অঞ্চলভিত্তিক রেডজোন ঘোষণা করে লকডাউনের ওপর গুরুত্বারোপ

স্টাফ রিপোর্টার: চুয়াডাঙ্গায় করোনা পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বৃহস্পতিবার আরও ১৪ জনের করোন শনাক্ত হয়েছে। জেলা শহরে এক সপ্তাহের মধ্যে প্রায় অর্ধশত ব্যক্তির শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদকের মৃত্যুর পর হোম আইসোলেশনে থাকা অনেকেই হাসপাতালমুখি হচ্ছেন। বৃহস্পতিবার রাতে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আইসোলেশনে ছিলেন ১৭ জন। বাড়িতে চিকিৎসাধীন ১১৫ জন। বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নেয়া অনেকেই জনসাধারণের মাঝে ঘুরে নিজের কাজ করছেন বলে অভিযোগ উঠছে। ফলে আক্রান্তদের বাড়ি লকডাউনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহলের অনেকে।

চুয়াডাঙ্গায় করোনা শনাক্তের ১১৯ তম দিনে জেলায় মোট করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩শ’ ৫জন। শুধুমাত্র গত ১৫ দিনেই চুয়াডাঙ্গা জেলায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ১২১ জনের মধ্যে ৫৭ জন রয়েছেন সদর উপজেলার। এর মধ্যে অর্ধশত আক্রান্তই চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার বাসিন্দা। ১৫ দিনের মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলায় করোনা আক্রান্ত হয়ে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। ১৫ জুলাই পৌর এলাকার গুলশানপাড়ার একজনের মৃত্যু হয়। ১৪ জুলাই তার শরীরে করোনা শনাক্ত হয়। এর আগে ৪ জুলাই ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার মালোপাড়ার একজনের মৃত্যু হয়। ওইদিনই ঢাকায় চিকিৎসাধীন দামুড়হুদার আরও একজনের মৃত্যু হয়। গতরাতেও উপসর্গ নিয়ে চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকায় নেয়ার পথে পৌর এলাকার এক ব্যবসায়ী নেতার মৃত্যু হয়। গত ১৯ মার্চ চুয়াডাঙ্গায় প্রথম করোনা শনাক্ত হয় আলমডাঙ্গার ইতালি প্রবাসী এক যুবকের। ১৪ দিন চিকিৎসা নিয়ে তিনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন।

চুয়াডাঙ্গা জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের হাতে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে ৩৮টি রিপোর্ট আসে। এর মধ্যে ১৪ জন করোনা ভাইরাস আক্রান্ত তথা কোভিড-১৯ রোগে ভুগছেন। এ নিয়ে চুয়াডাঙ্গায় মোট করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩০৫ জনে। বৃহস্পতিবার আরও ৭জন সুস্থ হয়ে উঠেছেন। ফলে আক্রান্তদের মধ্যে সুস্থতা পেলেন মোট ২শ’ ১২ জন। নতুন ১৪জন করোনা রোগীর মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সদরের ৮জন। চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকারই ৭জন। একজন দৌলাতদিয়াড়ের। দামুড়হুদা উপজেলার একজন। তিনি দর্শনা ইসলাম বাজারের বাসিন্দা। বাকি ৫ জন আলমডাঙ্গা উপজেলার। আলমডাঙ্গা পৌর এলাকার কলোনির দুজন, এরশাদপুরের একজন, বগাদীর একজন ও আসমানখালীর একজন।

গত ১৫ দিনেই চুয়াডাঙ্গা জেলায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ১২১ জনের মধ্যে ৫৭ জন রয়েছেন সদর উপজেলার। তারমধ্যে গত ২ জুলাই ৪৫টি নমুনার ফলাফলে সদর উপজেলার ৩ জনসহ জেলায় ৮ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। সদর উপজেলার ৩ জনের রয়েছেন মধ্যে চুয়াডাঙ্গা পুলিশ লাইনে কর্মরত এক পুলিশ সদস্য, চুয়াডাঙ্গা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক ও চুয়াডাঙ্গা বিদ্যুৎ অফিসে কর্মরত একজন। ৩ জুলাই ২৫টি রিপোর্টে ২ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়। তবে এদিন সদর উপজেলার কারো শনাক্তের রিপোর্ট না আসেনি। আক্রান্ত দুজনের বাড়ি দামুড়হুদা উপজেলার গোপালপুর ও আলমডাঙ্গা উপজেলার আসাননগর গ্রামে। ৪ জুলাই চুয়াডাঙ্গার নমুনা পরীক্ষার কোনো ফলাফল না এলেও এদিন জেলার দুজনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার মালোপাড়ার একজন এবং দামুড়হুদার পুড়োপাড়া গ্রামের একজন। তারা দুজনেই ঢাকায় চিকিৎসাধীন ছিলেন। ৫ জুলাই ৬৪টি রিপোর্ট সদর উপজেলার ৪ জনসহ চুয়াডাঙ্গার ১৭ জনের শরীরে করোনা পজিটিভ হয়। তার মধ্যে পৌর এলাকার চুয়াডাঙ্গা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে কর্মরত একজন আনসার সদস্য ও পৌর এলাকার এতিমখানাপাড়ায় আত্মবিশ্বাস এনজিও কার্যালয়ের ২ জন আক্রান্ত হন। ৬ জুলাই ৮টি রিপোর্টে চুয়াডাঙ্গার ২ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। তার মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের একজন স্বেচ্ছাসেবক ও ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড চুয়াডাঙ্গার শাখার এমসিজি পদের একজন কর্মচারী করোনা পজিটিভ হয়েছে। ৭ জুলাই ৪১ টি রিপোর্টে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার ৪ জনসহ ১১ জনের শরীরে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়। তার মধ্যে পৌর এলাকার মালোপাড়ার ২ জন, শহরের সিনেমা হলপাড়ার ১ জন এবং সদর উপজেলার কোটালি কমিউনিটি ক্লিনিকে কর্মরত একজন। করোনায় আক্রান্ত হয়ে মালোপাড়ার আরা হালদারের মৃত্যুর পর তার সংস্পর্শে থাকায় ওই দুজনের শনাক্ত হয়। ৮ জুলাই ৫০টি রিপোর্টে সদর উপজেলার ৩ জনসহ জেলায় ৭ জনের শরীরে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়। চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের একজন স্বেচ্ছাসেবকের শরীরে করোনা ভাইরাস শনাক্তের পর তার সংস্পর্শে আসা আরও দুইজনের করোনা পজিটিভ হয়। তাদের বাড়ি শহরের কানাপুকুর পাড়া ও কুন্দিপুর গ্রামে। চুয়াডাঙ্গা পুলিশ লাইনের একজন কনেস্টেবল করোনা পজিটিভ হয়। এছাড়াও চুয়াডাঙ্গা ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড শাখার একজন জুনিয়র অফিসার করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। ৯ জুলাই ২০ জনের রিপোর্টে চুয়াডাঙ্গার ২ জনের শরীরে করোনা ভাইরাস ধরা পড়ে। আক্রান্তদের মধ্যে একজন চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার নতুন বাজার ফিরোজ রোডের ১ জন ও চুয়াডাঙ্গা বর্ডার গার্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন যশোর বিজিবির ১ জন। ১০ জুলাই ৪৭ জনের রিপোর্টে পৌর এলাকারই ৬জনসহ চুয়াডাঙ্গায় ১৪ জনের করোনা শনাক্ত হয়। তার মধ্যে পৌর এলাকার থানা কাউন্সিলপাড়ার ১, মল্লিকপাড়ার ১, সদর উপজেলা পরিষদে কর্মরত ১, রেলপাড়ার ১ ও সিঅ্যান্ডবিপাড়ার ২ জন আক্রান্ত হন। ১১ জুলাই চুয়াডাঙ্গার নমুনা পরীক্ষার কোন রিপোর্ট আসেনি। ১২ জুলাই চুয়াডাঙ্গায় করোনা পরীক্ষার ৩৪টি রিপোর্ট আসে। তার মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার ৭ জনসহ জেলার ১০ জনের শরীরে করোনা পজিটিভ হয়। সদর উপজেলার ৭ জনের মধ্যে উপজেলা পরিষদের ত্রাণ ও দুর্যোগ অফিসের ১ জন, উপজেলার পরিষদে কর্মরত করোনা আক্রান্ত অপর একজনের স্ত্রী, আলোকদিয়া হাতিকাটা গ্রামের ১ জন, বিজিবির একজন সদস্য, পৌর এলাকার মসজিদপাড়ায় একজন নারী, আরামপাড়ায় ১ জন ও হাজরাহাটি গ্রামের ১ জন। ১৩ জুলাই ২৯টি করোনা পরীক্ষার রিপোর্টে চুয়াডাঙ্গার ৫ জনের শরীরে করোনা পজিটিভ হয়েছে। আক্রান্ত ৫ জনের মধ্যে চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার বেলগাছি ঈদগাপাড়ার ১ জন, ইসলামপাড়ার ১ জন, চুয়াডাঙ্গা শহরের একাডেমি মোড় এলাকার ১ নারী। ১৪ জুলাই ৪০ জনের নমুনার প্রতিবেদনে সদর উপজেলার ৮ জনসহ ১৬ জন করোনা শনাক্ত হয়। সদর উপজেলার আক্রান্ত ৮ জনের মধ্যে রয়েছেন পৌর এলাকার ফার্মপাড়ার একজন, থানা কাউন্সিল পাড়ার ৩ জন, গুলশানপাড়ার একজন, দৌলতদিয়াড়ের একজন ও ডিঙ্গেদহ আনসার ক্যাম্পের দুই সদস্য। ১৫ জুলাই করোনা আক্রান্ত হয়ে জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক শহরের গুলশানপাড়ার ফেরদৌস ওয়ারা সুন্নার মৃত্যু হয়। গত ১৪ জুলাই তিনিসহ সদর উপজেলার ৮ জনের শরীরে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়। এদিন অর্থাৎ ১৫ জুলাই ২১ জনের করোনা পরীক্ষার রিপোর্টে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার ৭ জনসহ জেলার ১৩ জন করোনায় আক্রান্ত হন। সদর উপজেলার ৭ জনের মধ্যে জেলা শহরের বাজারপাড়ার একই পরিবারের ৩ জনসহ ৪ জন, রেলপাড়ার ১ জন, বেলগাছিল ১ জন ও উপ সহকারী মেডিকেল অফিসার একজন। তিনি সম্ভবত ইমাজেন্সিপাড়ার বাসিন্দা। ১৬ জুলাই ৩৮ জনের নমুনার প্রতিবেদনে সদর উপজেলার ৮ জনসহ জেলার ১৪ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। সদর উপজেলার ৮ জনের মধ্যে পৌর এলাকারই ৭ জন। শেখপাড়ার একজন, ঈদগাহপাড়ার একজন, কলেজপাড়ার একজন, সাতগাড়ীর একজন, বাগানপাড়ার একজন, বড় মসজিদপাড়ার একজন, বিদ্যুত অফিসে কর্মরত একজন এবং শহরতলীর দৌলতদিয়াড়ের একজন আক্রান্ত হয়েছেন।

এদিকে, গতকাল বৃহস্পতিবার চুয়াডাঙ্গায় করোনা উপসর্গে ভুগছেন এমন আরও ৩০ জনের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য কুষ্টিয়া পরীক্ষাগারে প্রেরণ করেছে। ইটভাটা মালিক সমিতির এক নেতাসহ তার পরিবারের কয়েকজন করোনা আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বুধবার রাতে চুয়াডাঙ্গা জেলা শহরের গুলশানপাড়ার বাসিন্দা জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ফেরদৌসওয়ারা সুন্না মারা যান। বৃহস্পতিবার তার দাফন সম্পন্ন হয়। অনেকেই নামাজে জানাজায় শরীক হন। তার মৃত্যুর বিষয়টি যেমন ছিলো চুয়াডাঙ্গায় প্রধান আলচ্য বিষয়, তেমনই পৌর এলাকায় ব্যাপকহারে করোনা ছড়ানোর ফলে এলাকাভিত্তিক রেডজোন ঘোষণা করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন অনেকে।

প্রসঙ্গত, করোনায় এ পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গায় মারা গেছেন ৪ জন। করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন আরও ৩ জন। এদের মধ্যে দুজনের রিপোর্ট পজিটিভ এল্ওে একজনের রিপোর্ট আসতে বাকি।

 

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More