বাঙালি জাতির জীবনে সবচেয়ে কলঙ্কময় দিন আজ

জাতীয় শোক দিবস যথাযথ মর্যাদায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে পালনের আহ্বান
স্টাফ রিপোর্টার: ‘একটি কবিতা লেখা হবে, তার জন্য কী দারুণ অপেক্ষা আর উত্তেজনা নিয়ে লক্ষ লক্ষ উন্মুক্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে, ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে, কখন আসবেন কবি?… শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে, রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে, অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন। তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল, হৃদয়ে লাগিল দোলা, জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার সকল দুয়ার খোলা। কে রোধে তাহার বজ্রকণ্ঠ বাণী? গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর-কবিতা খানি- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। ‘স্বাধীনতা-এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ কবি নির্মলেন্দু গুণের এই কবিতার কবি আর কেউ নন, তিনি আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বাঙালি জাতিকে সর্বাত্মক জাগিয়ে তোলা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালির ৪৬তম শাহাদতবার্ষিকী আজ। আজ বাঙালি জাতির শোক ও বেদনার দিন, আজ বাঙালির মহানায়ককে হত্যার ঘৃণ্যতম দিন। বাঙালি জাতির জীবনে সবচেয়ে কলঙ্কময় দিন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বিপথগামী কিছু সেনাসদস্য আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে স্বাধীনতার স্থপতি, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। ১৫ আগস্ট সুবহে সাদেকের সময় পবিত্র আজানের ধ্বনিকে বিদীর্ণ করে ঘাতকের মেশিনগানের ঝাঁক ঝাঁক গুলি। ঝাঁঝরা হয়ে ওঠে স্বাধীন বাংলার বুক। দেশের কিছু বিপথগামী সেনাসদস্য ঐতিহাসিক ৩২ নম্বরে ইতিহাস স্রষ্টার বুকেই শুধু গুলি চালায়নি, একই সঙ্গে তার ছায়াসঙ্গী নিরীহ-নিরপরাধ নারী, শিশু, অন্তঃসত্ত্বাকেও হত্যা করে। সেই কালরাতে ঘাতকরা শুধু বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করেনি, খুনিদের হাতে শাহাদতবরণ করেন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর সন্তান শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশু শেখ রাসেল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল। বিশ্বের এই জঘন্যতম হত্যাকান্ড থেকে বাঁচতে পারেননি বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ নাসের, ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, আরিফ, বেবি ও সুকান্ত, বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবনেতা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক শেখ ফজলুল হক মণি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি, আবদুল নাঈম খান রিন্টু, কর্নেল জামিলসহ পরিবারের ১৬ জন সদস্য ও ঘনিষ্ঠজন। এ সময় বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় প্রাণে রক্ষা পান। জাতি আজ তার শ্রেষ্ঠ সন্তানকে স্মরণ করবে গভীর আবেগ, বিনম্র শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায়। আজ আবারও মানচিত্রজুড়ে ধ্বনিত হবে অন্নদাশংকর রায়ের সেই বিখ্যাত পঙ্গক্তি ‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান/ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।‘ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের কাছে শেখ মুজিবুর রহমানের অবিনাশী চেতনা ও আদর্শ চির প্রবহমান থাকবে। বঙ্গবন্ধু কেবল একজন ব্যক্তি নন; এক মহান আদর্শের নাম। যার আদর্শে উজ্জীবিত হয়েছিল টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার মানুষ। বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র আর ধর্মনিরপেক্ষতার দর্শনে দেশের সংবিধানও প্রণয়ন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শোষক আর শোষিতে বিভক্ত সেদিনের বিশ্ব-বাস্তবতায় বঙ্গবন্ধু ছিলেন শোষিতের পক্ষে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখার পাশাপাশি দেশের মানুষকে উন্নয়নের ধারায় সম্পৃক্ত করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। দেশ গড়ার এই সংগ্রামে চলার পথে তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, দেশের মানুষ কখনো তার ত্যাগ ও অবদানকে ভুলে যাবে না। অকৃতজ্ঞ হবে না। নবগঠিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান বঙ্গবন্ধু তাই সরকারি বাসভবনের পরিবর্তে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের সাধারণ বাড়িটিতেই বাস করতেন। বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করার পর স্বাধীনতাবিরোধী চক্র রাষ্ট্রক্ষমতায় পুনর্বাসিত হতে থাকে। ঘাতকচক্র ও তাদের দোসররা বাংলাদেশ থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে দিয়ে দেশকে আবারও পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। খুনিচক্রের অন্যতম প্রধান জাতীয় বেইমান মীরজাফরসম খন্দকার মোশতাক ও তার সরকারে থাকা সঙ্গীরা বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার ঠেকাতে ও খুনিদের রক্ষা করতে ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ জারি করে। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে ইনডেমনিটিকে আইন হিসেবে অনুমোদন করেন। শুধু তাই নয়, তৎকালীন জিয়া সরকার খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দেয়। পরবর্তীতে খালেদা জিয়ার সরকার ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রম্নয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে খুনি কর্নেল রশীদকে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা বানায়। হত্যাকান্ডের ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ বাতিলের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ উন্মুক্ত হয়। ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর বিচারকাজ শুরু হয়। প্রায় ৩৫ বছর পর ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি রাষ্ট্রপিতা হত্যার কলঙ্ক থেকে জাতির মুক্তি ঘটে। বঙ্গবন্ধু হত্যার চূড়ান্ত বিচারের রায় অনুযায়ী ওই দিন মধ্যরাতের পর বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি বরখাস্তকৃত লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, লে. কর্নেল (অব.) সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মেজর (অব.) বজলুল হুদা, লে. কর্নেল (অব.) এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ (ল্যান্সার) এবং লে. কর্নেল (অব.) মুহিউদ্দিন আহমেদকে (আর্টিলারি) ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদন্ডের রায় কার্যকর করা হয়। পরবর্তীতে ২০২০ সালের ১১ এপ্রিল দিনগত রাতে আব্দুল মাজেদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। তবে বঙ্গবন্ধুর আরও পাঁচ খুনি এখনো রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এদের মধ্যে তিনজনের অবস্থান এখনো শনাক্তই করা যায়নি। বাকি দুজনের অবস্থান বিদেশে শনাক্ত হলেও তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে দন্ড কার্যকর করার ক্ষেত্রে চলমান আলোচনায় এখনো কোনো সুফল আসেনি। হত্যাকা-ে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিরা হলো- আব্দুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম, এম রাশেদ চৌধুরী, এসএইচএমবি নূর চৌধুরী ও রিসালদার মোসলেমউদ্দিন। তাদের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা আছে। এদের মধ্যে নূর চৌধুরী কানাডায় এবং এম রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে ইন্টারপোলসহ বিভিন্ন সংস্থা। বাকিরা কোথায় আছে সেটা নিশ্চিতভাবে কারও জানা নেই। তবে এদের কারও বর্তমান মুখাবয়ব নিশ্চিত নয় কেউই। জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ১৫ আগস্টের সব শহীদের রুহের মাগফেরাত কামনা করেন। জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দিবসটির শুরুতে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধু ভবন ও দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সংগঠনের সব স্তরের কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ ও কালো পতাকা উত্তোলন করা হবে। সকাল ৭টায় ধানমন্ডিস্থ বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন ও ৭টা ৪৫ মিনিটে বনানী কবরস্থানে ১৫ আগস্টের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনসহ ফাতেহা পাঠ, মোনাজাত ও দোয়া মাহফিলের অয়োজন করবে আওয়ামী লীগ। চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুরসহ সারাদেশে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠন বিভিন্ন প্রতিটি নেতাকর্মী যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, ফাতেহা পাঠ, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া বাদ জোহর কেন্দ্রীয়ভাবে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ দেশের সব মসজিদে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। মন্দির, প্যাগোডা, গির্জাসহ বিভিন্ন উপাসনালয়ে দেশব্যাপী বিশেষ প্রার্থনা কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে। দুপুরে অসচ্ছল, এতিম ও দুস্থ মানুষদের মাঝে খাদ্য বিতরণ করা হবে। বাদ আসর বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল। ১৬ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৩টায় বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউস্থ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জাতীয় শোক দিবসের আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভায় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সভাপতিত্ব করবেন এবং বক্তব্য রাখবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৬তম শাহাদতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস যথাযথ মর্যাদা এবং ভাবগম্ভীর পরিবেশে স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিধি মেনে পালনের জন্য আওয়ামী লীগ, সহযোগী, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সংস্থাসমূহের সব স্তরের নেতাকর্মী, সমর্থক, দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দলের সব জেলা, মহানগর, উপজেলা, পৌর, ইউনিয়ন, ওয়ার্ডসহ সব শাখার নেতৃবৃন্দকে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিভিন্ন উপযোগী কর্মসূচি গ্রহণ করে দিবসটি স্মরণ ও পালন করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More