দেশের বিদ্যুৎ খাতে চুরি-অপচয় রোধে উদ্যোগ নেই

সিস্টেম লসের কারণে অপচয় হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা

স্টাফ রিপোর্টার: বিদ্যুৎ-জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকার সিডিউল মেনে এক ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কথা বললেও ঢাকার বাইরে প্রায় প্রতিটি জেলাতেই চার-পাঁচ ঘণ্টা ধরে বিদ্যুতের লুকোচুরি খেলা চলছে। রাত ৮টার পর দোকানপাট, শপিংমল, বিপণি বিতান বন্ধ করা না হলে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে। অথচ অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চুরি হলেও তা রোধে এখনও নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সারাদেশে দৈনিক এক ঘণ্টা লোডশেডিং করে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা হচ্ছে, সব চোরাই বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও অপচয় রোধ করা গেলে তার চেয়ে বেশি সাশ্রয় হবে। চাহিদা অনুযায়ী সাব-স্টেশন নির্মাণ, ট্রান্সফরমার স্থাপনসহ বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ, অবৈধ সংযোগ ও চুরি নিয়ন্ত্রণ, অনলাইনে মিটার রিডিং গ্রহণ, প্রি-পেইড মিটার স্থাপনসহ সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফলে সিস্টেম লস কিছুটা কমলেও তা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেনি। ফলে সিস্টেম লস কমানোর দিকে নজর দেয়া জরুরি।

এদিকে, সিস্টেম লসের নামে বিদ্যুতের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মূলত চোরাই সংযোগের মাধ্যমে লুটপাট করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তারা। এ প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. তামিম বলেন, ‘অবৈধ সংযোগ আছে, এখনও চুরি হচ্ছে। এসব বিষয়গুলোও দেখা উচিত। কাগজে-কলমে এখন যা সিস্টেম লস আছে, তা উন্নতির ইঙ্গিত করে। এটি আরও কমানোর সুযোগ আছে।’ তার এ অনুমান যে অমূলক নয়, তা বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা জানান, ফুটপাত ও রাস্তার দোকানে প্রতিদিন লাখ লাখ অবৈধ বিদ্যুৎ বাতি জ্বলে। একটি বাতি থেকে দিনে গড়ে ২০ টাকা আদায় করা হয়। সে হিসেবে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে মাসে ৩০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় একটি চক্র। যার নেপথ্যে বিদ্যুৎ বিভাগের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ আছে।

এদিকে ফুটপাতে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ চুরি করা হচ্ছে, তার প্রায় দ্বিগুণ বিদ্যুৎ ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোরিকশা ও থ্রি-হুইলার চার্জ করতে গচ্চা যাচ্ছে। অথচ এ বিদ্যুৎ বাবদ খুবই সামান্য রাজস্ব সরকারের কোষাগারে জমা হচ্ছে। ব্যাটারি চার্জের জন্য সারা দেশে যেসব স্টেশন গড়ে উঠেছে এর অধিকাংশেই অবৈধ সংযোগ বলে সংশ্লিষ্ট খাতের অনেকেই স্বীকার করেছেন। সরেজমিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এ তথ্যর সত্যতা মিলেছে।

এদিকে বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদ্যুৎ খাতে সিস্টেম লসের কারণে অপচয় হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। ১ শতাংশ সিস্টেম লস হলেই অন্তত ৭০০ কোটি টাকার ক্ষতি গুনতে হয়। এসবের দায় চাপে গ্রাহকের ওপর।

তারা জানান, গত এক যুগে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বেড়েছে পাঁচ গুণ। সঞ্চালন লাইন বেড়েছে পাঁচ হাজার কিলোমিটারের বেশি। বিতরণ লাইন বেড়ে হয়েছে প্রায় তিন গুণ। তবে এরপরও বিদ্যুতের অপব্যবহার ও চুরি বন্ধ হয়নি। সিস্টেম লস প্রতিবছর কিছু করে কমছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রত্যাশিত জায়গায় আসেনি। সিস্টেম লসে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে বলে জানান তারা। বিইআরসির তথ্য বলছে, ২০১০-১১ সালে বিদ্যুৎ খাতে সামগ্রিকভাবে বছরে গড় সিস্টেম লস ছিল ১৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ। গত অর্থবছরে (২০২০-২১) এটি কমে ১১ দশমিক ১১ শতাংশ হয়েছে। এর মধ্যে সঞ্চালন লাইনে ক্ষতি হয়েছে ৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। আগের বছরের চেয়ে এটি বেড়েছে। দেশের একমাত্র সঞ্চালন কোম্পানি পিজিসিবি (পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশ) বলছে, সঞ্চালন লাইন প্রতিবছর বাড়ছে। উপকেন্দ্র, ট্রান্সফরমারের সংখ্যা বাড়ছে। এতে বিদ্যুৎপ্রবাহে কারিগরি ক্ষতি বাড়াটাই স্বাভাবিক। উচ্চ ভোল্টেজে বিদ্যুৎপ্রবাহ বাড়লে ক্ষতি কমে আসবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গ্রাহকদের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছাতে এখন ছয়টি বিতরণ কোম্পানি কাজ করছে। এর মধ্যে ঢাকায় কাজ করে দু’টি কোম্পানি-ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) ও ঢাকা ইলেকট্রিক সাপস্নাই কোম্পানি (ডেসকো)। উত্তরবঙ্গে কাজ করা নর্দান ইলেকট্রিসিটি কোম্পানি (নেসকো) আছে সিস্টেম লসের শীর্ষে। গত বছর তাদের এ খাতে অপচয় ছিল ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এরপরই আছে দেশের সবচেয়ে বড় বিতরণ সংস্থা পলস্নী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি)। তাদের সিস্টেম লস ছিল ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ। পিডিবির সিস্টেম লস সাড়ে ৮ ও ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ওজোপাডিকো) ৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ। অথচ সঞ্চালন লাইনে ক্ষতি ২ দশমিক ৭৫ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে থাকলেই আন্তর্জাতিক মান বজায় থাকে। খরচ হিসাব করার ক্ষেত্রে এটি ৩ শতাংশ পর্যন্ত বিবেচনা করে বিইআরসি। এদিকে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের দাবি, ঢাকার বাইরে সিস্টেম লস পুরোপুরি কারিগরি। ঢাকার মতো ঘনবসতি না থাকায় গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছাতে লম্বা বিতরণ লাইন পার হতে হয়। বিদ্যুৎ যত বেশি দূরে প্রবাহিত হবে, তত অপচয়ের আশঙ্কা বেশি। অনেক অঞ্চলে বিদ্যুৎকেন্দ্র নেই। যার ফলে দূর থেকে বিদ্যুৎ আনতে গিয়ে ভোল্টেজও কমে যায়। এতেও অপচয় বেশি হয়। এখন যতটুকু সিস্টেম লস হচ্ছে, তা কারিগরি। বর্তমান অবকাঠামোয় এর চেয়ে খুব বেশি কমানো সম্ভব নয় বলে দাবি করেন তারা। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, ভুতুড়ে বিল সমন্বয় করার অনেক রেকর্ড আছে বিতরণ কোম্পানির। এসব বিল সমন্বয় করে সিস্টেম লস কমিয়ে দেখায়। বাস্তবে এর পরিমাণ আরও বেশি। অন্য দেশের মতো দীর্ঘ সঞ্চালন লাইন দেশে নেই। তাই এটি অন্য দেশের চেয়ে কম হওয়ার কথা। সিস্টেম লসের অপচয় ভোক্তার ওপর চাপানো হচ্ছে। অথচ এসব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করায় বিইআরসি দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিচ্ছে।

এদিকে ১৯ জুলাই থেকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সারা দেশে লোডশেডিং দেয়া হলেও সরকারি প্রতিষ্ঠানে এর অপব্যবহার ও অপচয় রোধে সংশ্লিষ্টরা যথেষ্ট সচেতন হয়নি বলে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ উঠেছে। তারা জানিয়েছে, বেশিরভাগ সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনের তুলনায় দুই থেকে তিনগুণ এসির ব্যবহার হচ্ছে।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More