৭ ডিগ্রি এবং সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড ১৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঢাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিলো ১৮ দশমিক ২ ডিগ্রি এবং সর্বোচ্চ ছিলো ২৫ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছেলো পটুয়াখালীতে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গতকাল শুক্রবার দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছে খুলনায়, ৪৫ মিলিমিটার। এছাড়া রাজশাহীতে ২৫ মি.লি. ঈশ্বরদীতে ৩৫ মি.লি. বগুড়ায় ২৯ মি.লি. দিনাজপুরে ৪১ মি.লি. রংপুরে ৩৪ মি.লি. চুয়াডাঙ্গায় ২২ মি.লি এবং ঢাকায় ১১ মি.লি. বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গায় বৃহস্পতিবার রাত থেকে থেমে থেমে বৃষ্টি হলেও শুক্রবার ভোর থেকে মেঘের গর্জনের সাথে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে রোদেও দেখা নেই। হঠাৎ বৃষ্টির কারণে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। শীত ও বৃষ্টির অসহনীয় মাত্রায় দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে। প্রয়োজনীয় কাজ ছাড়া ঘর থেকে বাইরে বের হচ্ছে না কেউ। সকালে কাজের সন্ধানে বের হওয়া নিম্নআয়ের কর্মজীবী মানুষ সব থেকে পড়েছেন বিপাকে।
চুয়াডাঙ্গা আবহাওয়া অফিসসূত্রে জানা গেছে, গতকাল শুক্রবার সকাল ৯টায় জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৯৩ শতাংশ। সকাল ৯টার আগে বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ৫-৬ কিলোমিটার বেগেও বয়ে যাচ্ছিলো। আজ শনিবার থেকে অবহাওয়া স্বাভাবিক হতে পারে। গতকাল শুক্রবার রাত ৯টা পর্যন্ত জেলাজুড়ে ২৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা শহরের শহীদ হাসান চত্বরে কথা হয় ভ্যানচালক শমসের আলীর সাথে। তিনি বলেন, খুব সকালে বাড়ি থেকে যখন বের হই তখন বৃষ্টি ছিল না। বাজারে এসেই বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বৃৃষ্টির কারণে আমরা ভাড়া মারতে পারছি না। আকাশে মেঘ আছে, বারবার মেঘ ডাকছে। বৃষ্টির মধ্যে ভ্যানে উঠছেন না যাত্রীরা।
চুয়াডাঙ্গা পৌর শহরের কলেজ রোডের বাসিন্দা মো. ইমদাদুল হক বলেন, বৃহস্পতিবার রাত থেকে থেমে থেমে বৃষ্টি হয়েছে, শুক্রবার ভোর থেকেও গুড়ি গুড়ি হচ্ছে। সেই সাথে মাঝেমাঝে দমকা বাতাসও হচ্ছে। সূর্য নেই, বৃষ্টিতে খুব শীতের তীব্রতা বেশি। তাই আমাদের স্বাভাবিক কাজ কর্ম ব্যাহত হচ্ছে।
সদর হাসপাতাল রোডের হোটেল ব্যবসায়ী আবুল কালাম আজাদ বলেন, ভোর থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে। সেই সাথে হিমেল বাতাসে শীতের তীব্রতাও বেশি মনে হচ্ছে। দরকার ছাড়া বাড়ি থেকে কেউ বের হচ্ছেন না। তাই সকাল থেকে বিক্রিও নেই।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল চত্বর এলাকার শিশুদের খেলনা ও ঝালমুড়ি বিক্রেতা (হকার) শুকুর আলী বলেন, আমি প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যার পর পর্যন্ত হাসপাতাল চত্বরে দাঁড়িয়ে ঝালমুড়ি ও শিশুদের খেল না বিক্রি করি। কিন্তু বৃষ্টি আসায় হাসপাতালের বারান্দার ছাদের নিচে দাঁড়িয়ে আছি। আসার পর ৩০ টাকার ঝালমুড়ি বিক্রি করেছি। কিন্তু এখন প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি, কোনো বিক্রি নেই। বৃষ্টির কারণে হাসপাতালে রোগীর চাপও নেই।
চুয়াডাঙ্গা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সামাদুল হক দৈনিক মাথাভাঙ্গাকে বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে ১.৬ মিলিমিটার এবং গতকাল শুক্রবার রাত ৯টা পর্যন্ত জেলাজুড়ে ২৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আজ শনিবার থেকে বৃষ্টির দেখা নাও মিলতে পারে। স্বাভাবিক হতে পারে পরিস্থিতি।

Comments (0)
Add Comment