বোরোর শুরুতেই সার সঙ্কট চরমে : বেড়েছে দাম

দাম নিয়ন্ত্রণে ১৫ দিন মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করবে সরকার
স্টাফ রিপোর্টার: বোরো মৌসুমের শুরুতেই সারের সঙ্কট চরমে। এ কারণে কেজিতে দাম বেড়েছে ২ টাকা পর্যন্ত। শতকরা হিসাবে যা ১২ শতাংশ। আগে প্রতি কেজি ইউরিয়া সার খুচরা বাজারে বিক্রি হতো ১৭ টাকা। বর্তমানে তা ১৯ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এছাড়া পাইকারি বাজারে প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একই অবস্থা টিএসপি, পটাশ ও এমওপি সারের ক্ষেত্রেও। সরকার বলছে, দেশে সারের কোনো সংকট নেই। কৃত্রিমভাবে সংকট সৃষ্টি করে এই দাম বাড়ানো হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যবস্থাপনা সংকটে এই সমস্যা। কারণ, ডিজেলের দাম বাড়ানোর পর সারের পরিবহণ বৃদ্ধিতে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এতে পরিবহণ ঠিকাদাররা পণ্য পরিবহণ করেনি। এ কারণে খুচরা পর্যায়ে সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে ১২ বছরে সারে সরকার ৭৫ হাজার কোটি টাকা ভতুর্কি দিয়েছে। এক্ষেত্রে দুর্নীতির কারণে ভর্তুকির পুরো সুফল পাচ্ছেন না কৃষক।
সার নিয়ে মঙ্গলবার আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক শেষে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, দেশে সারের পর্যাপ্ত মজুত আছে। এরপরও একশ্রেণির অসাধু ডিলার সিন্ডিকেটের কারণে কৃষককে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ১৫ দিন উপজেলা পর্যায়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে। প্রয়োজনে এই সময় বাড়ানো হবে। তবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার ফারুক মঙ্গলবার একটি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, সারের পর্যাপ্ত মজুত আছে। কিন্তু ব্যবস্থাপনার কারণে এই সংকট। এক্ষেত্রে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ডিলারদের ডিস্টার্ব না করে পরিবহণ ঠিকাদারদের সঙ্গে আলোচনা করে পরিবহণ নিশ্চিত করলেই বাজার স্থিতিশীল হবে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে গত বছরে দেশে মোট রাসায়নিক সারের চাহিদা নিরূপণ হয় ৫৯ লাখ ৩৪ হাজার টন। এর মধ্যে ইউরিয়া ২৬ দশমিক ৫০ লাখ টন। এক্ষেত্রে দেশে উৎপাদন ৫০ শতাংশ। বাকিটুকু আমদানি করতে হয়। এছাড়াও টিএসপির চাহিদা ৭ দশমিক ৫০ লাখ, ডিএপি ৯ লাখ, এমওপি ৮ দশমিক ৫০ লাখ ও এমএপি শূন্য দশমিক ৫০ লাখ টন। অন্যান্য রাসায়নিক সারের মধ্যে জিপসাম ৪ লাখ টন, জিংক সালফেট ১ লাখ ৩৩ হাজার, অ্যামোনিয়াম সালফেট ১০ হাজার, ম্যাগনেশিয়াম সালফেট ৮০ হাজার ও বোরন ৪১ হাজার টন। অন্যদিকে এনপিকেএস ৭০ হাজার টন নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব সারের বাজারমূল্য থেকে বেশি দামে সারের প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সরকার ভর্তুকি কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এক্ষেত্রে শুধু ইউরিয়া সারে প্রতিবছর সরকারের ভর্তুকি ১২ হাজার কোটি টাকা।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, ২০০৮-০৯ থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত মোট ৬৫ হাজার ৪৪৭ কোটি টাকার ভর্তুকি সহায়তা দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে সার বাবদ ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে ৫৮ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা। এছাড়া ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রায় ৭ হাজার কোটি এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে সারে। সব মিলিয়ে ১২ বছরে শুধু সারেই প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি দেয়া হয়েছে। বর্তমান বছরে তা ১৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
জানা যায়, ২ মাস আগেও এক বস্তা ইউরিয়া সার ৮০০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন এর দাম ৯০০ টাকা। পটাশ সার তো পাওয়ায় যাচ্ছে না। পাওয়া গেলেও ১১০০ থেকে ১২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর ১৬০ টাকার দস্তা সার ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এমনকি টিএসপি সার পাওয়া যাচ্ছে না। পাওয়া গেলেও ২ হাজার থেকে ২২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, বর্তমানে দেশে ৫ ধরনের সার বেশি ব্যবহার হয়। এর মধ্যে ইউরিয়ার মজুত ১ লাখ ৪০ হাজার টন, প্রতি কেজি সরকারি দাম ১৬ টাকা। এরপর বাজারে ১৭ টাকা বিক্রির কথা। কিন্তু বিক্রি হচ্ছে ১৯ টাকার বেশি দামে। এছাড়া ডিএপি সারের মজুত ৭১ হাজার টন, সরকারি দাম ১৬ টাকা প্রতি কেজি। বিক্রির কথা ১৮ টাকা। তবে বিক্রি হচ্ছে ২২ টাকায়। এছাড়াও পটাশ মজুত ৪৫ হাজার টন এবং টিএসটি ৩০ হাজার টন। এর সব সারেই কেজিতে ২ থেকে ৫ টাকা দাম বেড়েছে।
এ ব্যাপারে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমরা সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাস থেকে বলছি। দেশে সারের মজুতের সামান্যতম কোনো সমস্যা নেই। আমাদের গুদামে পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে। এছাড়াও পাইপলাইনে যা রয়েছে, তাতে আগামী জুলাই পর্যন্ত সারের মজুত থাকবে। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সাধারণ প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে ১৫ দিন অব্যাহতভাবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে। কোথাও কেউ বেশি দামে বিক্রি করলে মোবাইল কোর্ট তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।
শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন বলেন, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি বোরো চাষ মৌসুম। আর এই মৌসুমে সারের দাম নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।
কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, মজুত এবং পাইপলাইন মিলিয়ে জুন পর্যন্ত আমাদের সারের কোনো সমস্যা হবে না। তবে দামে সমস্যা হয়েছে, এটি অস্বীকার করা যাবে না। অবশ্যই বাজারে সারের দাম বেশি ছিল, যা আমি নিজেও দেখেছি। এ সময়ে বস্তায় ৩০ থেকে ৫০ টাকা বেড়েছে। এর কারণ, নভেম্বরে আমাদের সারের প্রয়োজন বেশি হয়। এ সময়ে আলু এবং অন্যান্য সবজির জন্য টিএসপি ও এমওপি সার বেশি লাগে। তিনি বলেন, নভেম্বরে যখন জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়, তখন আমরা বারবার বলেছিলাম কৃষিপণ্য পরিবহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিন্তু এটি নিশ্চিত হয়নি। আমাদের কন্টাক্টররা পর্যাপ্ত সারের ডেলিভারি করেনি। তিনি বলেন, আমাদের পর্যাপ্ত মজুত ছিল। কিন্তু খুচরা বিক্রেতাদের জন্য যে গুদাম ছিল, সেখানে পর্যাপ্ত মজুত ছিল না। এক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ছিল। তিনি বলেন, এ মুহূর্তে কোনো সংকট নেই। কারণ, নন ইউরিয়ার চাহিদা কমে গেছে। আর কিছুদিন পর ইউরিয়ার চাহিদা বাড়বে। এক্ষেত্রে পর্যাপ্ত মজুত আছে। তবে তিনি বলেন, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ডিলারদের ডিস্টার্ব না করে পরিবহণ ঠিকাদারদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পরিবহণ নিশ্চিত করলেই বাজার স্থিতিশীল হবে।
কৃষকরা বলছেন, সার কিনতে গেলে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা সংকটের কথা বলেন। তবে দাম বেশি দিলেই সার বের করে দিচ্ছেন। এছাড়া কিছু কিছু ডিলার দোকানে মূল্যতালিকা টাঙিয়ে রাখলেও সেই অনুযায়ী বিক্রি করছেন না। এমনকি সরকারি দরের রসিদ দিলেও বাড়তি দরের রসিদ দিচ্ছেন না। প্রতিবাদ করলে সার বিক্রি করবেন না জানিয়ে দিচ্ছেন বা ক্রেতার কাছে বিক্রি করা সার কেড়ে নিয়ে রেখে দিচ্ছেন। ডিলারদের কাছে এভাবে জিম্মি হয়ে তারা অসহায়বোধ করছেন।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সাবেক এমপি কামরুল আশরাফ খান বলেন, সারের দাম কোথাও বেশি না। দু-এক জায়গায় হয়তো খুচরা বিক্রেতারা বেশি দামে বিক্রি করছে। কিন্তু বাস্তবে সারা দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত আছে। তিনি বলেন, ডিলারদের ক্ষেত্রে ১২ বছর আগে যে কমিশন ছিল, এখনো ওই হারে কমিশন আছে। কিন্তু এর মধ্যে ডিজেলের দাম, পরিবহণ খরচ এবং শ্রমিকের মূল্য বেড়েছে। এরপরও ডিলাররা একই কমিশনে বিক্রি করে আসছে। তিনি বলেন, দেশে সরকারি-বেসরকারি খাতে পর্যাপ্ত সার আমদানি করা হয়েছে। ফলে সারের কোনো ঘাটতির আশঙ্কা নেই।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সরকার প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) টিএসপি সারের খুচরামূল্য ১ হাজার ১০০ (২২ টাকা প্রতি কেজি), এমওপি প্রতি বস্তা ৭৫০ (১৫ টাকা প্রতি কেজি), ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) ও ইউরিয়া প্রতি বস্তা ৮০০ টাকা (১৬ টাকা প্রতি কেজি) নির্ধারণ করে দিয়েছে। তবে কৃষকরা বলছেন, এই দামে সার বিক্রি হচ্ছে না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জমিতে এরই মধ্যে সেচ দেয়া শুরু হয়েছে। এই সেচ দেওয়ার যন্ত্রের প্রধান জ্বালানি ডিজেলের দাম বাড়ানোয় এবারের বোরো মৌসুমে কৃষকের সেচ বাবদ বাড়তি খরচ হবে ৭৫৬ কোটি ৬১ লাখ টাকা। অন্যদিকে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট বলছে, বিঘাপ্রতি সেচের জন্য বাড়তি ৩০০ টাকা খরচ জোগানোর পাশাপাশি ধান বিক্রিতে প্রায় ৩ শতাংশ মুনাফা কমবে কৃষকের। এমন পরিস্থিতিতে যদি সারও বাড়তি দামে কিনতে হয় তবে কৃষক আগামী বছর ধান আবাদে উৎসাহ হারিয়ে ফেলবেন, যা চালের সংকট আরও বাড়াবে।

 

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More