আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই সেটে প্রার্থী বাছাই আওয়ামী লীগে

স্টাফ রিপোর্টার: দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে অনানুষ্ঠানিক প্রার্থী বাছাই শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। দলকে টানা চতুর্থবারের মতো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আনতে দুই সেটে প্রার্থী চূড়ান্ত করছেন দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব টিম, দলীয়ভাবে এবং বিভিন্ন সংস্থা দিয়ে যাচাই-বাছাই চলছে সম্ভাব্য নৌকার কা-ারিদের। গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও দলের একাধিক সূত্র বাংলাদেশ প্রতিদিনকে এমন তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সূত্রগুলো বলছেন, অতীতের যে কোনো নির্বাচনের চেয়ে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে অপেক্ষাকৃত বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন সভানেত্রী শেখ হাসিনা। সে কারণে এখন থেকেই দলীয় প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া শুরু করেছেন তিনি। দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন প্রার্থীর জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক ভিত্তি এবং অতীত আমলনামা। এলাকায় সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য না হলে যত বড় নেতাই হোন না কেন এবার নৌকা মিলবে না।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সব সময় নির্বাচনমুখী দল। একটি নির্বাচন শেষ হলে আরেকটি নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ করে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া দল আওয়ামী লীগ। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রার্থী চূড়ান্ত করার কাজ শুরু করেছেন।’ তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ একটি প্রাচীনতম ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল। একাধিক বিকল্প মাথায় রেখেই প্রার্থী চূড়ান্তকরণের কাজ চলছে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনী এলাকার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী দেখে আমাদের দলের প্রার্থী ঘোষণা করা হবে। এতে রানিং এমপি-মন্ত্রীর কপালও পুড়তে পারে। অতীতেও এমন নজির রয়েছে।’
দলটির নেতারা বলছেন, বিগত দুই নির্বাচনের চেয়ে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বেশ চ্যালেঞ্জিং। কারণ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় দলের ভিতরে কোন্দল-উপ-কোন্দল সৃষ্টি হয়েছে। অনেক স্থানে এমপিরা কর্তৃত্ব ধরে রাখতে গিয়ে সংগঠনের স্থলে ‘এমপি লিগ’ বলয় ভারী করছেন। এতে স্থানীয় নেতা-কর্মীরা ক্ষুব্ধ। তারা সময়ের অপেক্ষায় রয়েছেন। এ ছাড়াও উপজেলা-পৌরসভা এবং চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এমপিদের প্রার্থী পছন্দ না হলে নৌকা ডোবাচ্ছেন। আবার পারিবারিক লীগও সৃষ্টি করছেন কেউ কেউ। এসব তথ্য আছে দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে। এসব বিষয় মাথায় রেখেই প্রার্থী মনোনয়ন দিতে যাচ্ছেন তিনি।
আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডের দুজন সদস্য নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন আগামী ২০২৩ সালের শেষাশেষি অথবা ২০২৪ সালের প্রথম দিকে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নির্বাচনে যোগ্য প্রার্থীর খোঁজ করছেন দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা। নিজস্ব টিম, দলীয়ভাবে এবং সংস্থার মাধ্যমে এখন থেকেই প্রার্থীদের ব্যাপারে খোঁজখবর নিচ্ছেন। যেখানে নতুন মুখ আসবে, তারা সব সময় মাঠে থাকেন কি না সে বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় রাখছেন তিনি। সূত্রমতে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগের প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে দুই বছর আগে থেকেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে বেশ কয়েকটি পর্যায়ে আসনভিত্তিক জরিপ কাজ পরিচালনা করা হয়। জরিপে প্রার্থীর বিজয়ের সম্ভাব্যতা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যেসব আসনে দলীয় প্রার্থীদের বিজয়ের সম্ভাবনা রয়েছে, তাদের ‘এ’ তালিকায় রাখা হয়েছে এবং ইতিমধ্যে তাদের জোরালোভাবে মাঠে কাজ করে যেতে বলা হয়েছে। আর যারা কম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন তাদের ‘বি’ তালিকায় রেখে জনসম্পৃক্তা বাড়াতে বলা হয়েছে। আর যেসব আসনে নতুন মুখ আনা হচ্ছে, তাদের এখন থেকেই মাঠ গোছাতে বলা হচ্ছে। আগামী নির্বাচনের বাকি থাকলেও বিএনপি বর্তমান সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে। তবে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলছেন, নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য বিএনপি নির্বাচন করবে। যদি বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেয়, তাহলে বর্তমান একাদশ সংসদের আওয়ামী লীগ দলীয় শতাধিক এমপির কপাল পুড়তে পারে। ভোটের হিসাব-নিকাশে ভাগ্য বিপর্যয় হতে পারে অনেক হেভিওয়েট নেতা-এমপি-মন্ত্রীরও। এক্ষেত্রে মনোনয়নে এগিয়ে থাকবেন জনপ্রিয় ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তিসম্পন্ন প্রার্থীরা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন জরিপের ভিত্তিতে পৃথক দুই সেট খসড়া তালিকা তৈরি করছেন বলে জানা গেছে।
একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, এবার আওয়ামী লীগের অনেক এমপি-মন্ত্রী নির্বাচন থেকে ছিটকে পড়বেন। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্কশূন্য, জনবিচ্ছিন্ন ও চাটুকার পরিবেষ্টিত থাকার অভিযোগ রয়েছে এমন নেতাদের তালিকা তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে দলকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছেন, নানাভাবে সমালোচিত হয়ে নিজেকে এবং দলকে হেয় করেছেন, এসব নেতাও থাকবেন বাতিলের তালিকায়। দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার হুঁশিয়ার করার পর যাদের অবস্থার পরিবর্তন হয়নি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক জরিপে যাদের সম্পর্কে নেতিবাচক তথ্য উঠে এসেছে, তাদের ব্যাপারে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। এ মুহূর্তে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায় মনে করছে, তাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে। এ নির্বাচন হবে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। কাজেই জনবিচ্ছিন্ন ও বিতর্কিতদের দিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া সম্ভব হবে না। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির প্রার্থীরা ভোটারদের সহানুভূতি আদায়ে সার্বিকভাবে চেষ্টা করবেন। এ অবস্থায় ক্ষমতাসীন দলের ভরসা অপেক্ষাকৃত তরুণ, ত্যাগী ও জনপ্রিয় নেতারা। এক্ষেত্রে পেছনের কাতারে থাকা সৎ, ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতারা গুরুত্ব পাবেন। সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ প্রার্থী মনোনয়নে ৩০০ আসনের কথা মাথায় রেখে অগ্রসর হলেও জোটের শরিকদের বিষয়টিও চিন্তায় রয়েছে। শরিকদের বর্তমান আসনগুলোতে আওয়ামী লীগের নিজস্ব প্রার্থী রাখা হবে। তবে এসব প্রার্থীকে প্রয়োজনে ছাড় দেয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More