রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ : সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী

বিএনপির কঠোর আন্দোলনের হুমকি : অনড় অবস্থানে আওয়ামী লীগ
স্টাফ রিপোর্টার: উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেয়ার দাবিতে বিএনপি কঠোর আন্দোলনের হুমকি দিলেও এ ব্যাপারে আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে যেতে চাইছে না সরকার। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ এ ইস্যুতে কোনো ধরনের ছাড় দিতে নারাজ। বরং এ নিয়ে বিএনপি আন্দোলনের নামে রাজপথে নেমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালালে রাজনৈতিকভাবে তাদের কঠোরভাবে মোকাবিলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্ষমতাসীন এ দলটি। সরকারের নীতিনির্ধারক এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বক্তব্যে এসব বিষয় এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এদিকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি রাজপথে উত্তাপ ছড়ানোর চেষ্টা চালালে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, বিএনপির সব ধরনের গতিবিধি তারা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। নিয়মতান্ত্রিকভাবে তারা যে কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারবে। তবে আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টি করলে তাৎক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। যে কোনো ধরনের অপতৎপরতায় সরাসরি অংশগ্রহণকারীদের পাশাপাশি এর নেপথ্য মদদদাতা ও নির্দেশ দাতাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেবে পুলিশ।
দেশের একাধিক জেলার এসপির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপি আন্দোলনের নামে রাজপথে নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে পারে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে তাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ নির্দেশনা পাওয়ার পরপরই তারা মাঠ পর্যায়ে টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছে। বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কাউকে কোনো ধরনের অপতৎপরতায় সম্পৃক্ত পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার করা হবে।
সোমবার সকালে নিজ বাসভবনে এক ব্রিফিংয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘বিএনপির আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ভয় পায় না। বিএনপি এক দফা অথবা ১০ দফা আন্দোলন করুক, তাতে আওয়ামী লীগের কিছু যায়-আসে না।’ বিএনপির সরকার পতনের এক দফা আন্দোলন প্রসঙ্গে ওবায়েদুল কাদের বলেন, অতীতেও দেশবাসী বিএনপির দফাভিত্তিক আন্দোলন দেখেছে। তাদের আন্দোলন রাজপথে নয়, তাদের আন্দোলন হচ্ছে ফেসবুক আর মিডিয়ানির্ভর।
তার ভাষ্য, তাদের এসব হুমকি-ধামকি নিজেদের পদ-পদবি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়। বিএনপি নেতারা তাদের আন্দোলনের সক্ষমতা সম্পর্কে ভালোই জানেন। তবুও তারা কর্মী-সমর্থকদের রোষানল থেকে বাঁচতে গণমাধ্যমে লিপ-সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছেন অবিরাম।
এদিকে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর দাবি প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সংসদে জানিয়েছেন, ‘বিএনপি যে দাবি করছে, তা আইনের বইয়ে নেই। উনারা (বিএনপি) আমাকে যত খুশি গালি দিতে পারেন। তাতে আমার কিছু আসে-যায় না। আমি আইন মোতাবেক চলব।’ গত বৃহস্পতিবার সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে বিএনপির সংসদ সদস্য জিএম সিরাজের বক্তব্যের জবাবে আইনমন্ত্রী এ কথা বলেন।
জিএম সিরাজ তার দলের নেত্রীকে দু-একদিনের মধ্যে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর দাবি জানিয়ে বলেছিলেন। তা না হলে সংসদ থেকে পদত্যাগ করারও হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, আমাদের দলীয় সিদ্ধান্ত এমনও হতে পারে, ম্যাডাম যদি চরম অবস্থায় চলে যায়, তাহলে হয়তো এই পার্লামেন্টে আমাদের থাকা সম্ভব নাও হতে পারে।’
এ সময় আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আইনের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। মানবিক কারণে দন্ডপ্রাপ্ত খালেদা জিয়াকে সাজা স্থগিত রেখে ছয় মাস পরে বাড়ানো হয়েছে।’ চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে অনুমতি প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘আমি তা দেখিয়েছি যে বাংলাদেশের আইনের বইয়ে এটা নাই। উনারা যদি এটা দেখাতে পারেন, তাহলে তো আমরা এটা বিবেচনা করতে পারি। কিন্তু এটা আইনের বইয়ে নাই। উনারাও দেখাতে পারবেন না, বিবেচনার প্রশ্ন আসে না।’
খালেদা জিয়াকে ‘সঠিকভাবে’ চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে মন্তব্য করে আনিসুল হক বলেন, ‘একজন সাজাপ্রাপ্ত ৪০১ ধারায় কোনো সুযোগ নেই নিষ্পত্তিকৃত আবেদন আবার বিবেচনা করার।’ তবে আইনমন্ত্রী যে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, তা পুরোপুরি ‘মিথ্যা অপব্যাখ্যা’ বলে অভিযোগ করেন সংরক্ষিত আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। রোববার সকালে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও বিদেশে পাঠিয়ে চিকিৎসার দাবিতে বিএনপির এমপিদের মানববন্ধনে তিনি বলেন, দেশে আইনের শাসন থাকলে খালেদা জিয়া এমনিতেই জামিন পেতেন। এখনো ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারায় সরকার খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিয়ে বিদেশে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারে।
বিএনপির এই নেত্রী বলেন, বলা হচ্ছে, খালেদা জিয়াকে জেলে গিয়ে আবেদন করতে হবে। তিনি এখন সিসিইউতে। তার পক্ষে কীভাবে জেলে গিয়ে আবেদন করা সম্ভব?’ বিদেশে যেতে না দেয়ার কারণে উন্নত চিকিৎসার অভাবে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কিছু হলে দায়ভার সরকারকেই নিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন রুমিন ফারহানা।
এদিকে খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিয়ে যাওয়ার দাবি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে উল্লেখ করেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ডক্টর হাছান মাহমুদ। সোমবার দুপুরে সচিবালয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সভাকক্ষে সমসাময়িক বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে বিদেশে পাঠানোর উদ্দেশ্য যে রাজনৈতিক দাবি সরকার সে দাবি তো মানতে পারে না। কারণ তিনি একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি। অবশ্যই খালেদা জিয়া যেন সুচিকিৎসা পান সেটা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। প্রয়োজনে খালেদা জিয়ার কি হয়েছে সেটার জন্য বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজের চিকিৎসকসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসক দিয়ে মেডিকেল বোর্ড হতে পারে। সেই বোর্ড পরামর্শ দিতে পারেন আসলে খালেদা জিয়ার কি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিএনপি নেতাদের বক্তব্যে মনে হচ্ছে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাহেব, রিজভী সাহেব, খন্দকার মোশাররফ হোসেনসহ দলের অনেক নেতাই এখন ডাক্তার হয়ে গেছেন। আ স ম রউফ সাহেব একজন বড় ডাক্তার, মান্না সাহেবও ডাক্তার। তারা এখন ডাক্তারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, বিএনপি নেতারা বলছেন, খালেদা জিয়ার জীবন সংকটাপন্ন। এভারকেয়ার হাসপাতাল বা বিশেষজ্ঞরা কিছু বলেননি। মাঝে-মধ্যে বিএনপির চিকিৎসকরা যারা রাজনীতি করেন তারা কিছু কিছু কথা বলেন। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া আগেও অসুস্থ ছিলেন, দেশে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন। তখনো বিএনপি খালেদা জিয়াকে বিদেশ পাঠানোর জন্য ধোঁয়া তুলেছিলেন। খালেদা জিয়াকে বিদেশে না পাঠালে বাঁচানো যাবে না। বাস্তবতা হচ্ছে তখনো দেশের চিকিৎসা নিয়ে ভালো হয়ে বাড়িতে ফিরে গিয়েছিলেন। তখনকার মতো এবারও একই ধোঁয়া তুলছেন। আসলে খালেদা জিয়াকে বিদেশ নিয়ে যাওয়ার দাবিটা তার স্বাস্থ্যগত কারণ নয় এটা একটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত দাবি। তারা খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য নিয়ে রাজনীতি করছেন। খালেদা জিয়াকে নিয়ে রাজনীতি করা অনভিপ্রেত। আসলে উনারা হয়তো চান না খালেদা জিয়া সুস্থ হোক। কারণ সুস্থ হলে স্বাস্থ্য নিয়ে যে রাজনীতি এটি করা বন্ধ হয়ে যাবে।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More