চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই রোগীর ক্যাথেটার দিলো স্বেচ্ছাসেবক

রক্তক্ষরণ ও যন্ত্রণায় কাতর চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের দু’রোগী : ঘটনার সত্যতা পাননি আরএমও

স্টাফ রিপোর্টার: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই দুই রোগীর ক্যাথেটার লাগিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের দুই স্বেচ্ছাসেবকের বিরুদ্ধে। নিজের ইচ্ছায় ক্যাথেটার লাগিয়ে তারা শুধু টাকা হাতিয়েই নেয়নি, সাথে দিয়েছেন রোগীর ব্যাপক জ্বালা-যন্ত্রণা। যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে বাধ্য হয়ে দুই রোগীই খুলে ফেলেন তাদের ক্যাথেটার তথা প্রস্রাবের নল। এরপর পুরুষাঙ্গ থেকে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। গতপরশু সোমবার বিকেলে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের নতুন ভবনের ৬ষ্ঠ তলায় পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডে এ ঘটনা ঘটে।

এদিকে, চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই রোগীর ক্যাথেটার দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত স্বেচ্ছাসেবক সজিব তার ভুল স্বীকার করেন। তবে, রোগী এবং স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে ক্যাথেটার লাগানোর সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছেন আরএমও ডা. ফাতেহ আকরাম। এমনকি কোন স্বেচ্ছাসেবক রোগীর ক্যাথেটার করেছেন তাদেরও চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি বলেও জানান তিনি।

হাসপাতালসূত্রে জানা গেছে, গত ২৩ জানুয়ারি সকালে দামুড়হুদা উপজেলার জয়রামপুর গ্রামের মাঠপাড়ার মৃত আফছার উদ্দিনের ছেলে শহিদুল ইসলামকে (৭০) শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন সমস্যা জনিতকারণে সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান পরিবারের সদস্যরা। চিকিৎসক তাকে মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি রাখেন। শহিদুল ইসলামের স্ত্রী চায়না বেগম বলেন, গত সোমবার বিকেলে দুজন স্বেচ্ছাসেবক এসে ক্যাথেটার কিনে আনতে বলেন। আমরা নিয়ে আসার পর তারা ক্যাথেটার লাগিয়ে ২শ টাকা নেন। এরপর থেকেই পুরুষাঙ্গে প্রচুর যন্ত্রণা শুরু হয়। যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আমার স্বামী নিজেই ক্যাথেটার খুলে ফেলেন। এরপর থেকেই মূত্রত্যাগের সময় রক্তক্ষরণ হচ্ছে। তবে রক্তক্ষরণ এখন কিছুটা কম হয়েছে।

অপরদিকে, গত ২২ জানুয়ারি বিকেলে জীবননগর উপজেলার উথলী গ্রামের পশ্চিমপাড়ার মৃত কাদের মোল্লার ছেলে আনছার আলী (৮৩) শ্বাসকষ্ট বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ভর্তি হন। আনছার আলীর মেয়ে তানজিরা খাতুন বলেন, অতিরিক্ত শ্বাসকষ্ট শুরু হলে গত সোমবার বিকেলে আমার বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করি। বিকেলে একজন মজিলা ও একজন পুরুষ এসে ক্যাথেটার কিনে আনতে বলেন। আমরা কিনে আনলে আমার বাবাকে ক্যাথেটার লাগিয়ে দেন। কিছুক্ষণ পর অতিরিক্ত জ্বালা যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকেন। নিজেই খুলে ফেলেন ক্যাথেটার। এরপর থেকেই প্রস্রাবের সময় রক্তক্ষরণ হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, আজ (মঙ্গলবার) সকালে রাউন্ডে আসা চিকিৎসককে বিষয়টি জানাই। প্রেসক্রিপশন দেখে সেখানে কোনো ক্যাথেটারের অর্ডার ছিলো না বলে জানান ওই চিকিৎসক।

তানজিরা খাতুন আরও বলেন, ভর্তির দিন বিকেলে একজন পুরুষ ও একজন নারী আমার বাবার জন্য ক্যাথেটার কিনে আনতে বলেন। আমার ভাই কিনে আনলে পুরুষ স্বেচ্ছাসেবক আমার বাবাকে ক্যাথেটার লাগিয়ে ২শ টাকা দাবি করেন। আমি ১শ টাকা দিতে চাইলে তিনি তা নিতে অস্বীকৃতি জানান। পরে জোরপূর্বক ২শ টাকা নেন। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রে ক্যাথেটার না থাকলেও আমার বাবাকে ক্যাথেটার দেয়া হলো। এখন আমার বাবার পুরুষাঙ্গ দিয়ে রক্ত আসছে এ নিয়ে চিন্তিত আমরা। আমরা মনে করেছি চিকিৎসক লিখেছেন বলেই তারা ক্যাথেটার দিয়েছে।

সদর হাসপাতালের মেডিসিন (পুরুষ) ওয়ার্ডের তথ্যমতে, মঙ্গলবার দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন সজিব ও শাহনাজ। এ সময়ে চিকিৎসক, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দায়িত্বরত স্বেচ্ছাসেবক ও সেবিকাদের না জানিয়ে অন্য কোনো স্বেচ্ছাসেবক এই ওয়ার্ডে সেবা দিতে পারবেন না বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছেন। আর এইদিন বিকেলে ২ রোগীকে ক্যাথেটার লাগানো হলেও কেউ স্বীকার করছে না বলে জানান হাসপাতালের আরএমও।

চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রে ক্যাথেটার না লেখা স্বতেও কেন লাগানো হয়েছে; এ বিষয়ে জানতে চাইলে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের স্বেচ্ছাসেবক সজিব ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, আমার ভুল হয়েছে। আর কখনো এমন হবে না বলেও জানান তিনি। এছাড়াও সংবাদ প্রকাশ না করতেও অনুরোধ করেন।

অপর স্বেচ্ছাসেবক শাহনাজ মোবাইলফোনে বলেন, একজনকে ক্যাথেটার দেয়া হয়েছিলো। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রে ক্যাথেটার না লেখা স্বর্তেও কেন লাগানো হয়েছে; এ বিষয়ে জানতে চাইলে কোন সদুত্তোর না দিয়ে উল্টো অভিযোগ কে করেছে এ বিষয়ে প্রতিবেদকের নিকট জানতে চান তিনি। প্রতিবেদক নিজেই রোগীর থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছে জানালে তিনি মুঠোফোনে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের কনসালটেন্ট (কার্ডিওলজি) ডা. আবুল হোসেন বলেন, সকালে মেডিসিন ওয়ার্ডে রাউন্ডে সময় এক রোগী ক্যাথেটার খুলে ফেলার কারণে পুরুষাঙ্গ থেকে রক্ত বের হচ্ছে বলে রোগীর স্বজনরা আমাকে জানান। আমি রোগীকে পরবর্তী চিকিৎসা দিয়েছি। উন্নতি না হলে বাইরে রেফার করা হতে পারে। অন্য রোগীর বিষয়ে আমাকে কেউ জানায়নি। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রে ক্যাথেটার ছিলো না প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেক সময় প্রয়োজন হলে স্বেচ্ছাসেবকেরা ক্যাথেটার দিয়ে থাকেন। পরে চিকিৎসকের দিয়ে ব্যবস্থাপত্রে লিখে নেন।

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. এএসএম ফাতেহ আকরাম বলেন, আমি বিষয়টি দেখেছি। ওটার কোনো কিছু পাওয়া যায়নি। ব্যবস্থাপত্রে ক্যাথেটার-ই তো লেখা নাই। আর পুরুষাঙ্গ দিয়ে ব্লাড (রক্ত) বের হচ্ছেনা। কখন ক্যাথেটার লাগালো, কখন ব্লাড বের হলো কেউ তো কোনো কিছু বলছে না।

ব্যবস্থাপত্রে না থাকা স্বত্বেও ক্যাথেটার লাগানো হলো এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ক্যাথেটার কেউ লাগিয়েছে কিনা কেউ স্বীকার করছেনা। রোগীর লোক বলছে রোগীর পুরুষাঙ্গে কোনো ক্যাথেটার ছিলো না। কখন লাগালো তাও বোঝা যাচ্ছে না। রোগীর স্বজনদের আমার রুমে ডাকা হয়েছিলো, তারা আসেনি। কোনো অভিযোগও দেয়নি। কে লাগাইছে রোগীর লোকজনও খুঁজে পাচ্ছে না।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) চুয়াডাঙ্গা জেলা শাখার সভাপতি ডা. মার্টিন হীরক চৌধুরী দৈনিক মাথাভাঙ্গাকে বলেন, এটা আসলেই দুঃখজনক বিষয়। চিকিৎসকের অনুমতি ব্যতীত ক্যাথেটার লাগানো কোনো ছোটো বিষয় নয়। এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। স্বেচ্ছাসেবকদের সেচ্ছাচারিতা বেড়েই চলেছে। এমন কর্মকা-ের সত্যতা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেই স্বেচ্ছাসেবকদের ছাটাই করা উচিত। তিনি আরও বলেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ক্যাথেটার দেয়া হলে রোগী মারাত্মক ঝুঁকি হতে পারে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের হলে রোগীর জীবনের ঝুঁকিও থাকতে পারে। আবার মূত্রনালী ছোট হয়ে যাবার সম্ভাবনাও থাকে। পাশাপাশি ইনফেকশনও হতে পারে। ডা. মার্টিন হীরক বলেন, আমি আরএমও’র সাথে কথা বলেছি। তিনি জানিয়েছেন, ‘চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রে ক্যাথেটার ছিলো না। রোগীদেরকে ক্যাথেটার দিয়েছে তাদেরও চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। তাছাড়া রোগীদের কোনো অভিযোগ নেই।’

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More