টিকার কার্যকারিতা নিশ্চিতে অ্যান্টিবডি পরীক্ষা জরুরি

টিকা নিয়েছেন ২০ লাখ ৮২ হাজার ৮৭৭ জন : নিবন্ধন ৩২ লাখ ৯৪ হাজার ৩৫
স্টাফ রিপোর্টার: করোনাভাইরাসের টিকা প্রয়োগের পর মানবদেহে কার্যকরী হচ্ছে কি না তা দেখার জন্য অ্যান্টিবডি পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকা দরকার। গত ১৮ জানুয়ারি কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির ২৫তম সভায় এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলা হয়। তবে শনিবার পর্যন্ত সারাদেশে ২০ লাখের বেশি মানুষ করোনার টিকা নিলেও প্রয়োগ পরবর্তী কার্যকরিতা দেখতে অ্যান্টিবডি টেস্ট শুরু হয়নি। ফলে বিশেষজ্ঞরা দ্রুততম সময়ে পরীক্ষাটি চালু করা জরুরি বলছেন।
গত ২৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের একজন নার্সকে টিকা দেয়ার মাধ্যমে এই কর্মসূচি শুরু হয়। ওইদিন আরও ২১ জন টিকা নেন। পরদিন রাজধানীর ৫টি হাসপাতালে আরও ৫৪১ জনকে দেয়া হয়। এরপর ৭ ফেব্রুয়ারি দেশে গণ-টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়। এ ধারাবাহিকতায় শনিবার পর্যন্ত দেশে ২০ লাখ ৮২ হাজার ৮৭৭ জন টিকা নিয়েছেন। এছাড়া গতকাল রোববার সন্ধ্যা পৌনে ৬টা পর্যন্ত ৩২ লাখ ৯৪ হাজার ৩৫ জন টিকা পেতে নিবন্ধন করেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে করোনা মোকাবিলায় কোভিশিল্ড নামের যে টিকা দেয়া হচ্ছে, সেটি অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি। টিকাটি বাণিজ্যিকভাবে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট উৎপাদন করার অনুমতি পেয়েছে। তবে পরীক্ষামূলক প্রয়োগে প্রমাণিত হয়েছে এটি ৬২ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকর। এক্ষেত্রে ৪ থেকে ১২ সপ্তাহের ব্যবধানে টিকার দ্বিতীয় ডোজ নিতে হবে। এদিকে দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরু থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) আউটডোরে নাক, কান গলা বিভাগের একজন আবাসিক সার্জন চিকিৎসক রোগীদের সেবা দিয়ে আসছিলেন। সম্মুখসারির যোদ্ধা হওয়ায় গত ৯ ফেব্রুয়ারি তিনি করোনা টিকা নিয়ে ব্যক্তিগত ভেরিফায়েড পেজে টিকা সংগ্রহ কার্ডসহ ছবি শেয়ার করেন। ছবিতে ‘ভ্যাকসিন নিলাম’ ক্যাপশন লেখেন। তবে টিকা নিয়েও করোনা উপসর্গ দেখা দিলে এক সপ্তাহ পর (১৬ ফেব্রুয়ারি) করোনাভাইরাস পরীক্ষা করিয়ে পজিটিভ শনাক্ত হন। পরে পেশাজীবী চিকিৎসকদের অনলাইনভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘প্ল্যাটফর্ম’ গ্রুপে নিজের করোনা পজিটিভ হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করে একটা স্ট্যাটাস দেন। প্ল্যাটফর্ম নামক প্রাইভেট গ্রুপটিতে এক লাখ ১৩ হাজার চিকিৎসক মেম্বর (সদস্য) রয়েছেন।
এমন স্ট্যাটাস দেয়ার পর ডা. আফসানা আফরিন জেরিন নামে একজন মন্তব্য করেন- ‘আমার এক কাজিন জানুয়ারির ৮ তারিখে ভ্যাকসিন নিয়েছে। ১১ তারিখ থেকে জ্বর… ১৪ তারিখ টেস্ট করেছে, কোভিড-১৯ পজিটিভ… রিকোভার (সুস্থ) করতে অলমোস্ট ১ মাস লাগছে। তার মাইল্ড ফিভার, (হালকা জ্বর) ব্রেথলেস (শ্বাসকষ্ট) ছিল অনেক, সঙ্গে শুকনো কাশিও (কফ)… এখনো উনি অনেক উইক (দুর্বল)।’
এ ব্যাপারে ডা. মো. শাহিন আকতার রনি নামে একজন চিকিৎসক বলেন, টিকা নেয়ার পনেরো দিন পর্যন্ত যে কেউ বাইরে থেকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন। এই সময় টিকার কারণে যথেষ্ট অ্যান্টিবডি তৈরি হয় না। ফলে কারও শরীরে উপসর্গ দেখা দিলে পিসিআর টেস্টসহ বিশেষজ্ঞদের মতামত নেয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন।
এদিকে গত ১৮ জানুয়ারি সরকারের কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির ২৫তম সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরে কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লাহসহ অন্য সদস্যরা করোনা টিকা প্রয়োগের পর কার্যকরী হচ্ছে কি না তা দেখার জন্য অ্যান্টিবডি পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকার মত দেন। এছাড়া যথাযথ স্যাম্পলিংয়ের মাধ্যমে দ্বিতীয় ডোজ পাওয়ার পর অ্যান্টিবডি দেখা দরকার। ফার্মাকোভিজিল্যান্স-এর জন্য প্রস্তাব অনুযায়ী অর্থ বরাদ্দ ও অন্যান্য ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দেন।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, টিকা প্রয়োগের পর মানবদেহে কতটুকু মাত্রায় অ্যান্টিবডি তৈরি (কার্যকারিতা) হচ্ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে তা জানার আগ্রহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। প্রথম ডোজ টিকা দেয়ার পর দ্বিতীয় ডোজ শুরুর আগে অ্যান্টিবডি তৈরির মাত্রা পরীক্ষা করতে পারলে কর্তৃপক্ষের জন্য পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া সহজ হয়। স্বাস্থ্য অধিদফতরের উদ্যোগে এরকম একটা কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচিত তিন মাস, ছয় মাস ও এক বছর পর ব্যাপকভাবে পরীক্ষা করে তথ্য সংগ্রহে রাখা। এতে কোনো প্রতিষ্ঠানের টিকার কার্যক্ষমতা কম হলে বিকল্প টিকার দিকে যাওয়া যাবে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, কারও শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার পরও নতুন ধরনের স্ট্রেইনে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এজন্য করোনার হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের জন্য মোট জনসংখ্যার অন্তত ৮০ শতাংশের শরীরে অ্যান্টিবডি থাকা দরকার। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এখন পর্যন্ত করোনার ২৪০টি ধরন শনাক্ত হয়েছে। করোনার নতুন ধরনের কারণে অ্যান্টিবডি অর্জন কঠিন হতে পারে। যাদের শরীরে ইতোমধ্যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে, তারাও নতুন ধরন থেকে আবার সংক্রমিত হতে পারেন।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More