সংশোধন ও অভিযুক্তদের চিহ্নিত করতে উচ্চপর্যায়ের দুই কমিটি হচ্ছে

পাঠ্যবইয়ে ভুল নিয়ে একে অপরের ওপর চাপাচ্ছেন দায় : বলি হচ্ছে শিক্ষার্থীরা

স্টাফ রিপোর্টার: ইতিহাসের বিকৃতি। তথ্য ও পরিসংখ্যানগত বিভ্রাট। বানান ভুল। চৌর্যবৃত্তি। গুগল ট্রান্সলেটরের ব্যবহার। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পিতার পেশা নিয়ে ‘তাচ্ছিল্য’। কিংবা নাম থেকে বংশীয় পদবি ‘শেখ’ বাদ দেয়া। সব মিলিয়ে নানা অসঙ্গতি। নানা সমালোচনা। কিন্তু দায় নিচ্ছে না কেউ। কেবল ড. জাফর ইকবালসহ ২ লেখক দায় নিয়েছেন, ভুল স্বীকার করেছেন। অন্যেরা একে অপরের ওপর দায় চাপাচ্ছেন। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) শুরুতে এসব অসঙ্গতি কানে তোলেনি। সমালোচনার মুখে একটি কমিটি গঠন করে কিছু ভুলের সংশোধনী দিয়েছে। অন্যদিকে নতুন শিক্ষাক্রমে উপেক্ষা করা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত। সব মিলিয়ে পাঠ্যবইয়ে ভুল নিয়ে চাপানউতোর অবস্থা। বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চমহলেও অস্বস্তি কাজ করছে। গঠন করা হয়েছে দু’টি কমিটি। একটিকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে অপরাধীদের খুঁজে বের করার। অন্যটি পাঠ্যবইয়ে সংশোধন আনার পরামর্শ দেবেন। শিক্ষাবিদরা বলছেন, এ ধরনের ভুল বোধগম্য নয়। ভুল তথ্য থাকলে বিপদ আছে। সেটি অশিক্ষার চেয়েও ভয়ঙ্কর। এ ধরনের ভুলের বলি হবে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।

গতকাল রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে পাঠ্যবইয়ে ভুল-ভ্রান্তির বিষয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, নতুন শিক্ষাক্রমে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করা হয়েছে। পাঠ্যবই প্রণয়নের ক্ষেত্রে আমরা আগেই কিছু ছবি ও পাঠ বাদ দিতে বলেছিলাম। কিন্তু আমাদের সিদ্ধান্ত মানা হয়নি। তাই নির্দেশনার পরও সেগুলো বই ছাপানোর পর রয়ে গেছে। এ সময় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন, শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ফরাদুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, পাঠ্যবইয়ে যে ভুলগুলো সামনে এসেছে সেগুলো ইচ্ছাকৃত, না কি ভুলবশত তা খতিয়ে দেখবে তদন্ত কমিটি (দু’টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে)। এ কমিটিতে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠন করা হবে। তিনি বলেন, একটি কমিটি নানা ক্ষেত্রের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে গঠন করা হবে। এই কমিটি একটি লিংক প্রভাইড করবে। এই লিংকে সারা দেশের মানুষ তাদের মতামত দেবেন। সেই মতামতের আলোকে পাঠ্যবইয়ে সংশোধন আনার পরামর্শ দেবে কমিটির সদস্যরা। অপর কমিটি পুরো বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করবে। যারা পাঠ্যবই তৈরির সঙ্গে যুক্ত তাদের কোনো গাফিলতি আছে কি না সে বিষয়টি এই কমিটি তদন্ত করবে। গাফিলতির সঙ্গে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সদস্য কিংবা যে কেউ জড়িত থাকুক; তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। দীপু মনি বলেন, পাঠ্যবইয়ে কোনো বিষয়ে বিতর্ক বা ভুল থাকলে তা অবশ্যই পরিবর্তন করা হবে।

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার মতো কিছু রাখা হবে না। কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অধিকার কারও নেই। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বইগুলো প্রণয়নের সঙ্গে যারা যুক্ত ছিলেন তাদের বইয়ের কোথাও যেন ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি, পেশা, লিঙ্গ বিদ্বেষ-বৈষম্য না থাকে সেজন্য সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। ভুলটা হয়তো বড়, যা আরও আগে চিহ্নিত হওয়া দরকার ছিল, সংশোধন হওয়া দরকার ছিল। এনসিটিবি কর্মকর্তারা জানান, পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় পাঠ্যবইয়ে ভুল থেকে যাচ্ছে। এ ছাড়া প্রতিটা বই প্রেসে দেয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের দেয়া হয়। তারা চূড়ান্ত করার পরই বই প্রেসে দেয়া হয়। কিন্তু দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের চোখে ভুলগুলো ধরা না পড়লে এনসিটিবি’র কিছু করার থাকে না। এবারের পাঠ্যবইয়ে ভুলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাবার নাম। শেখ বাদ দিয়ে শুধু লেখা হয়েছে লুৎফর রহমান। এছাড়া দু’টি ইতহাসের বইয়ে রয়েছে আরও ১৮টি অসঙ্গতি। ষষ্ঠ শ্রেণির ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ে ‘ছেলেবেলার মুজিব’ শিরোনামে ৭ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে, বঙ্গবন্ধুর বাবা লুৎফর রহমান ছিলেন সরকারি অফিসের কেরানি। অথচ তিনি ছিলেন আদালতের সেরেস্তাদার। বইটিতে কেরানি শব্দটি ব্যবহার করে ‘তাচ্ছিল্য’ করা হয়েছে জাতির পিতার বাবাকে, এমনই অভিযোগ সমালোচকদের। বাদ গেছে শেখ পদবীটিও। এ ছাড়াও একই বইয়ের ৭১ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘ভাষা আন্দোলন’ শিরোনামে যে বর্ণনা দেয়া হয়েছে সেখানে কোথায়ও নেই জাতির পিতার অবদানের কথা। ২৫শে মার্চের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলা হয়, বঙ্গবন্ধু কারাবরণ করেছেন। এ ছাড়াও বইটিতে আরও অনেক ভুল পাওয়া গেছে। নতুন কারিকুলামের সপ্তম শ্রেণির ‘বিজ্ঞান, অনুসন্ধানী পাঠ’ বই নিয়েও উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। যার প্রমাণও মিলেছে। দায় স্বীকার করেছেন এর ২ লেখক ড. জাফর ইকবাল ও ড. হাসিনা খান। জাফর ইকবাল এ বইয়ের সম্পাদনার দায়িত্বেও ছিলেন। বইটিতে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ উঠেছে। বেশকিছু জায়গায় ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ওয়েবসাইট থেকে হুবহু কপি করা হয়েছে।

এ ছাড়াও ইংরেজি ভার্সনের ভাষান্তর করা হয়েছে গুগল ট্রান্সলেটরের ব্যবহার করে। নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা’ বইয়ে ভুল করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর শপথ গ্রহণের তথ্য। বলা হয়, ‘১২ই জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের নিকট প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।’ অথচ বঙ্গবন্ধুকে শপথ পড়িয়েছেন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। একই বইয়ের ১৮১ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘২৬শে মার্চ থেকে ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশজুড়ে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী নির্যাতন, গণহত্যা আর ধ্বংসলীলায় মেতে ওঠে।’ সঠিক তথ্য হলো- পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর নির্যাতন, গণহত্যা ও ধ্বংসলীলা শুরু হয় ২৫শে মার্চ কালরাতে। এই বইয়েই সংবিধানের আলোচনায় বলা হয়েছে, ‘পঞ্চম ভাগে জাতীয় সংসদ’। সঠিক তথ্য ‘পঞ্চম ভাগে আইনসভা’। একই শ্রেণির আরেক বইয়ে ‘পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ ক্যাম্প, পিলখানা ইপিআর ক্যাম্প ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আক্রমণ চালায় ও নৃশংসভাবে গণহত্যা ঘটায়’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বইয়ের ১৬ নম্বর পৃষ্ঠায় এমন তথ্য দেয়া হয়। যদিও রাজারবাগ ছিল পুলিশ লাইনস। আর পিলখানায় ছিল ইপিআর সদর দপ্তর। এ ছাড়াও অষ্টম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়’ বইসহ বিভিন্ন বইয়ে আরও অনেক ভুল করা হয়েছে। রয়েছে বানান, তথ্য ও পরিসংখ্যানগত ভুলও। সম্প্রতি এনসিটিবি চেয়ারম্যান প্রফেসর ফরহাদুল ইসলাম বলেন, আমি দায়িত্ব নিয়েছি জুনে। পূর্বাপর কী হয়েছে তা আমি জানি না। আবার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব এড়াতেও চাচ্ছি না। আগের কোনো বিষয় আমার জানার কথা ছিল না। আমরা কিছু বই পরীক্ষামূলক সংস্করণ দিয়েছি। এনসিটিবি সব বই-ই প্রথম বছর পরীক্ষামূলক সংস্করণ দিয়ে থাকে। এরপর সারা বছর বইয়ের সঙ্গে যুক্ত সব স্টেকহোল্ডাররা ভুলগুলো পর্যালোচনা করে। সবাই যে ভুল পাবে সেগুলো সংশোধন করে পরবর্তী বছর প্রথম সংস্করণ বের করা হবে। আমরা শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সব সংশোধনী গ্রহণ করে থাকি। পত্র-পত্রিকায়ও যেসব ভুল সামনে আনা হয় সেগুলোও আমলে নিয়ে থাকি।

এরপর আমরা সব ভুল আমলে নিয়ে পরবর্তী বছর থেকে প্রথম সংস্করণ বের করে থাকি। কিন্তু একই সঙ্গে অনেকে ভুল তথ্যও ছড়ায় তাই আমরা ভালোভাবে পরীক্ষা করে যেসব ভুল পাবো সেগুলো সংস্কার করবো। আশা করি প্রথম সংস্করণে কোনো ভুল বা অসঙ্গতি থাকবে না।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক প্রফেসর ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, ভুল মানুষ মাত্রই করে। ফেরেশতা ভুল করে না। কিন্তু গতবারও যে ভুলগুলো এনসিটিবি করেছে তা তারা সংশোধন করেনি। কেন করেনি তা আমার বোধগম্য নয়। তারা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে সেগুলো সংশোধন করে দিতে পারতো। কিন্তু সে পথে এনসিটিবি হাঁটেনি। একটা কথা হচ্ছে ভুল তথ্য থাকলে বিপদ আছে। সেটি অশিক্ষার চেয়েও ভয়ঙ্কর।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More