নৌবাহিনী কর্মকর্তাকে ‘মেরে’ ফেঁসে গেলেন হাজি সেলিমের ছেলে

র‌্যাবের অভিযান : বিদেশি পিস্তলসহ মাদক উদ্ধার

স্টাফ রিপোর্টার: ঢাকার ধানম-িতে নৌবাহিনীর একজন কর্মকর্তাকে ‘মারধরের’ পরদিন র‌্যাবের অভিযানে গ্রেফতার হলেন সংসদ সদস্য হাজি সেলিমের ছেলে ইরফান সেলিম; বেরিয়ে এল তার অপকর্মের নানা চিত্র, তাৎক্ষণিক কারাদ-েও দ-িত হলেন তিনি। পুরান ঢাকার তৃতীয়বারের এমপি হাজি সেলিমের দ্বিতীয় সন্তান ইরফান আরেক সংসদ সদস্য নোয়াখালীর একরামুল করিম চৌধুরীর জামাতা। বিদেশে লেখাপড়া করে আসা ইরফান বাবার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মদিনা গ্রুপের পরিচালকদের একজন। ইরফান নিজেও একজন জনপ্রতিনিধি; পুরান ঢাকার সোয়ারি ঘাট, মিটফোর্ড রোড ও আশপাশের এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তিনি।

ইরফান ও তার সহযোগীদের হাতে নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তা ‘মারধরের শিকার হওয়ার’ জের ধরে সোমবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে সোয়ারিঘাটের দেবদাস লেনে হাজি সেলিমের বাড়ি ঘেরাও করে অভিযান শুরু করে র‌্যাব। কিছুক্ষণের মধ্যে ভবনের চতুর্থ তলা থেকে ইরফান ও তার দেহরক্ষী মোহাম্মদ জাহিদকে আটক করে। সাদা রঙের নয়তলা ওই ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় ইরফান সেলিম থাকতেন জানিয়ে বিকেলে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম বলেন, ওই দুই ফ্লোর থেকে দুটি অবৈধ বিদেশি পিস্তল, গুলি, একটি এয়ারগান, ৩৭টি ওয়াকিটকি, একটি হাতকড়া এবং বিদেশি মদ ও বিয়ার পাওয়া গেছে।

‘আগ্নেয়াস্ত্রের কোনো লাইসেন্স নেই। আর ওয়াকিটকিগুলোও অবৈধ, কালো রঙের এসব ওয়াকিটকি শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ব্যবহার করতে পারেন।’ পরে মদ্যপান ও ওয়াকিটকি ব্যবহার করার অপরাধে ইরফান ও তার দেহরক্ষী জাহিদকে ছয় মাস করে এক বছরের কারাদ- দেয় সারওয়ার আলম নেতৃত্বাধীন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। সন্ধ্যায় র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক আশিক বিল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের এই দ-ের পাশাপাশি দুজনের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক আইনে দুটি মামলা দায়ের করা হবে। পরে রাত সোয়া ৮টার দিকে ইরফান ও তার দেহরক্ষীকে ওই ভবন থেকে বের করে টিকাটুলীতে র‌্যাব-৩ এর কার্যালয়ে নেয়া হয়। রাত ১টার দিকেও সেখানে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছিলো। দেবীদাস লেনের ভবনে অভিযানের মধ্যেই চকবাজারের আশিক টাওয়ারে অভিযান চালিয়ে ইরফানের ‘নির্যাতন কেন্দ্রের’ সন্ধান পাওয়ার কথা জানায় র‌্যাব।

ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম সাংবাদিকদের বলেন, ইরফানের দেয়া তথ্য অনুযায়ী ১৬তলা ওই ভবনের ছাদের একটি কক্ষে অভিযান চালানো হয়। সেখানে হকিস্টিক, হাতকড়া, ছোরা, মোটা রশি, গামছা, ইলেকট্রিক শক দেয়ার তারসহ অন্যান্য সরঞ্জাম এবং ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম পাওয়া যায়। এখানে বিভিন্নজনকে এনে নির্যাতন করতেন ইরফান। পরে ওই ভবনে গিয়ে দেখা যায়, ১৬তলায় মদিনা ডেভেলপার কোম্পানির অফিস রয়েছে। তার উপরে ছাদে একপাশের বড় একটি কক্ষে থেকে ‘নির্যাতনের’ বিভিন্ন অস্ত্র-সরঞ্জাম জব্দ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করছিলেন র‌্যাব সদস্যরা। কম্পিউটার মনিটর-সোফা দিয়ে সাজানো এই কক্ষের পূর্ব পাশে রয়েছে ব্যাডমিন্টন খেলার ব্যবস্থা।

রোববার রাতে ধানম-ি এলাকায় সংসদ সদস্যের স্টিকারযুক্ত হাজি সেলিমের একটি গাড়ি থেকে নেমে নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট মো. ওয়াসিফ আহমেদ খানকে মারধর করা হয়। এ ঘটনায় সোমবার ধানম-ি থানায় দায়ের করা মামলায় ইরফান সেলিম ছাড়াও হাজি সেলিমের প্রোটোকল অফিসার এবি সিদ্দিক দিপু, ইরফানের দেহরক্ষী মোহাম্মদ জাহিদ এবং গাড়িচালক মিজানুর রহমানের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত পরিচয় আরও তিনজনকে আসামি করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে বেআইনিভাবে পথরোধ করে সরকারি কর্মকর্তাকে মারধর, জখম ও প্রাণনাশের হুমকি দেয়ার অভিযোগ আনেন মামলার বাদী ওয়াসিফ আহমেদ খান।

মামলার এজাহারে বলা হয়, লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফ রোববার রাত পৌনে ৮টার দিকে স্ত্রীকে নিয়ে মোটরসাইকেলে করে কলাবাগানের দিকে যাচ্ছিলেন। ল্যাবএইড হাসপাতালের সামনে সংসদ সদস্যের স্টিকার লাগানো একটি কালো রঙের ল্যান্ড রোভার গাড়ি (ঢাকা মেট্রো-ঘ-১১-৫৭৩৬) পেছন থেকে তার মোটরসাইকেলে ধাক্কা দেয়। ওয়াসিফ ও তার স্ত্রী ধাক্কা সামলে মোটরসাইকেল থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে ওই গাড়ি থেকে জাহিদ, দিপু এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও দুই-তিনজন ‘অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ’ করতে করতে নেমে আসেন এবং ‘মারধর’ শুরু করেন। তারা লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফ ও তার স্ত্রীকে ‘উঠিয়ে নেয়ার এবং হত্যার’ হুমকি দেন বলেও মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।

ওই ঘটনার পরে একজন প্রত্যক্ষদর্শী মোবাইল ফোনে লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফের বক্তব্য ধারণ করেন, যা ইতোমধ্যে ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে নৌবাহিনীর এই কর্মকর্তাকে রক্তাক্ত মুখে বলতে শোনা যায়, তিনি পরিচয় দেয়ার পরও তাকে মারধর করা হয়েছে, তার স্ত্রীর গায়েও ‘হাত দিয়েছে’। মামলা হওয়ার পরপরই গাড়ির চালক মিজানুরকে গ্রেফতার করে পুলিশ। আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সোয়ারিঘাটে হাজি সেলিমের ওই বাড়ি ঘিরে অভিযান শুরু করে র‌্যাব। এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য হাজি সেলিমের মোবাইলে একাধিকবার ফোন করলেও সাড়া দেননি তিনি। আওয়ামী লীগের এই সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত সহকারীর মোবাইলে ফোন করেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি। আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগরের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক হাজি সেলিম এবার তৃতীয় মেয়াদে ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য। পুরান ঢাকার আলোচিত-সমালোচিত হাজি সেলিম বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েই ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে এই এলাকা থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সে সময় সাবেক ঢাকা-৮ আসনের বিএনপি প্রার্থী আবুল হাসনাতকে হারালেও ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি হেরে যান বিএনপি প্রার্থী নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর কাছে। এরপর সংসদীয় এলাকার সীমানা পুনর্বিন্যাসের পর ২০০৮ সালের নির্বাচনে ওই আসনে আওয়ামী লীগের তৎকালীন স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বিএনপির নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুকে হারিয়ে সাংসদ নির্বাচিত হন।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More