পিকে হালদারকে আইনি পথে দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া শুরু

ভারতের আদালতে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর : বাংলাদেশে হস্তান্তর করা হবে : ইডি
স্টাফ রিপোর্টার: হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও অর্থ পাচারে অভিযুক্ত প্রশান্ত কুমার হালদারকে (পিকে হালদার) বন্দি প্রত্যার্পণ চুক্তির মাধ্যমে আইনি পথেই দেশে ফেরানোর আশা করছেন দুদক চেয়ারম্যান মঈনউদ্দীন আব্দুল্লাহহ। তবে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাকে দেশে ফেরাতে অন্তত তিন মাস লাগতে পারে বলে জানান তিনি। রোববার গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘আমাদের আইনি প্রক্রিয়া তো আছেই। এছাড়া আমাদের দেশের আইন আছে, ভারতেরও আইন আছে। আমাদের সঙ্গে তাদের বন্দি বিনিময় চুক্তি আছে। চুক্তিতে যেভাবে বলা আছে সেভাবেই আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো দ্রুত সময়ের মধ্যে তাকে (পিকে হালদার) ফিরিয়ে আনতে।’ দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘ভারত, কানাডা, শ্রীলংকা, আরব আমিরাতে আমরা অ্যাবেডিয়ার পাঠিয়েছিলাম। আমরা ইন্টারপোলের মাধ্যমে ওয়ারেন্ট অব অ্যারেস্ট ইস্যুর আবেদন করেছিলাম। ইন্টারপোল রেড এলার্ট জারি করেছে এবং ইন্ডিয়া আমাদের কাছে বিভিন্ন সময় বেশ কিছু তথ্য চেয়েছে; আমরা সেগুলো সরবরাহ করেছি তার ব্যাপারে। যেটা নিয়ম সেটাই করেছি আমরা।’
এদিকে, পিকে হালদারকে ফেরাতে বন্দি বিনিময় চুক্তি ও ইন্টারপোলের সহযোগিতাসহ সব ধরনের মাধ্যমে চেষ্টা করা হবে। এমন মন্তব্য করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন। এর আগে পিকে হালদারের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন ভারতের ব্যাঙ্কশাল স্পেশাল সিবিআই কোর্ট। শনিবার দিবাগত গভীর রাতে পিকে হালদারসহ ছয়জনকে আদালতে হাজির করা হয়। এরপর আদালত তাদের তিন দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে তড়িঘড়ি অনলাইনে পেপার সাবমিট করে স্পেশাল সিবিআই কোর্টে ওই ছয়জনকে হাজির করা হয়। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে এই খবর চেপে রাখা হয়েছিলো।
এদিকে, রোববার সকালে অর্থ-সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বাহিনী এনফোর্সমেন্ট ডাইরেক্টরেট (ইডি) জানায়, পিকে হালদারকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে নিজেদের হেফাজতে রেখেছে ইডি। একই সঙ্গে প্রাণেশ হালদার ওরফে প্রীতিশের স্ত্রীকে আদালতের মাধ্যমে জেলে পাঠানো হয়েছে। উত্তম মিত্র, স্বপন মিত্র, প্রশান্ত হালদার, প্রীতিশ হালদার এবং তার জামাতা সঞ্জীব হালদারকে সল্টলেকের পূর্বাঞ্চলীয় সিজিও কমপেস্নক্সে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এ সময় পিকে হালদার কান্নায় ভেঙে পড়েছেন বলে জানা গেছে।
ইডি সূত্রে জানা যায়, পিকে হালদার ওরফে শিবশঙ্কর হালদারকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এ সময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। তার সঙ্গে জড়িত অন্যদেরও জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তবে সবাইকে পৃথক জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে ইডি সূত্রে জানা গেছে। জিজ্ঞাসাবাদে পিকে হালদার জানিয়েছেন, তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করবেন। শনিবার সকালে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ মাথায় নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমানো এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পিকে হালদারসহ ছয়জনকে পশ্চিমবঙ্গের অশোকনগর থেকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার অন্য পাঁচজন হলেন- উত্তম মিত্র, স্বপন মিত্র, সঞ্জীব হালদার, প্রাণেশ হালদার (প্রীতিশ) ও তার স্ত্রী।
বাংলাদেশে হস্তান্তর করা হবে: এদিকে, হাজার কোটি টাকা লোপাট মামলার মূল অভিযুক্ত ও পলাতক আসামি প্রশান্ত কুমার হালদারকে (পিকে হালদার) বাংলাদেশে হস্তান্তর করা হবে। ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) কর্মকর্তারা এই ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির ইংরেজি দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফ। তারা বলেছে, দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ২০১৬ সালের প্রত্যার্পণ চুক্তির আওতায় পিকে হালদারকে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে। ইডির একজন কর্মকর্তা দ্য টেলিগ্রাফকে বলেছেন, শেষ পর্যন্ত তাকে বাংলাদেশে নিয়ে যাওয়া হবে। শনিবার পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগর থেকে গ্রেপ্তারের পর বাংলাদেশের হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ মামলার মূলহোতা পিকে হালদারকে ভারতের একটি আদালতে তোলা হয়। পরে আদালতের বিচারকরা তাকে মঙ্গলবার পর্যন্ত ইডি হেফাজতে পাঠিয়ে দেন। ইডি বলছে, ব্যক্তিগত আইনজীবী সুকুমার মৃধার সহায়তায় পিকে হালদার পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের একাধিক রাজ্যে বিপুল সম্পদ করেছেন। বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে অর্থ পাচারের মাধ্যমে ভারতে একাধিক অভিজাত বাড়িসহ বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে খোঁজ পেয়েছে ইডি। দেশটির কেন্দ্রীয় এই তদন্ত সংস্থা বলছে, তারা অভিযানের সময় পিকে হালদারের কাছ থেকে সম্পত্তি এবং জমির দলিলসহ কিছু মূল কাগজপত্র জব্দ করেছেন। এসব নথিতে প্রাথমিকভাবে ভারতে তার ২০ থেকে ২২টির মতো বাড়ির মালিকানার তথ্য মিলেছে।
আনুষ্ঠানিক তথ্য পেলে ব্যবস্থা: এদিকে, বিপুল অর্থ আত্মসাতের পর পশ্চিমবঙ্গে পালিয়ে থাকা পিকে হালদারকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে ভারত এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সরকারকে কিছু জানায়নি। ভারত এ ব্যাপারে জানালেই তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। রোববার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘পিকে হালদার ওয়ান্টেড ব্যক্তি, ইন্টারপোলের মাধ্যমে অনেক দিন ধরে তাকে চাচ্ছি। সে গ্রেফতার হয়েছে, তবে আমাদের কাছে এখনো (ভারত থেকে) অফিসিয়ালি কিছু আসেনি। আমাদের যা কাজ থাকে তা হলো আইনগতভাবে তাকে…।’
এর আগে ভারতে পিকে হালদারের বিপুল পরিমাণ অর্থের সন্ধান পায় দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা। কলকাতায় পিকে হালদারের সহযোগী সুকুমার মৃধার কাছে এ অর্থের সন্ধান মেলে। শুক্রবার (১৩ মে) সকাল থেকেই পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায় ভারতের অর্থ-সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বাহিনী এনফোর্সমেন্ট ডাইরেক্টরেট (ইডি)।
ইডি জানায়, প্রশান্ত হালদার নামে এক বাংলাদেশি হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে কানাডায় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তারই সহযোগী সুকুমার মৃধা বর্তমানে উত্তর ২৪ পরগনার ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের মাছ ব্যবসায়ী। সুকুমার মৃধার বাড়ি ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় তার অফিসে তল্লাশি চালায় ইডি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি মাছের ব্যবসার আড়ালে বিপুল পরিমাণ বেআইনি টাকার লেনদেন করেন। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক জালিয়াতির অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। পিকে হালদারের বিরুদ্ধে প্রায় তিন হাজার ৬০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ রয়েছে। বেশ কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকালে এই অর্থ পাচার করেছিলেন তিনি। তাকে গ্রেপ্তার করতে রেড অ্যালার্ট জারি করেছিল ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ অর্গানাইজেশন (ইন্টারপোল)।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More