কুমিল্লার ঘটনায় মূল হোতাকে ধরতে গোয়েন্দা জাল

সারাদেশে সতর্ক অবস্থানে আছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

স্টাফ রিপোর্টার: কুমিল্লার ঘটনার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঘটনার মূল হোতাকে ধরতে তৎপর রয়েছে গোয়েন্দারা। ম-পে হামলার জন্য যে ক’জনকে পুলিশি হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে তাদের কাছে পাওয়া গেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। তাদের তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত অব্যাহত আছে। এছাড়াও নানুয়ারদিঘিতে যে কা-টি ঘটেছে এর পেছনে কারও উস্কানি আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীরা বলছেন, দেশের বিরাজমান পরিস্থিতি শান্ত ছিলো। কিন্তু, এ শান্ত পরিবেশকে অশান্ত করার জন্য একটি গোষ্ঠী অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ওই মণ্ডপে ধর্মীয় অবমাননার বিষয়টি তুলে আনার চেষ্টা করে। ওই চক্রটি দেশে হাজার বছর ধরে চলে আসা ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট করার চক্রান্তের অংশ হিসেবেই এ কাজ করেছে। ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায় ২০টি আইডি থেকে অপপ্রচার শুরু হয়। দুর্বৃত্তরা দ্রুত ভিডিও আপলোড করে ছড়াতে থাকে।
তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী খুব দ্রুততার সঙ্গে বিষয়টি মোকাবেলা করেছে। পুলিশ ওইসব আইডি ও আপলোড হওয়া ভিডিওগুলোর তালিকা করেছে। তদন্তে নানুয়ারদিঘির পাড়ের আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ নিয়ে করা হচ্ছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। ফুটেজে প্রায় ২০০ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এরা অধিকাংশই কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের বাসিন্দা। এ ছাড়াও ২টি রাজনৈতিক দলের দুই নেতাকে রাখা হয়েছে নজরদারিতে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের আটক করা হতে পারে। ওই দুই নেতার বাড়ি কুমিল্লা হলেও তারা ঢাকায় অবস্থান করছেন। পাশাপাশি তদন্তকারীরা সেখানে ৫টি বিষয়কে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছেন এবং প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন। তা হলো: মন্দিরের ঘটনাটি কে আগে দেখেছেন, ৯৯৯ ফোনকারী ব্যক্তির আশপাশে আর কারা ছিল, কারা দ্রুত সেখানে লোক জড়ো করেছে, কতোজন সেখানে ফেসবুকে লাইভ করেছে এবং ম-প ভাঙচুরে কে নেতৃত্ব দিয়েছে। সার্বিক বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান খান কামাল জানান, ‘কুমিল্লার ঘটনাটি তদন্ত অব্যাহত আছে। আমরা ঘটনার মূল কারণ জানার চেষ্টা করছি। আশা করছি, দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে উদ্ঘাটিত ঘটনার কারণ জানতে পারবো। তিনি আরও জানান, ম-পের ঘটনায় যারা সহিংসতা চালাচ্ছে তাদের প্রত্যেককেই আইনের আওতায় আনা হবে। কোনো ছাড় দেয়া হবে না। এ বিষয়ে র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কে এম আজাদ জানান, ‘র‌্যাব মাঠে কাজ করছে। যারা ফেসবুক লাইভসহ ভাঙচুর করেছে তাদের অনেকেই চিহ্নিত ও গ্রেফতার হয়েছে।’ পুলিশ ও র‌্যাব সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লার ঘটনাটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণ হিসেবে ফেসবুকে দুইজন ব্যক্তির লাইভকে প্রথম সূত্রপাত হিসেবে দেখছেন তদন্তকারীরা। ইতিমধ্যে তাদের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যজনকে খুঁজছে পুলিশ। এ ঘটনায় কতোজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তা পুলিশ সদর দপ্তর সুনির্দিষ্টভাবে জানাতে পারেনি। তবে একজন কমকর্তা জানান, এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় ১৬১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অধিকাংশদের ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। সূত্র জানায়, তদন্তকারীরা বিষয়টি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন। পূজার আগের দুইদিন সারা দেশের পরিস্থিতি শান্ত ছিল। সুন্দরভাবে সনাতন ধর্মের লোকজন তাদের পূর্জা অর্চনার অনুষ্ঠান পালন করেছে। কিন্তু, পরের দিন ভোররাতে দুর্বৃত্তরা প্লট সাজিয়েছে।
সূত্র জানায়, যে দুর্বৃত্ত নানুয়ারদিঘির ম-পে ঘটনাটি ঘটিয়েছে তখন ভোরের আলো কেবল ফুটে ওঠার অপেক্ষায় ছিল। রাতের বেলায় গান বাজনা করে অনেকেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। এ সময় ম-পে কে ছিল তা জানার চেষ্টা করছে তদন্তকারীরা। সেখানে ৯৯৯-তে যে ব্যক্তি ফোন দিয়েছেন তাকেও নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
সূত্র জানায়, ওই ঘটনায় জব্দকৃত সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে যে, যখন সেখানে লোকজন সেøাগান দিচ্ছিলো এবং মণ্ডপে ভাঙচুর চালাচ্ছিল তখন প্রায় অনেকেই সেখানে ভিডিও করছিলেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, ভিডিওটি দেশে এবং বিদেশে দ্রুত ছড়ানোর জন্য এবং ঘটনার প্লট তৈরির জন্য তারা এটি করেছে।
সূত্র জানায়, কুমিল্লার ঘটনাটি দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য ২টি পেইজকে চিহ্নিত করেছে গোয়েন্দারা। একটিতে ৮ লাখ আরেকটি ৩ লাখ শেয়ার হয়েছে। তার মধ্যে একটি পেইজ বিদেশ থেকে চালানো হয় বলে নিশ্চিতও হয়েছে তারা। অপর পেইজটি দেশে কে চালাচ্ছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে দুইটি পেইজ বিটিআরসি লিংক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে। ফেসবুকে দ্রুত লাইভ হওয়ার কারণে সেখানে লোকজন দ্রুত জড়ো হয়েছে বলে ধারণা করছে।
সূত্র জানায়, উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সর্বোচ্চ তাগিদ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়াও এ ঘটনার জন্য কার কী ভূমিকা ছিল তা দ্রুত খতিয়ে দেখার আদেশ দেয়া হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় সাধন ছাড়াও গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধির জন্য বলা হয়েছে।
সূত্র জানায়, কুমিল্লার ম-পে ঘটনার পর থেকেই সারা দেশে সতর্ক অবস্থানে আছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দেশের প্রত্যেক স্থানে টহল দেয়া হচ্ছে।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More