পদ্মা সেতুর উদ্বোধন ঘিরে দেশজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার

নিরাপত্তাসংক্রান্ত জাতীয় কমিটির বৈঠক আজ : স্পর্শকাতর স্থানসমূহে কঠোর নজরদারি

স্টাফ রিপোর্টার: যান চলাচলের জন্য ২৫ জুন খুলে দেওয়া হবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের বহু প্রত্যাশিত স্বপ্নের পদ্মা সেতু। এই সেতুর উদ্বোধনকে ঘিরে ষড়যন্ত্রকারীরা নাশকতা বা ধ্বংসাত্মক কিছু ঘটিয়ে জণগণের দৃষ্টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে পারে-এমন আশঙ্কা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে গত কয়েকদিনে পুলিশ সদর দপ্তরে দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে। পাশাপাশি রোববার সেতু ভবনেও এ সংক্রান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচন করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে আজ গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে নিরাপত্তাসংক্রান্ত জাতীয় কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষ্যে সারা দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্য রক্ষা, বাজার তদারকি, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, রোহিঙ্গা ইস্যু এবং ডলার ও টাকার মূল্যমানের ভারসাম্য রক্ষার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

সরকারের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, পদ্মা সেতু বর্তমান সরকারের একটি বড় সাফল্য। এ সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে সরকারবিরোধী চক্র এবং দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী মহল নানা অপপ্রচারে লিপ্ত। মহলটি জনগণকে বিভ্রান্ত করার পাশাপাশি সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র করছে। সেতুর উদ্বোধনকে ঘিরে সারা দেশে, বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যাচ্ছে। এই উৎসবমুখর পরিবেশকে মøান করে দিতে এবং জনগণের দৃষ্টিকে ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করতে দেশে নাশকতা সৃষ্টির মাধ্যমে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির অপচেষ্টা চলছে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, পদ্মা সেতু নির্মাণের শুরু থেকেই ‘কল্পিত দুর্নীতির আখ্যান’ দিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। সেতুর আসন্ন মাহেন্দ্রক্ষণকে সামনে রেখে ষড়যন্ত্রকারীরা ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তারা সরকারবিরোধী বক্তব্য-বিবৃতি দিচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে অশালীন ও অসৌজন্দ্রƒলক বক্তব্য ছড়ানো হয়েছে। এর জের ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ-ছাত্রদলের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। ৪ জুন চট্টগ্রামের সীতাকু-ে বিএম কনটেইনার ডিপোতে বিস্ফোরণে অর্ধশতাধিক নিহত ও দুই শতাধিক আহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে চক্রান্তকারীরা পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের আগেই সরকারবিরোধী অন্দোলন জোরদার করার অপচেষ্টা চালাতে পারে। তিনি বলেন, সরকারবিরোধী চক্র ও স্বার্থান্বেষী মহল পদ্মা সেতুর ক্ষতিসাধনসহ সরকারকে বিব্রত করতে গুজব ও অপপ্রচারমূলক কর্মকা-ে লিপ্ত হতে পারে।

নিরাপত্তাসংক্রান্ত জাতীয় কমিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, যখনই জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় থাকে তখনই তা আমরা সরকারের নজরে আনি। পদ্মা সেতু যেহেতু বতর্মান সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমের একটি যুগান্তকারী মাইলফলক, তাই এটিকে ঘিরে যাতে কোনো অপশক্তি তৎপর হতে না পারে সে বিষয়ে নিরাপত্তাসংক্রান্ত জাতীয় কমিটির নজরদারি রয়েছে। তিনি বলেন, দেশের উন্নয়নের জন্য, সার্বভৌমত্বের জন্য, জনগণের নিরাপত্তার জন্য যেসব বিষয় হুমকি বলে বিবেচিত হয়, সব বিষয়ই কমিটিতে নিয়মিত আলোচিত হয়। প্রতি দুই মাসের মধ্যে জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির মিটিং নিয়মিতভাবে হয়। প্রত্যেকটি সভাতেই নিরাপত্তাজনিত হুমকির বিষয়টি সামনে আসে। সেটি হতে পারে খাদ্য নিরাপত্তা, ব্যবসায়িক নিরাপত্তা, আর্থিক নিরাপত্তা বা অন্য বিষয়। এবারের মিটিংয়ের মূল অলোচনার বিষয় হলো সরবরাহ চেইন। ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ চেইন বিঘিœত হচ্ছে। খাদ্যের সাপ্লাই চেইন বিঘিœত হওয়ার প্রেক্ষিতে আমাদের দেশের দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক রাখা মূল বিষয়। ডলারের মূল্যের সঙ্গে টাকার মূল্যমানকে সমন্বিত করতে আমদানি-রপ্তানির মধ্যে সমন্বয় আনতে আমাদের কী করণীয় সে বিষয়টি সভায় আলোচিত হবে।

সাবেক ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, বৈঠকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে সমসাময়িক রাজনীতির প্রেক্ষাপট। রাজনীতির আড়ালে যদি কেউ দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র করে তাকে ছাড় দেওয়া হবে না। কারা ষড়ন্ত্র করছে, ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে সে বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করা কমিটির দায়িত্ব। তিনি বলেন, আলোচনার তৃতীয় বিষয় হচ্ছে মেগা প্রকল্প। মেগা প্রকল্পগুলো যথাসময়ে সম্পন্ন করতে কী কী বিপত্তি আসতে পারে, দেশি-বিদেশি কী কী থ্রেট আসতে পারে সেগুলো পর্যালোচনা হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা একটি বিষফোঁড়া। রোহিঙ্গারা আমাদের দেশে দীর্ঘমেয়াদি কী কী প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে তা পর্যালোচনা করছি। রোহিঙ্গারা আমাদের দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক উন্নয়নে বাধা হতে পারে। এ বিষয়টি অলোচনা করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হবে।

এক প্রশ্নের উত্তরে নিরাপত্তাসংক্রান্ত জাতীয় কমিটির সিইও বলেন, পদ্মা সেতুর শুরুতেই ষড়যন্ত্র ছিল। নিজস্ব টাকায় পদ্মা সেতু করায় প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ অনেকেই অসন্তুষ্ট। যারা বাংলাদেশের উন্নয়ন চায় না, তারা পদ্মা সেতুকে ভালো চোখে দেখছে না। তাদের বিষয়ে সরকার, গোয়েন্দা সংস্থা ও দায়িত্বশীল প্রশাসন সতর্ক আছে। যে কোনো ধরনের নাশকতা এড়াতে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল সতর্ক আছে। আশা করি, সব ষড়যন্ত্র ভেদ করে পদ্মা সেতুসহ সব মেগা প্রকল্প সুন্দরভাবে বাস্তবায়িত হবে। অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সোমবারের মিটিংয়ে উপস্থিত কেউ যদি পদ্মা সেতুর বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট থ্রেটের কথা উল্লেখ করেন তাহলে নিশ্চয়ই সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

পদ্মা সেতুর উদ্বোধনকে ঘিরে কী ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (অপারেশন্স) হায়দার আলী খান বলেন, জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত কোনো বিষয় দেখা দিলে আমরা গোয়েন্দা সংস্থাকে অধিকতর অ্যাকটিভ করি। দেশে-বিদেশে কোনো অপশক্তি কাজ করছে কিনা, সেটা পর্যালোচনা করি। পদ্মা সেতুর উদ্বোধনকে ঘিরেও এসব বিষয় সামনে এসেছে। সেতুকে ঘিরে ইতোমধ্যে দেশের বাইরে থেকেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উসকানি দেওয়া হচ্ছে। দেশের ভেতর থেকেও কেউ এ ধরনের কাজ করতে পারে। আমরা তাদের মনিটরিং করছি। সব ধরনের রিস্ক আমরা পর্যালোচনা করেছি। সে অনুযায়ী ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে। সারা দেশেই নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। যেসব জায়গায় বড় পর্দায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দেখানো হবে সেসব জায়গায় গোয়েন্দা নজদারি বাড়ানো হয়েছে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যারা অনুষ্ঠানস্থলে আসবেন তাদের চলাফেরা নির্বিঘœ করতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

ডিআইজি হায়দার আলী বলেন, কেউ নাশকতার পরিকল্পনা করে থাকলে সেটা সফল হবে না। ষড়যন্ত্রকারীদের আমরা ইতোমধ্যে নজরদারিতে এনেছি। আইনশৃঙ্খলার অবনতি যাতে না হয়, সেজন্য যে ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত সবই আমরা নিয়েছি। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার বিভিন্ন ইউনিট সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করছে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমরা অপপ্রচারকারীদের বিষয়ে সতর্ক আছি। দেশের যে কোনো স্থানে কোনো ঘটনা ঘটিয়ে চক্রান্তকারীরা জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টা চালাতে পারে। তাই সারা দেশের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। কেপিআইভুক্ত প্রতিষ্ঠানসহ সব ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। জানতে চাইলে শরীয়তপুরের এসপি আশরাফুজ্জামন বলেন, পদ্মা সেতুকে ঘিরে কত স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছি, সেটা বলব না। তবে এটা বলতে পারি, সব স্তরই নিরাপত্তা চাদরে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে। আশ করছি, কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটবে না।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More