অকার্যকর উপজেলা পরিষদ : ইউএনওর হাতে সব ক্ষমতা : অধিকার আদায়ে আদালতের আশ্রয় নিতে যাচ্ছেন চেয়ারম্যান ভাইস চেয়ারম্যানরা

স্টাফ রিপোর্টার: সংবিধান ও আইন অনুযায়ী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের অধিকার আদায়ের জন্য এবার আদালতের আশ্রয় নিতে যাচ্ছেন ক্ষুব্ধ উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানরা। উপজেলা পর্যায়ে থাকা সরকারের ১৭টি মন্ত্রণালয় ও দফতরের কর্মকান্ড উপজেলা চেয়ারম্যানদের তত্ত্ববাবধানে দেয়ার সরকারি নির্দেশনা থাকলেও এর সবগুলোই নিয়ন্ত্রণ করছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। ফলে নির্বাচিত পরিষদ হয়েও আমলাতন্ত্রের কারণে পরিষদের কর্মকান্ডে কোনো ভূমিকাই রাখতে পারছেন না বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানরা। এ নিয়ে বিভিন্ন সময় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী, সংশ্লিষ্ট সচিব এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সঙ্গে অসংখ্য বৈঠক করেছেন উপজেলা পরিষদ অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা। লিখিতভাবেও জানিয়েছেন তাদের সমস্যার কথা। কিন্তু বাস্তবায়নের আশ্বাস ছাড়া কোনো কিছুই পাননি তারা। এ অবস্থায় সারা  দেশের উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য শিগগিরই আদালতে রিট করতে যাচ্ছেন অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা। উপজেলা পরিষদের সমস্যার কথা লিখিতভাবে জানানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও। বাংলাদেশ উপজেলা পরিষদ অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা জানিয়েছেন, দেশের ৪৯২টি উপজেলা পরিষদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি রয়েছেন ১ হাজার ৪৭৬ জন। ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে নির্বাচিত এই জনপ্রতিনিধিরা সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো দায়িত্বই যথাযথভাবে পালন করতে পারছেন না। সংবিধান ও আইন অনুযায়ী উপজেলা পর্যায়ে ১৭টি দফতর ও বিভাগের দায়িত্ব উপজেলা পরিষদের হাতে ন্যস্ত করে দেয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময়েও সেটি বাস্তবায়িত হয়নি। চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানদের অভিযোগ, উল্টো সব ক্ষমতা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা কুক্ষিগত করে রেখেছেন। স্থানীয় পর্য়ায়ে সংসদ সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে মাঠপর্যায়ের আমলাতন্ত্র নিজেদের ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন বলেও অভিযোগ করছেন জনপ্রতিনিধিরা। তারা বলছেন, উপজেলা পর্যায়ে অন্তত ১০০টি কমিটি রয়েছে, যেগুলোর প্রায় সব কটিতেই সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন হয় ইউএনও, নতুবা তার মনোনীত প্রশাসনের অন্য কর্মকর্তারা।  কোথাও উপজেলা চেয়ারম্যান বা ভাইস চেয়ারম্যানদের রাখা হয়নি। সম্প্রতি উপজেলা পরিষদের সার্বিক অবস্থা তুলে ধরে অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে এবং সমস্যার দ্রুত সমাধানে তার হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে। অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সংবিধান ও আইনের আলোকে উপজেলা পরিষদকে কার্যকর করতে প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা ও সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্বেও প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতার ফাঁদে উপজেলা পরিষদের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, উপজেলা পরিষদ আইনের ৪ ধারা এবং সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী উপজেলাকে প্রজাতন্ত্রের প্রশাসনিক একাংশ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। অথচ প্রতিটি উপজেলায় ডিসিদের নির্দেশে উপজেলা প্রশাসন নামে কাজ চলছে। এটি সংবিধান ও আইনের লঙ্ঘন ও দ্বৈত শাসনব্যবস্থার শামিল।

উপজেলা পরিষদ আইন ১৯৯৮ (সংশোধিত ২০১১) অনুযায়ী, উপজেলায় থাকা ১৭টি দফতরের কর্মকর্তা, কর্মচারী ও তাদের কাজ উপজেলায় হস্তান্তরিত। কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ওই ১৭টি বিভাগের যেসব কমিটি করা হয়েছে, এর সবগুলোতেই সভাপতি নির্বাহী কর্মকর্তা। আর উপদেষ্টা করা হয়েছে উপজেলা চেয়ারম্যানকে। একইভাবে আয়ন-ব্যয়ন কর্মকর্তা হচ্ছেন ইউএনও এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তা। অথচ একই প্রজ্ঞাপনে ইউনিয়ন ও পৌরসভায় আয়ন-ব্যয়ন কমিটির সভাপতি হচ্ছেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও পৌরসভার  মেয়র। অ্যাসোসিয়েশনের অভিযোগ, উপজেলা আইনের ২৪(৩) ধারা অনুযায়ী উপজেলাকে কার্যকর করতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে দায়িত্ব  দেয়া হয়েছে। ২০১৫ সালের ১৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী উপজেলা পরিষদের জন্য যে নির্দেশনা জারি করেছেন, অলিখিতভাবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সেটির কার্যকারিতা বন্ধ রেখেছে। তাদের অভিযোগ, উপজেলায় তিনজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকার পরও ইউপি চেয়ারম্যানদের পরিষদের সদস্য করা হয়েছে ডিসি এবং ইউএনওদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও নির্বাচিত পরিষদকে অকার্যকর করতে। এ অবস্থায় উপজেলা পরিষদকে দ্রুত কার্যকর করতে আইনি লড়াইয়ে যাওয়ার জন্য সারাদেশের উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানরা অ্যাসোসিয়েশনের  নেতাদের চাপ দিচ্ছেন। অ্যাসোসিয়েশনের একজন নেতা জানান, তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই। এখন তারা কঠিন চাপের মুখে আছেন। নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তারা শিগগির আদালতের আশ্রয় নেবেন, রিট করবেন।

উপজেলা পরিষদ অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম-সম্পাদক রাজবাড়ী সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট ইমদাদুল হক বিশ্বাস বলেন, ‘আমি ১৯৮৫ সাল থেকে চারবার উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছি। কিন্তু এখনকার মতো অবস্থা আগে কখনো দেখিনি।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের কোনো কাজ নেই। সব কমিটির সভাপতি হচ্ছেন ইউএনও। চেয়ারম্যান শুধু দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি। দুর্যোগ এলে আমার কাজ শুধু মিটিং করা।’ তিনি বলেন, ‘পরিষদের সব নথি স্বাক্ষর করেন ইউএনও। কোনো নথিই উপজেলা চেয়ারম্যানের কাছে আসে না। পরিষদের কর্মকর্তাদের কোনো জবাবদিহি নেই। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, ইউএনওরা কখনোই উপজেলা পরিষদ লিখেন না। তারা কোনো চিঠিপত্র ইস্যু করলে লিখেন উপজেলা প্রশাসন, যা সংবিধান ও আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।’ তিনি জানান, নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও উপজেলাকে একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে তারা শিগগিরই সংশ্লিষ্টদের উকিল নোটিস পাঠাবেন। তারপর রিট করবেন। উপজেলা পরিষদ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দুমকী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হারুন-অর-রশীদ হাওলাদার বলেন, দেশের সব উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান সংবিধান ও বিদ্যমান আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে জবাবদিহিমূলক স্থানীয় শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ঐক্যবদ্ধ। শেখ হাসিনা সরকার সেই আঙ্গিকেই সংসদে উপজেলা আইন পাস করেছেন। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও আইন না হওয়ায় বাধ্য হয়ে সর্বোচ্চ আদালতে রিটের প্রস্তুতি চলছে।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More