দেশের অন্যতম বৃহৎ মোকাম কুষ্টিয়ায় অস্থির চালের বাজার

দাম বাড়ার লাগাম কিছুতেই টেনে ধরা যাচ্ছে না

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি: দেশের অন্যতম বৃহৎ মোকাম কুষ্টিয়ায় অস্থির চালের বাজার। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে চালের দাম। দাম বাড়ার এই লাগাম কিছুতেই টেনে ধরা যাচ্ছে না। এক বছরের ব্যবধানে কুষ্টিয়ার খাজানগরে সব ধরনের চালের দাম কেজি প্রতি ৮ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ঈদের আগে দাম কিছুটা কমলেও ঈদের পর কয়েক দফায় বেড়েছে চালের দাম। দাম বৃদ্ধির এ প্রবণতা এখনও অব্যাহত রয়েছে। জেলায় ধানের বাজারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে চালের দাম। মিল মালিকরা বলছেন, ধানের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় তার সাথে সমন্বয় করতে চালের দাম বাড়াতে হচ্ছে।
এদিকে খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত বছর জুনে যে চালের কেজি ছিলো ৩২ থেকে ৩৩ টাকা সেই চাল এ বছর একই সময়ে ৪৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের মন্তব্য গত দুই বছরের মধ্যে এবারই চালের বাজার সব থেকে বেশি।
চাল ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমন মরসুমের আগ পর্যন্ত এমন দাম বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। করোনা পরিস্থিতির কারণে বিদেশ থেকে সহজে চাল আমদানি করা যাবে না এমন কথা চিন্তা করে অনেক অসাধু আড়ৎদাররা ধান ও চাল মজুদ করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
মিল মালিক, কৃষক ও খাদ্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রমজানের মধ্যে সারাদেশে পুরোদমে বোরো ধান কাটা শুরু হয়। নতুন ধান মিলগুলোতে আসায় চালের দাম ধীরে ধীরে কমতে থাকে। ঈদের আগ পর্যন্ত মিনিকেট, কাজললতা, বাসমতি, আঠাসসহ অন্য মোটা চালের বাজার কেজিতে মিল গেটে ৩ থেকে ৪ টাকা পর্যন্ত কমে যায়। তবে ঈদের পরের চিত্র একেবারে ভিন্ন।
কুষ্টিয়া চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন জানান, মূলত চলতি বছরের মে মাসের ১৫ তারিখের পর থেকে কুষ্টিয়ায় চালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে মিনিকেট চাল মিল গেটেই পাইকারি ৪৯ টাকা কেজি আর ৫০ কেজির বস্তা ২৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাজলতা আগে যেখানে ২০০০ টাকা বস্তা বিক্রি হয়েছে এখন তা ২২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ইাইব্রিড মোটা চাল আগে যেখানে ৩৪-৩৫ টাকা কেজি ছিলো। এখন সেখানে ৩৮ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। বাসমতি ২৫ কেজির বস্তা আগে ছিলো ১২৮০ টাকা। এখন মিলগেটেই ১৪০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে।
মিলাররা জানান, ঈদের আগে কুষ্টিয়ার মিলগুলো পুরোপুরি চালু হলেও নওগাঁ, দিনাজপুরসহ অন্যান্য জেলার মিলগুলো পুরোদমে উৎপাদনে ছিলো না। ঈদের পর সব জেলার মিলগুলো সচল রয়েছে। এর মাঝে প্রচুর ধান কিনে মজুদ রেখেছেন মিল মালিকরা। ছাঁটাই ও বিপণন কার্যক্রম চলছে জোর গতিতে। সব জাতের ধান মণ প্রতি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা বেড়ে গেছে। বিশেষ করে আটাস, কাজললতা ও মিনিকেট (সরু) জাতের ধানের বাজার এখনও বেশ চড়া। যে ধান গত বছর এই সময়ে ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা মণ ছিলো এখন তা হাজারে ঠেকেছে। পাশাপাশি সরু ধান গত বছর এই সময়ে ৮০০-৯০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হলেও এখন ১১৮০ টাকা মণ বিক্রি হচ্ছে।
পৌর বাজারের খুচরা ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন জানান, ঈদের আগের তুলনায় এখন বাজার চড়া। করোনার কারণে বাইরে থেকে চাল আনা সহজ হবে না এমনটা আঁচ করতে পেরে সুযোগ সন্ধানীরা এবার প্রচুর ধান ও চাল কিনে মজুদ করছে যেনো সময় বুঝে বাজারে ছেড়ে অধিক মুনাফা অর্জন করা যায়।
তিনি বলেন, যে মিনিকেট চাল ঈদের আগে প্রতি কেজি ৪৫ টাকা ছিলো তা এখন ৫২ টাকা, আটাস ৪০ টাকা থেকে বেড়ে ৪৫-৪৬ টাকা, কাজললতা ৪৭ টাকা কেজি, বাসমতি চাল ৬২ টাকা এবং নাজিরশাইল ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এমনকি যে মোটা চাল ৩০ টাকা ছিলো তার দামও বেড়ে গিয়ে এখন ৪০ টাকায় ঠেকেছে।
খাজানগর মোকামে মিলারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছরের তুলনায় এবার চালের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি। যার আঁচ ইতোমধ্যে বাজারে পড়েছে। চালের বাজার শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকবে সর্বত্রই এমন আলোচনা চলছে।
মিলাররা জানান, খোলা বাজারে ধান ও চালের দাম বেশি হওয়ায় এ বছর বোরো ধান সংগ্রহ অভিযান অনেকটায় থমকে গেছে। সরকারি গোডাউনে কৃষক ও মিলাররা ধান ও চাল দিতে পারছে না। মোটা চালের দাম সরকার ৩৬ টাকা নির্ধারণ করলেও তা এখন বাইরে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৪ টাকা লোকসানে কোনো মিলার চাল দিতে চাইছে না। পাশাপাশি বাইরে বেশি দাম পাওয়ায় নানা ঝামেলার কারণে কৃষকরা গোডাউনে ধান দিতে চাচ্ছে না। জেলায় এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ধান সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, ৩৪ হাজার টনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এ পর্যন্ত মাত্র ৪ হাজার টন চাল সংগ্রহ হয়েছে। আর ৬ হাজার মে. টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ধান সংগ্রহ করা গেছে মাত্র ৬ মে. টন। দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে বাংলাদেশ অটো রাইস মিলস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি দেশের শীর্ষ চাল ব্যবসায়ী আব্দুর রশিদ বলেন, ধানের বাজারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে চালের বাজার বাড়ছে। দেশে আম্ফান ঝড়ে ১৫ ভাগ ধান নষ্ট হলেও বাম্পার ফলন হয়েছে। এতে অভ্যন্তরীণ বাজারে ধান ও চালের সঙ্কট না হলেও দামের হেরফের হবে। কৃষকরা ধানের ভালো দাম পাচ্ছেন। দাম আরো বাড়তে পারে। ধানের দাম বাড়লে সামনে চালের দাম আরো বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
চালের দাম দফায় দফায় বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ কী জানতে চাইলে কুষ্টিয়া চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন জানান, ধানের দাম বাড়ার কারণে চালের দাম বাড়ছে। তবে তুলনামূলকভাবে ধানের দাম যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে সেভাবে চালের দাম বৃদ্ধি পায়নি। তিনি বলেন, জুন-জুলাই মাসে চালের দাম স্থিতিশীল থাকলেও আগস্ট মাস থেকে চালের বাজার আরো চড়া হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সরকার যদি চাল আমদানি করে সেটা ভিন্ন কথা।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More