ঈদের আগাম টিকিট বিক্রির আগেই উপচেপড়া ভিড়

আজ ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু : বাসের ২৮-২৯ এপ্রিলের টিকিট নেই

স্টাফ রিপোর্টার: যে কোনো মূল্যে ট্রেনে গ্রামের বাড়ি ফিরতে চান খুলনার লিয়াকত আলী। তাই চারটি টিকিট কাটতে তিনি জুমার নামাজ শেষে কমলাপুর টিকিট কাউন্টারের লাইনে দাঁড়ান। অবশ্য সকাল থেকেই ওই লাইনের সামনে দাঁড়িয়েছেন শতাধিক ব্যক্তি। সবার উদ্দেশ্য একটাই, ঈদযাত্রার অগ্রিম টিকিট কাটা। আজ সকাল ৮টা থেকে ঈদযাত্রার অগ্রিম টিকিট দেয়া হবে। প্রচ- ভিড়ে টিকিট নাও পেতে পারেন-এমন চিন্তায় অনেকে শুক্রবারই স্টেশনে এসেছেন। ২১ থেকে ২২ ঘণ্টা আগেই লাইনে তারা দাঁড়িয়ে পড়েছেন। এরপরও তাদের ভাগ্যে টিকিট মিলবে কিনা তা নিশ্চিত নয়। আজও হাজার হাজার মানুষ ওই লাইনে দাঁড়াবেন। শুক্রবার সরেজমিন কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, স্টেশনজুড়ে সাধারণ টিকিটের যাত্রীদের ভিড় ছিল। এদিন ঘণ্টাখানেক সার্ভারে সমস্যাও দেখা দেয়।

জানা গেছে, ট্রেনের সব টিকিট সাধারণ যাত্রীর ভাগ্যে জুটবে না। বিচারপতি, এমপি, মন্ত্রী, সচিব, সাংবাদিক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊধ্বর্তন কর্মকর্তাসহ ঠিকাদার-ব্যবসায়ীদের জন্যও অঘোষিত টিকিটের কোটা থাকবে। ৩৬টি আন্তঃনগর ট্রেনের আসন সংখ্যা ২৬ হাজার ৬৭২টি। ১৩ হাজার ৩৩৬টি টিকিট ২৩টি কাউন্টার থেকে বিক্রি করা হবে। বাকি অর্ধেক অনলাইনে বিক্রি করা হবে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক টিকিট বিভিন্ন নামে ‘অদৃশ্য ব্লক’ করে রাখা হয়েছে।

এদিকে, শুক্রবার কাউন্টার খোলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ২৬ এপ্রিলের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শেষে হয়ে যায়। সার্ভারে ত্রুটির কারণে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে প্রায় ঘণ্টাখানেক টিকিট বিক্রি বন্ধ থাকে। অভিযোগ, এ দিন অধিকাংশ টিকিট ব্লক রাখতে ‘সার্ভার ত্রুটি’ সাজানো হয়। সহজ ডটকম নামে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠান টিকিট বিক্রি করছে। এর আগে সিএনএস নামের একটি প্রতিষ্ঠান টিকিট বিক্রি করত।

রাজশাহীগামী সিল্কসিটি এক্সপ্রেসে ট্রেনের টিকিট কাটতে শুক্রবার ভোররাতে লাইনে দাঁড়ান দুই বন্ধু ইমন ও জাকির। সিঙ্গেল কেবিন চাইলেও টিকিট পেয়েছেন এসি ও শোভন চেয়ার। জাকিরের প্রশ্ন, কেবিন কাদের জন্য। অনেকে আবার এসি চেয়ারের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও পেয়েছেন শোভন চেয়ার। কেউ আবার টিকিটই পাননি। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে অধিকাংশ ট্রেনের টিকিট বিক্রি হয়ে যায়। টিকিট না পেয়ে অনেককে চিৎকার-চ্যাঁচামেচি করতেও দেখা যায়। ২৭ এপ্রিলের অগ্রিম টিকিট কাটতে কেউ কেউ আবার লাইনেও দাঁড়িয়ে যান। যাত্রী সিরাজুল ইসলাম জানান, আশা করেছিলেন খুলনা এক্সপ্রেসের টিকিট পাবেন। সকাল ১০টায় লাইনে দাঁড়িয়েও টিকিট পাননি তিনি। এজন্য তিনি ২৭ এপ্রিলের অগ্রিম টিকিট কাটতে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। সেই দিনের টিকিট পাবেন কিনা তাও অনিশ্চিত। শুক্রবার টিকিট না পাওয়া অধিকাংশের বক্তব্য-মূল যুদ্ধ হবে শনিবার থেকে।

২৭ এপ্রিলের টিকিট কাটতে আসা অনেকে জানিয়েছেন, তারা জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মসনদ অথবা পাসপোর্টের ফটোকপি নিয়ে এসেছেন। টিকিট কাটা নিয়ন্ত্রণ করা নিয়ে প্রথমবারের মতো এ পদ্ধতি কার্যকর হবে কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চিত নয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। স্টেশন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং বুকিং সহকারী মাস্টারদের বক্তব্য-পরিচয়পত্র নিয়ে তারা কি করবেন-সে ব্যাপারে তাদের কিছুই জানানো হয়নি। কারণ, টিকিটের গায়ে পরিচয়পত্রের কোনো তথ্য লেখার স্থান শুক্রবার পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়নি। এক বুকিং সহকারী জানান, নতুন সার্ভারটি ত্রুটিতে ভরা। ক্ষণে ক্ষণেই সার্ভারে সমস্যা দেখা দেয়। এতে যাত্রীরা ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের গালমন্দ করেন। সবই তাদের সহ্য করতে হয়।

জানা গেছে, গত দুই বছরে অনেকে গ্রামের বাড়িতে ঈদ করতে যেতে পারেননি। এজন্য এবার ট্রেনে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়বে। আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে ৩ থেকে ৪ গুণ যাত্রী বেশি হবে। যাত্রীদের চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হবে সংশ্লিষ্টদের। ঈদযাত্রায় ২৭ ও ২৮ এপ্রিল প্রতিদিন কাউন্টার থেকে ১৩ হাজার ৩৩৬টি এবং ২৯, ৩০ এপ্রিল ও ১ মে দুটি স্পেশাল ট্রেনের সোয়া ১৪ হাজার অগ্রিম টিকিট বিক্রি হবে। রেলওয়েসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ঈদযাত্রার জন্য একটি অথবা দুটি টিকিট কাটতে লাইনে খুব কম লোক দাঁড়ান। অধিকাংশ লোকই চারটি থেকে অধিক টিকিট কাটেন। এ হিসাবে সোয়া ১৪ হাজার টিকিট কাটতে পারবেন ৩ হাজার ৫৬২ জন। এ আসন সংখ্যার বিপরীতে বহু টিকিট আবার ভিআইপি নামে ‘ব্লক’ করে রাখা হয়।

কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে ভিড় কমাতে এবার এটিসহ পাঁচটি স্থান থেকে টিকিট বিক্রি হচ্ছে। কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে পশ্চিমাঞ্চল ও খুলনাগামী স্পেশাল ট্রেনের টিকিট বিক্রি করা হবে। ঢাকা বিমানবন্দর স্টেশনে চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীগামী সব আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট বিক্রি হবে। তেজগাঁও স্টেশন থেকে ময়মনসিংহ, জামালপুর ও দেওয়ানগঞ্জ স্পেশালসহ সব আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট বিক্রি করা হবে। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন থেকে মোহনগঞ্জ ও হাওড় এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকিট বিক্রি করা হবে।

কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ম্যানেজার মাসুদ সরওয়ার জানান, শনিবার ঈদযাত্রায় অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হবে। ৫ দিনব্যাপী টিকিট বিক্রির প্রতিদিন সকাল ৮টায় কাউন্টার খোলা হবে, চলবে বিকাল ৫টা পর্যন্ত। তিনি বলেন, সহজ ডটকম নতুন এসেছে। তারাও টিকিট বিক্রি করছে। ঈদযাত্রায় সার্ভার ত্রুটি হলে তাদের রক্ষা হবে না। ঊধ্বর্তন কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে চিঠি দিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেন, কমলাপুর স্টেশনে টিকিট কাটতে আসেন লক্ষাধিক যাত্রী। কিন্তু আমরা মাত্র ২৬ থেকে ২৮ হাজার টিকিট বিক্রি করতে পারি। এর অর্ধেক মাত্র কাউন্টার থেকে, বাকি অর্ধেক অনলাইনে বিক্রি হয়। একজন যাত্রী চারটি টিকিট কিনলে মুহূর্তেই টিকিট শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। আমরা নির্ধারিত টিকিট বিক্রি করছি। কিন্তু, যাত্রীদের চাহিদা বহুগুণ বেশি। পাঁচটি স্থান থেকে টিকিট বিক্রি করা হবে। এমনটা জানার পরও হাজার হাজার লোক কমলাপুর স্টেশনে ভিড় জমান। আমরা নিরুপায়, চাহিদা অনুযায়ী টিকিট দিতে পারি না।

বাস-লঞ্চের ২৮-২৯ এপ্রিলের টিকিট নেই : বাস ও লঞ্চের ২৮-২৯ এপ্রিলের টিকিট পাচ্ছেন না যাত্রীরা। দু-চারটি বাসের টিকিট পাওয়া গেলেও তা একেবারে পেছনের সারির। ওই টিকিট নিতে আগ্রহ কম যাত্রীদের। অপরদিকে লঞ্চের টিকিট বিক্রি শুরুর আগেই শেষ হয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেন যাত্রীরা। ১৫ এপ্রিল থেকে বাসের আগাম টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে। বিক্রির শুরু থেকে ২৮-২৯ এপ্রিলের টিকিটের চাহিদা বেশি ছিল। সাকুরা পরিবহণের টেকনিক্যাল কাউন্টারের মাস্টার আব্দুল হক বলেন, চাকরিজীবীদের মূলত চাওয়া ২৮ বা ২৯ এপ্রিলের টিকিট। যারা এ দুদিনের টিকিট পাচ্ছেন না তারা ৩০ এপ্রিলের টিকিট নিচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, বাসের আগাম টিকিট বিক্রির শুরুর দিকে অনেক যাত্রী এলেও এখন সেই চাপ অনেক কম।

শুক্রবার দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট রুটের টিকিট নিতে আসা সিয়াম হোসেন অভিযোগ করে বলেন, শুরুর দিকে ঘণ্টাখানেক লাইনে দাঁড়িয়েও ২৯ এপ্রিলের টিকিট পাইনি। তাই আবার এলাম টিকিট করতে। যাত্রীদের চাহিদা থাকলে বাস বাড়াতে পারে-এমন আশায় তিনি এসেছেন। কিন্তু তেমন সম্ভাবনা নেই। তবে ১ ও ২ মের টিকিট পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু সেটা দিয়ে আমার কোনো লাভ নেই।

হানিফ এন্টারপ্রাইজের জিএম মোশাররফ হোসেন বলেন, চাহিদা বেশি থাকায় ২৯ ও ৩০ এপ্রিলের টিকিট শেষ। এটা নোটিশ বোর্ডে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও রংপুর রুটের এসব দিনের টিকিট দিতে আমরা পারছি না। অন্য রুটে কিছুটা টিকিট মিলছে। তবে যাত্রী সংখ্যা বেশি হলে আমরা বাড়তি বাস নামাতে পারি। সেজন্য আরও ২ দিন অপেক্ষা করতে হবে।

এসআর ট্র্যাভেলসের ম্যানেজার আমিন নবী বলেন, কাউন্টারের পাশাপাশি সহজ ডটকমের মাধ্যমেও অনলাইনে টিকিট বিক্রি চলছে। আমাদের অধিকাংশ দিনের টিকিট শেষ।

চট্টগ্রাম নতুন রেল স্টেশনের কাউন্টার থেকে আজ শনিবার সকালে ঈদযাত্রার অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হবে। কালোবাজারে টিকিট বিক্রি রোধে স্টেশন এলাকায় থাকবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক টিম।

চট্টগ্রাম রেলওয়ে সূত্র জানায়, এবার চট্টগ্রাম থেকে ১০টি আন্তঃনগর ট্রেনের সঙ্গে চাঁদপুরগামী দুটি স্পেশাল ট্রেনের অগ্রিম টিকিট দেয়া হবে। ১ নম্বর কাউন্টারে মহিলা ও রেলওয়ের পাশ টিকিটের জন্য ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়া ২ নম্বর কাউন্টারে সুবর্ণ এক্সপ্রেস ও সোনার বাংলা এক্সপ্রেস (স্নিগ্ধা ও শোভন চেয়ার), ৩ নম্বর কাউন্টারে পাহাড়িকা ও উদয়ন, ৪ নম্বর কাউন্টারে মহানগর গোধূলি ও মহানগর এক্সপ্রেস, ৫ নম্বরে তূর্ণা এক্সপ্রেস, ৬ নম্বর কাউন্টারে চট্টলা ও বিজয় এক্সপ্রেস (স্নিগ্ধা, শোভন চেয়ার ও শোভন), ৭ নম্বর কাউন্টারে মেঘনা এক্সপ্রেস, চাঁদপুর স্পেশাল ট্রেনের। বাকি কাউন্টারে অন্য ট্রেনের টিকিট পাওয়া যাবে।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More