গ্রেফতারের ভয়ে রাতে বাড়ি থাকে না জীবননগরের কৃষ্ণপুর গ্রামের পুরুষেরা

জীবননগর ব্যুরো: জীবননগর কৃষ্ণপুর গ্রামটিতে সন্ধ্যা নামলে শত শত পুরুষ বাড়ি ছোড় আশ্রয় নিচ্ছেন মাঠে। দিনেরবেলায় এলাকার কৃষক মাঠে কৃষি কাজ করলেও রাত হওয়ার আগেই তারা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ বের হয়। ফসলি জমিতে সোলার বিদ্যুৎ প্লাট বন্ধের দাবিতে উত্তাল গ্রামবাসীর বিরুদ্ধ চাঁদাবাজি ও ভাঙচুর মামলা দায়েরের পর গ্রেফতার আতঙ্কে গ্রামটি পুরুষ শূন্য হয় পড়েছে।

কৃষ্ণপুর গ্রামবাসীর অভিযোগ, সিঙ্গাপুর ভিত্তিক সাইক্লিক্ট এনার্জি ওয়ান লিমিটেড সোলার বিদ্যুৎ প্লাট তৈরি করতে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রভাবিত করে জোর করে তাদের কৃষি জমি বিক্রি করতে বাধ্য করছেন। ওই প্রভাবশালীরা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তাদের একমাত্র চাষের জমি বিক্রি না করলে জোর করে দখল করারও হুমকি দিচ্ছেন। কৃষি নির্ভর গ্রামটিতে তাদের কৃষি জমি বিক্রি করতে কৃষকরা নারাজ। তারা আবাদি জমিতে বিদ্যুৎ প্লাট তৈরি বন্ধ করতে নিজেদের জীবন দিতেও প্রস্তুত।

জানা যায়, জীবননগর উপজেলার কৃষ্ণপুর ২০১৮ সালের ১৮ জুলাই সিঙ্গাপুর ভিত্তিক সাইক্লিক্ট এনার্জি ওয়ান লিমিটেড কোম্পানি স্থানীয় এজেন্টদের সহায়তায় গ্রামটির মাঠ পরিদর্শন করেন। ২০১৮ সালের অক্টোবর মাস ৫০ মেগাওয়াট সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদন বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়। কি এলাকার কৃষক তাদের আবাদি কৃষি জমি নষ্ট করে বিদ্যুৎ প্লাট করতে রাজি না। জমি বাঁচাতে কৃষকরা মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ করেই চলেছে। গত ৭ জুলাই কৃষ্ণপুর গ্রামের কৃষক তিন ফসলি জমিতে বিদ্যুৎ প্লাট নির্মাণের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকর কার্যালয়ে বিষের বোতল নিয়ে মানববন্ধন করেন। পরে জেলা প্রশাসকর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি প্রদান করে বাড়ি ফেরার পথে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সোলার বিদ্যুৎ প্লাটের নির্মাণাধীন একটি অফিস ঘর ভাঙচুর করা হয়।

পুলিশ জানিয়েছেন, রায়পুর ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর গ্রামে সোলার বিদ্যুৎ প্লাট বন্ধ বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর বিরুদ্ধে দুইটি প্রতিষ্ঠানে হামলা ও  ভাঙচুরের অভিযোগ থানায় মামলা হয়েছে। সিঙ্গাপুর ভিত্তিক সাইক্লিক্ট এনার্জি ওয়ান লিমিটেডের পক্ষে কোম্পানির স্থানীয় এজেন্ট আবু তাহের বাদী হয়ে কেন্দ্রীয় যুবলীগের সদস্য জাহাঙ্গীর আলমসহ ৬৫ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত আরো ১৫০ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন। এছাড়াও রায়পুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুর রশীদ শাহ তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুরের অভিযোগে ৬৫ জনের নাম উল্লেখ করে আরোও একটি মামলা করেন।

কৃষ্ণপুর গ্রামের বৃদ্ধা জামিনা খাতুন (৫৫) বলেন, সংসার আমার বৃদ্ধ স্বামী ও এক নাতি আছে। স্বামী ঠিকমতো হাঁটাচলা করতে পারে না। নাতিটায় মাঠে কাজ করে কোনো রকম সংসার চালায়। কয়েকদিন ধরে গ্রাম পুলিশ এসে বাড়ি বাড়ি যাচ্ছে। ভয়ে কেউ রাতে ঘরে থাকছে না। রাত হলেই গ্রামের প্রতিটি ঘরে শুধু মেয়েরা থাকছে। পুরুষ মানুষ রাতে বাড়িতে না থাকায় ভয়ে ঘরের মধ্যে জেগে বসে থাকি। এভাবে আর কতোদিন কাটবে বাপু কিছু বুঝতে পারছি না।

কৃষ্ণপুর গ্রামের সাবেক ইউনিয়ন কৃষক লীগ সভাপতি আব্দুস সাত্তার (৭৬) বলেন, বৃদ্ধ ব সে এসে মামলার শিকার হয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে বাড়িতে থাকা অবস্থায় শুনলাম আমার নাম ভাঙচুর ও চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে। সবাই আমাকে বাড়ি থেকে চলে যেতে বললো। কি আর করা মিথ্যা মামলায় গ্রফতারের ভয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে আসলাম।

কৃষ্ণপুর গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য জোহর আলী বলেন, যে জায়গায় সোলার বিদ্যুৎ প্লাট নির্মাণ করা হবে; সেখানই আমাদের জমি রয়েছে। চেয়ারম্যান আমাকে জমি রেজিস্ট্রি করে দিতে বলেন। কিন্তু চাষের জমি বিক্রি করলে চলবে কি করে। এই জমিতে চাষ করে পরিবার নিয়ে জীবন চলে। জমি না দেয়ায় আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা হয়েছে।

রায়পুর ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রশীদ শাহ বলেন, গত কয়েকদিন আগে সিঙ্গাপুর ভিত্তিক সোলার বিদ্যুৎ সাইক্লিক্ট এনার্জি ওয়ান লিমিটেড কোম্পানি কৃষ্ণপুর মাঠ ১০৯ বিঘা জমি কেনেন। আমার ছেলে ওই কোম্পানিতে চাকরির সুবাদে সম্পত্তি দেখাশোনা করার কারণে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়েছে। প্রতিষ্ঠান ভাঙচুরের অভিযোগ থানায় একটি  মামলা করছি।

তিনি বলেন, গ্রামবাসী আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করেছেন তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। ওই কোম্পানির সাথে আমার ব্যক্তিগত কোন সম্পর্ক নেই।

সাইক্লিক্ট এনার্জি ওয়ান লিমিটেডের স্থানীয় এজেন্ট আবু তাহের জেবা বলেন, সোলার বিদ্যুৎ প্লাট তৈরিতে কোম্পানি আমাকে এজেন্ট নিয়োগ করেছে। কোম্পানির কেনা ১০৯ বিঘা জমিতে অফিস নির্মাণ কাজ শুরু করলে স্থানীয়রা হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। তাদের দলনেতা ওই গ্রামের কেন্দ্রীয় যুবলীগের সদস্য জাহাঙ্গীর আলম কোম্পানির কাছে শতকরা দুই ভাগে শেয়ার দাবি করলে কোম্পানি দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার নেত্বতে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়।

কেন্দ্রীয় যুবলীগর সদস্য জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ভাংচুরের সময় আমি এলাকাতেই ছিলাম না। কোম্পানির কান্ট্রি ডিরেক্টর জাকির হুসাইন আমাকে নিয়ে এলাকায় গ্রামবাসীদের সাথে মিটিং করে। কিন্তু গ্রামের সকলে তাদের একমাত্র আবাদি জমি বিক্রি করতে না চাইলে আমি তাদের স্পষ্ট জানিয়ে দিই এলাকার মানুষ না চাইলে বিদ্যুৎ প্লাট হবে না। চাঁদাবাজির যে জঘন্য অভিযোগ তোলা হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।

সাইক্লিক্ট এনার্জি ওয়ান লিমিটেডের কান্ট্রি ডিরেক্টর জাকির হুসাইন বলেন, সোলার বিদ্যুৎ প্লাট নির্মাণের কোনো বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি না। এই বিষয়ে কোম্পানির পক্ষ থেকে নির্দেশনা নেই।

জীবননগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল খালেক জানান, মামলা হওয়ার পর পুলিশ আসামিদের আটক করতে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। এরই মধ্যে অভিযুক্ত ৫ জনকে আটক করা হয়েছে।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More