নিরন্তর পরিশ্রম এবং পরিকল্পনার ফসল হচ্ছে আজকের অর্জন

উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘে সুপারিশ লাভ : সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী

স্টাফ রিপোর্টার: শেখ হাসিনা বলেছেন স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের জন্য জাতিসংঘের চূড়ান্ত সুপারিশ লাভ করেছে বাংলাদেশ। গত ১২ বছরের সরকার পরিচালনায় নিরন্তর পরিশ্রম এবং পরিকল্পনার ফসল হচ্ছে আজকের অর্জন। এই উত্তরণকে ঐতিহাসিক গর্বের বিষয় বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, এর কৃতিত্ব এ দেশের আপামর সাধারণের। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা এই মাইলফলক অর্জন করেছি। এই অর্জন দেশের নতুন প্রজন্মকে উৎসর্গ করেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের এই উত্তরণ এমন একসময়ে ঘটলো, যখন আমরা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন করছি। আমরা মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপনের দ্বারপ্রান্তে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শনিবার বিকালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণে জাতিসংঘের সুপারিশ লাভ উপলক্ষ্যে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনের বক্তৃতায় এসব কথা বলেন। তিনি গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ভার্চুয়ালি এই সংবাদ সম্মেলনে যোগ দেন। জাতির পিতার ছোট মেয়ে ও প্রধানমন্ত্রীর ছোট বোন শেখ রেহানা, সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এবং বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি গণভবনে উপস্থিত ছিলেন। সাংবাদিকরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ভার্চুয়ালি সংযুক্ত ছিলেন।
২২-২৬ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে এলডিসি স্ট্যাটাস পর্যালোচনা করে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উত্তরণের সুপারিশ করা হয়। বৈঠকে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের সূচক পর্যালোচনা করা হয়। বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণে সব ধরনের সূচকের অগ্রগতি হয়েছে। এদিন প্রধানমন্ত্রীর হাতে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের জন্য জাতিসংঘের চূড়ান্ত সুপারিশপত্র তুলে দেন অর্থমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতায় বলেন, মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুগুরতা-এই তিনটি সূচকের ভিত্তিতে জাতিসংঘ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের বিষয়টি পর্যালোচনা করে। ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনা সভায় বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের তিনটি মানদ-ই খুব ভালোভাবে পূরণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় এ বছর অনুষ্ঠিত ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনা সভায় বাংলাদেশ পুনরায় সব মানদ- অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে পূরণের মাধ্যমে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করল।
তিনি বলেন, জাতিসংঘের পর্যালোচনায় ২০১৯ সালে মাথাপিছু আয়ের মানদ- নির্ধারিত ছিল ১ হাজার ২২২ মার্কিন ডলার। ওই বছর বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ১ হাজার ৮২৭ ডলার। আর বর্তমানে আমাদের মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৬৪ ডলার। অর্থাৎ মানদ-ের প্রায় ১ দশমিক ৭ গুণ। মানবসম্পদ সূচকে নির্ধারিত মানদ- ৬৬-এর বিপরীতে বাংলাদেশের অর্জন ৭৫ দশমিক ৪। অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুগুরতা সূচকে উত্তরণের জন্য মানদ- নির্ধারিত ছিল ৩২ বা তার কম। কিন্তু ওই সময়ে এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ২৭।
মুজিববর্ষে সবার জন্য ঘর দেওয়ার কর্মসূচির কথা তুলে ধরেন সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, মুজিব জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে দেশের সব গৃহহীনকে ঘর দেয়ার কর্মসূচির আওতায় ৮ লাখ ৯২ হাজার গৃহহীনকে ঘর দেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৭০ হাজার ঘর হস্তান্তর করা হয়েছে। আরও ৫০ হাজার গৃহ নির্মাণের কার্যক্রম চলমান। ১৯৯৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট ৯ লাখ ৯৮ হাজার ৩৪৬ পরিবারকে বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে।
নারীর ক্ষমতায়নের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের নারীরা আজ স্বাবলম্বী। জেন্ডার গ্যাপ ইনডেক্সে ১৫৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৫০তম এবং নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে সপ্তম।
বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার ৯৪০ জনকে প্রথম ডোজ করোনাভাইরাসের টিকা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
টিকা দেওয়া হলেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। বাইরে বের হলে মাস্ক ব্যবহার করা, হাত ধোয়া এবং পরিচ্ছন্ন থাকার জন্য দেশবাসীর প্রতি তার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
টিকাগ্রহীতার তালিকায় যেমন সাধারণ মানুষ রয়েছেন, তেমনই মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সরকারি কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও রয়েছেন। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের মধ্যে শেখ রেহানা টিকা নিয়েছেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি অবশ্যই টিকা নেব। তবে দেশের মানুষকে আগে দিতে হবে। আমার ৭৫ বছর বয়স। আজ আছি, কাল নেই। একটা টার্গেট করা আছে। সে পরিমাণ যখন দেওয়া হবে, তখন যদি টিকা থাকে, তাহলে তখন টিকা নেব।’
বাংলাদেশে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সফলতার পেছনে কোনো ম্যাজিক লুকিয়ে আছে কি না জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটা কোনো ম্যাজিকের কিছু না। যখন যেভাবে বলেছি, সবাই মেনে চলেছে। সবাই সম্মিলিতভাবে কাজ করায় এটা হয়েছে। এটা বাংলাদেশের মানুষের সম্মিলিত ম্যাজিক।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘করোনা সারা বিশ্বকে স্থবির করে দিয়েছিল। জনগণের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ যে, আমরা যখন যেভাবে বলেছি, সবাই তা মেনে চলেছে। আমরা বিশেষ করে অর্থনীতির ক্ষেত্রে সময়োচিত পদক্ষেপ নিয়েছি। মানুষের যেন কষ্ট না হয়, সেটা দেখেছি। আর্থিক প্রণোদনা দিয়েছি। সব শ্রেণির মানুষ সহায়তা পেয়েছে। তখনও গবেষণা চলছে, যখন আমরা আগাম অর্থ দিয়ে করোনার টিকা কেনার ব্যবস্থা নিয়েছি।’
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ যখন গড়ে তুলেছি, তখন ডিজিটাল নিরাপত্তা দেওয়াও আমাদের দায়িত্ব। কেউ যেন সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদে না জড়াতে পারে, সেজন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা অপরিহার্য।’
তিনি আরও বলেন, ‘সমালোচনা যারা করছে, তারা সবকিছু কি অনুধাবন করছে? আজকের এই দিনে আমি অন্য কিছু বলতে চাই না। শুধু এটুকুই বলব, কারও মৃত্যুই কাম্য নয়। তবে সেটাকে উদ্দেশ করে অশান্তিও কাম্য নয়। অসুস্থ হয়ে মারা গেলে কী করার আছে?’
আলজাজিরা নামের একটি চ্যানেলের নিউজে দেশ সম্পর্কে অপপ্রচারের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার কোনো প্রতিক্রিয়াও নেই। কিছু বলারও নেই। একটা চ্যানেল কী বলছে না বলছে। দেশের মানুষ বিচার করবে, কতটুকু বানোয়াট, কী উদ্দেশ্যে করা হয়েছে, সেটা দেশের মানুষ জানে। আমার চিন্তার কিছু নেই। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। কোন চ্যানেল কী বলল, সেটা শুনে চলা আমার রাজনীতি নয়, দেশের মানুষের জন্য কাজ করাই আমার রাজনীতি। যারা বলবে বলতে থাকবে, এটা তাদের কাজ। জনগণের জন্য কাজ করা আমাদের কাজ।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘যারা এসব বলে, তারা ৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আমার গোটা পরিবারকে হত্যা করেছে। ছোট শিশুকে হত্যা করেছে। আমি সন্তান হিসাবে যখন সরকারে এলাম, তখন বাবা-মায়ের হত্যার বিচার করেছি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছি, মানবতাবিরোধীদের বিচার করেছি। অস্ত্র মামলা, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামালার বিচার করেছি।’

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More