জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়বে জীবনের নানা ক্ষেত্রে

স্টাফ রিপোর্টার: ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে বাজার দর আগে থেকেই চড়ে ছিলো, এবার নিম্নবিত্তের মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে দিয়ে জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে বাড়ানো হল অনেকটা। ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ৪২.৫% বেড়ে হয়েছে প্রতি লিটার ১১৪ টাকা। পেট্রোলের দাম ৫১.১৬% বেড়ে প্রতি লিটারের দাম হয়েছে ১৩০ টাকা। আর অকটেনের দাম বেড়েছে ৫১.৬৮%, প্রতি লিটার কিনতে গুনতে হবে ১৩৫ টাকা। শুক্রবার মধ্যরাতের পর থেকেই নতুন এ দাম কার্যকর হয়েছে বলে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে। ডিজেলসহ অন্যান্য জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ভাবনার কথা গত সপ্তাহ থেকেই মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মুখে শোনা যাচ্ছিল। বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ-জ্বালানি বিষয়ে এফবিসিসিআইয়ের আলোচনায় ‘প্রয়োজনে দাম বাড়িয়ে হলেও’ নিরাবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি উঠেছিল কয়েকজন ব্যবসায়ীর কণ্ঠে।

শুক্রবার সকালে নিজ বাড়িতে সাংবাদিকদের ডেকে বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ‘যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসার সময় এসেছে’ বলে মন্তব্য করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। এরপর রাত ১০টার দিকে ‘নজীরবিহীন হারে’ এই দামবৃদ্ধির খবর আসে।

প্রভাব কতটা: গণমাধ্যমে তেলের দাম বাড়ার খবর আসার সাথে সাথে ভিড় লেগে যায় রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোতে। হাজারো মোটর সাইকেল চালক শেষবারের মত আগের দামে তেল কেনার চেষ্টায় ছুটে আসেন পাম্পে। এ পরিস্থিতিতে বিক্রি বন্ধ করে দেয় ঢাকার কিছু ফিলিং স্টেশন। আর যেসব পাম্প তেল বিক্রি চালিয়ে গেছে, সেখানে দীর্ঘ লাইন সড়কে গিয়ে ঠেকেছে।

ব্যক্তিগত গাড়ি সিএনজিতে চলার সুযোগ থাকলেও মোটর সাইকেল চালাতে হয় অকটেন বা পেট্রোলে। আর ডিজেলের দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়বে বাস, ট্রাক, কভার্ডভ্যানের ভাড়ায়। লঞ্চসহ নৌযানের ভাড়াও বাড়বে। আর এর পরোক্ষ প্রভাব পড়বে বহু খাতে। ট্রাক কিংবা নৌযানের ভাড়া বেড়ে গেলে শাক-সবজি থেকে শুরু করে যে সব পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে বাজারে আসে, তার সবেরই দাম বাড়বে। ফলে দেশের সব পরিবারেরই মাসিক খরচের হিসাব নতুন করে সাজাতে হবে।

ডিজেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বা জেনারেটর চালানোর খরচ বেড়ে যাবে, দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক শিল্পেও ডিজেলের দাম বৃদ্ধির আঁচ পড়বে। মাছ ধরা ট্রলারগুলোরও জ্বালানি ডিজেল, তাই সেখানেও খরচা বাড়বে। কৃষিক্ষেত্রে সেচ পাম্প ও পাওয়ার টিলারে ডিজেলে ব্যবহার হয় বলে কৃষকেরও ব্যয় বাড়বে। অবশ্য কৃষকের জন্য ডিজেলে ভর্তুকি চালিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

নজিরবিহীন দাম বৃদ্ধি: প্রায় শতভাগ জ্বালানি তেল আমদানি করা বাংলাদেশের পরিবহন খাতের ৯০ শতাংশ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৩৪ শতাংশ তেল নির্ভর। দেশে ব্যবহৃত তেলের ৭০ শতাংশের বেশি ডিজেল। যে চার ধরনের তেলের দাম বাড়ল, তার মধ্যে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়ানো হয়েছিল ২০২১ সালের ৩ নভেম্বর। তখন প্রতি লিটারে দাম ৬৫ টাকা থেকে ২৩ শতাংশ বাড়িয়ে করা হয়েছিলো ৮০ টাকা। নয় মাসের মাথায় তা এক লাফে ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ১১৪ টাকায় নেয়া হল। অকটেন আর পেট্রোলের দাম সর্বশেষ বাড়ানো হয়েছিলো ২০১৬ সালের ২৪ এপ্রিল। সেই হিসাবে ছয় বছর ২ মাস পর বাড়ল এ দুই তেলের দাম। ৮৬ টাকার পেট্রোল এখন দিতে হবে ৪৪ টাকা বেশি। আর ৮৯ টাকার অকটেন ৪৬ টাকা বেড়ে হল ১৩৫ টাকা। একবারে ৫০ শতাংশ দাম বৃদ্ধির ঘটনা আর কখনও ঘটেনি। তেলের দাম বৃদ্ধির কথা জানাতে গিয়ে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অবশ্য সকালে ‘সহনীয় পর্যায়ে’ রাখার কথা বলেছিলেন। তার বক্তব্য ছিলো, ‘যেহেতু বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ঊর্ধমুখী, সেই জায়গায় আমাদের খুব চিন্তাভাবনা করতে হবে। এটার সরাসরি প্রভাব পড়ে জনগণের ওপর। ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন এগুলো যেন একটা সহনীয় পর্যায়ে থাক। দেশ ও দশের কথা চিন্তা করে আমরা একটা অ্যাডজাস্টমেন্টে যাব।”

ডিজেলসহ অন্যান্য জ্বালানি তেলের দাম বাড়ালে জনজীবনে যে প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে সরকারও ‘চিন্তাভাবনা’ করছে জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, “সবচেয়ে বেশি তেল ব্যবহার হয় পরিবহন খাতে। খুব বেশি পরিবর্তন হবে না বলে আমরা হিসাব করে দেখেছি। এজন্য আমরা বিআরটিএ, বিআইডব্লিউটিএ, পরিবহন মালিক সমিতি, ট্রাক মালিক সমিতি সবার সাথে বসে আলোচনা করে ঠিক করার চিন্তা করছি। “আমরা দেখতে পাচ্ছি ডিজেলের দাম বাড়লে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া বাড়ে ১ টাকা থেকে ২ টাকা। বিষয়টা যদি ওই রকমভাবে সমাধান করা যায়, অবশ্যই অ্যাডজাস্টমেন্ট করা উচিত।”

বিদ্যুৎ আর গ্যাসের দামও বাড়ছে: নিম্ন ও মধ্যবিত্তের সংসার খরচের ওপর চাপ যে শুধু তেলে থেমে থাকবে না, সেই ইংগিতও তখনই দিয়ে রেখেছেন প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। তিনি বলেছেন, “বিদ্যুতের প্রাইসের অ্যাডজাস্টমেন্টের ব্যাপারে আমরা অপেক্ষায় আছি। গ্যাসের ব্যাপারে আমরা আরেকটা অ্যাডজাস্টমেন্টে যেতে চাচ্ছি।” গত ৫ জুন থেকে গ্যাসের দাম এক দফায় ২২ দশমিক ৭৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। সে দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আমরা যে দামটা বাড়িয়েছি সেটা গত বছরের ডিসেম্বরের পরিস্থিতি বিবেচনায়। সে কারণে আমি মনে করি গ্যাসে আমাদের আরেকটা অ্যাডজাস্টমেন্ট হওয়া উচিত।”

বিদ্যুতের পাইকারি দাম বাড়ানো হয়েছিলো সর্বশেষ ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে। তখন খুচরায়ও দাম বেড়েছিল। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কারিগরি কমিটি পাইকারিতে বিদ্যুতের দাম ৫৮ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে গত মে মাসে, যার ওপর এ মাসেই সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা।

ইউক্রেইন যুদ্ধের জেরে অস্থির বিশ্ব বাজারে এলএনজির দাম প্রতি ইউনিট ৭-৮ ডলার থেকে বেড়ে এখন ৩৫ ডলারের ওপরে চলছে। অপরিশোধিত তেলের দামও প্রতি ব্যারেল ৭০ ডলার থেকে বেড়ে ১০০ ডলারের আশপাশে উঠানামা করছে।

সাত অর্থবছর মুনাফায় থাকা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ইউক্রেইন যুদ্ধে বড় ধাক্কা খেয়েছে; দীর্ঘদিন পর আবার লোকসানে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি। এখন প্রতিদিন ১০০ কোটি টাকার ওপর সংস্থাটি লোকসান দিচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More