শীতলক্ষ্যায় লঞ্চডুবি : মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৯

নদীপাড়ে শোকের মাতম : তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন

স্টাফ রিপোর্টার: নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে কার্গো জাহাজের ধাক্কায় যাত্রীবাহী লঞ্চডুবিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৯ জনে দাঁড়িয়েছে। দুর্ঘটনাকবলিত লঞ্চ ‘সাবিত আল আসাদ’ গতকাল সোমবার দুপুরে উদ্ধার করা হয়। সেটি থেকে ২১টি লাশ পাওয়া যায়। এছাড়া বিকেলে নদী থেকে একটি শিশুসহ তিনজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এর আগে রোববার রাতে নদী থেকে পাঁচজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। স্বজনদের দাবি এখনো কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছে। এ নিয়ে শীতলক্ষ্যা পাড়ে চলছে শোকের মাতম, হাহাকার। গত রোববার সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার কয়লাঘাট এলাকায় লঞ্চটি ডুবে যায়। এ ঘটনা তদন্তে তিনটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
দুর্ঘটনার ১৭ ঘণ্টা পর সোমবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে লঞ্চটিকে তীরে টেনে আনে উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয়। এসময় লঞ্চটির ভেতরে ছিলো লাশ আর লাশ। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিদা বারিক জানান, লঞ্চটি থেকে একটি শিশু, ১৫ জন নারী ও পাঁচজন পুরুষের লাশ পাওয়া যায়। এর আগে রোববার রাতে পাঁচজনের লাশ উদ্ধার করে স্থানীয় লোকজন ও ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা। তিনি আরও জানান, স্বজনরা নিখোঁজের যে তালিকা দিয়েছে সে অনুযায়ী কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছে। উদ্ধার অভিযান সরকারিভাবে সমাপ্ত করা হলেও স্থানীয় পর্যায়ে লোকজন ও স্বজনরা ট্রলার-নৌকা নিয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছে। র‌্যাবের হেলিকপ্টারও ঘটনাস্থল ও আশপাশে টহল দিতে দেখা গেছে। সোমবার বিকেল ৫টার দিকে জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করেন। তিনি জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হলেও সোমবার ভোর থেকে অভিযান পুরোদমে চলে। তিনি জানান, প্রতিটি লাশের জন্য নগদ ২৫ হাজার টাকা করে দেয়া হয়েছে এবং লাশ পরিবহনে সহায়তা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম সাদেক জানান, মৃতদের অধিকাংশের বাড়ি মুন্সীগঞ্জে। এছাড়া ঢাকার যাত্রাবাড়ী, শনিরআখড়া ও মিরপুরের কয়েকজন বাসিন্দা রয়েছে। ২৯টি লাশের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন মুন্সীগঞ্জ সদরের নুড়াইতলী এলাকার মোখলেছের মেয়ে রুনা আক্তার (২৪) ও প্রীতিময় শর্মার স্ত্রী প্রতিমা শর্মা (৫০), রিকাবিবাজার নূরপুর এলাকার মুশকে আলম মৃধার ছেলে শাহআলম মৃধা (৫৫), রতন পালের স্ত্রী মহারানী পাল (৩৭), মেল্লাকান্দি চৌদ্দমোড়ার সমর আলী বেপারীর ছেলে সোলেমান বেপারী (৬০), তার স্ত্রী বেবী বেগম (৫৫), মোল্লাকান্দি চর কিশোরগঞ্জের শামসুদ্দিন (৯০) ও তার স্ত্রী রেহেনা বেগম (৬৫), মালোপাড়ার হারাধন সাহার স্ত্রী সুনীতা সাহা (৪০) ও তার ছেলে বিকাশ সাহা (২২), উত্তর চর মসুরা এলাকার অলিউল্লাহর স্ত্রী পখিনা (৪৫), একই এলাকার আরিফের স্ত্রী বিথি (১৮) ও তার মেয়ে আরিফা (১), নোয়াগাঁও পূর্বপাড়া এলাকার মিঠুনের স্ত্রী ছাউদা আক্তার লতা (১৮), শরীয়তপুরের নড়িয়ার নূরনবী শেখের ছেলে আব্দুল খালেক (৭০), স্বরূপকাঠি এলাকার খাদিজা বেগম (৫০), ঝালকাঠির কাঁঠালিয়ার জিবু আক্তার (১০), উজিরপুরের খায়রুল হাওলাদারের ছেলে হাফিজুর রহমান (২৪), তার স্ত্রী তাহমিনা (২০) ও ছেলে আব্দুলাহ (১), দক্ষিণ কেওয়ার দেবীন্দ্র চন্দ্র দাসের ছেলে নারায়ণ দাস (৬৫) ও তার স্ত্রী পার্বতী রানী দাস (৪৫), বন্দরের কামরুজ্জামানের শিশুপুত্র আজমীর (২), বন্দরের সেলসারদী এলাকার নুরু মিয়ার ছেলে মো. নয়ন (২৯) ও দোলা বেগম (৩৪), ঢাকা শনিরআখড়া এলাকার রশিদ হাওলাদারের ছেলে আনোয়ার হোসেন (৪৫), তার স্ত্রী মাকসুদা বেগম (৩০), মাকসুদার মেয়ে মানসুরা (৭)।
নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছে সুনীতা সাহার আরেক ছেলে অনিক সাহা (১২), মধ্য কোন্ডাগাঁও এলাকার মতিউর রহমান কাজীর ছেলে ইউসুফ কাজী, ঢাকা মিরপুর-১১ এর বাসিন্দা সিরাজুল ইসলামের ছেলে সোহাগ হাওলাদার, টুঙ্গীবাড়ি বেতকা এলাকার মুছা শেখের ছেলে জাকির হোসেন (৪৫), আনোয়ার এবং মুন্সীগঞ্জ সদরের দক্ষিণ ইসলামপুরের নুরুল আমিনের ছেলে তানভীর হোসেন হৃদয়, মালোপাড়া এলাকার সিরাজের ছেলে রিজভী (২০)।
লঞ্চডুবির ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খাদিজা তাহেরী ববিকে প্রধান করে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে স্থানীয় প্রশাসন। কমিটিকে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এছাড়া বিআইডব্লিউটিএর নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক রফিকুল ইসলামকে প্রধান করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। গত রোববার সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে সদর উপজেলার কয়লাঘাট এলাকায় কার্গো জাহাজের ধাক্কায় অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে লঞ্চটি ডুবে যায়। রাতে ২৯ জন সাঁতরে তীরে ওঠেন? নিখোঁজ যাত্রীদের উদ্ধারে রাত থেকে কাজ করে বিআইডব্লিউটিএ, কোস্টগার্ড, দমকল বাহিনী, নৌ ও থানা পুলিশের উদ্ধারকর্মীরা? রাতেই পাঁচ নারীর লাশ উদ্ধার করা হয়।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More