দামুড়হুদায় বাণিজ্যিক ভাবে চাষ হচ্ছে সজনে পাতা

দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে সজিনা গাছের সংখ্যা ও এর উৎপাদন : এই আবাদের সাথে জড়িতরা ইতোমধ্যে সুফল পেয়েছেন

তাছির আহমেদ : সজনে গাছকে বলা হয় পুষ্টির ডিনামাইট। সজনে গাছের পাতাকে বলা হয় অলৌকিক পাতা। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে পুষ্টিকর হার্ব। গবেষকরা সজনের পাতাকে বলে থাকেন নিউট্রিশন্স সুপার ফুড। পুষ্টি ও ওষুধি গুণাগুণের কারণে সুপার ফুড সবার পরিচিত এই সজনের আবাদে ঝুঁকেছেন চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার হাউলী গ্রামের রমজান আলী। বারোমাসি সজনের দুটি জাতের আবাদ শুরু করেন তিনি বছর খানিক আগে। প্রাকৃতিক বড় ধরণের কোন দুর্যোগ না হলে এবং আবহাওয়া অনুকুলে থাকলে বাম্পার ফলনসহ এর বাজার দর ভালো হবে। এই আবাদের সাথে জড়িতরা ইতোমধ্যে এর সুফল পেয়েছেন। এ চাষের সাথে সম্পৃক্তরা গ্রামীন অর্থণীতিতে দিন বদলের পালায় চাঙ্গা হতে শুরু করেছেন।

উপজেলার হাউলী গ্রামের নুর হকের ছেলে রমজান আলী (৬০) নামের এই সজনে চাষী বলেন, গ্রামের দো’রাস্তা নামক মাঠে ১২ কাঠা জমিতে বারো মাসি জাতের সজনে বা নজিনা নিজে চারা তৈরী করে গত বছর আবাদ শুরু করেছি। এই আবাদে উভয় জাতের সজনের ডাটার চেয়ে পাতার চাহিদা বেশী ছিল। ইতোমধ্যে ১০ টাকা কেজি দরে ৪০ হাজার টাকার মত পাতা বিক্রি করেছি। তবে বারোমাসি সজনের পাতার চেয়ে ডাটা আবাদে অধিক লাভ জনক। রোগ বালাই কম। গাছের কোন পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। অযতœ অবহেলায় প্রাকৃতিকভাবেই বেড়ে ওঠে। তাই এবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি বারোমাসি সজনের পাতা বিক্রি বন্ধ করে দিয়ে ডাটা করার চিন্তা-ভাবনা। ইতোমধ্যে বারোমাসি কয়েকটি সজনের গাছের ডালে ফুল ফুটেছে। আগাম ফুল ফোটার গাছগুলোতে ডাটা এসেছে। ডাটার গঠন লম্বা ও চেহারা খুব সুন্দর দেখা দিয়েছে। প্রতিটি ডাটা প্রায় দেড় হাত করে লম্বা হয়েছে। বারোমাসি সজনে আগে পেছে ফুল আসার কারণে ডাটা রুপান্তর হয়ে থাকে আগে পেছে। এ চাষে আমার প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হযেছে। প্রায় সারা বছর ফলন পাওযার কারণে এ চাষে পাতার চেয়ে ডাটায় লাভের পরিমান বেশী। এ গ্রামে আমার মত অনেকেই সজনের আবাদ শুরু করেছে।

দামুড়হুদা বাজারের সবজি ব্যবসায়ী সামসুল ও মালেক বলেন, স্থানীয় ও দেশের বিভিন্ন হাট বাজারে সজনে ও নজিনা ডাটার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। মুখোরোচক ও পুষ্টি গুনে ভরপুর সজনে ডাটা স্থানীয়ভাবে বিক্রির পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়ে থাকে। বাজারে অন্যান্য সবজির চেয়ে উঠতি সজনের দাম সাধারণত আকাশ চুম্বী হয়। বারোমাসি সজনে বা নজিনা বাজারে সব সময় কমবেশী পাওয়া যায়। বাজারে এখন ৮০/৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। মরসুমি সবজি সজনে ও নজিনার চাহিদা সব সময় থাকে।

উপজেলা কৃষি অফিস সুত্রে জানা গেছ্,ে পুষ্টি ও ওষুধি গুণাগুণের কারণে সবার পরিচিত সজিনা গাছ থেকে ডাল সংগ্রহ করে কার্টিং রোপণ করা হয়। বসতবাড়ি, রাস্তার ধারসহ যে কোন স্থানের মাটিতে ৩ মিটার দূরত্বে কার্টিং রোপন করা যায়। রোপনকালে গোবর সার এবং দ্রত শিকড় গজানোর জন্য সামান্য ফরফরাস সার ও ছাই ব্যবহার করা উত্তম। প্রচলিত কার্টিং পদ্ধতি ছাড়াও চারা রোপণের মাধ্যমে সজিনা চাষের আবাদ করা যায়। দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে সজিনা গাছের সংখ্যা ও এর উৎপাদন। সজনে ডাটা প্রধানত দুই প্রজাতির। এর মধ্যে এক প্রজাতির সজিনা বছরে একবার ফলন পাওয়া যায়। স্থানীয়ভাবে এর আর এক প্রজাতির নাম বারোমাসি সজিনা বা নজিনা। বছরে তিন-চার বার ফলন পাওয়া যায়। সজিনা গাছ যে কোন পতিত জমি, পুকুর পাড় বা রাস্তা ধারের যে কোন ফাঁকা জায়গায় বানিজ্যিক ভাবে লাগানো যায়। গাছের ডাল কেটে মাটিতে পুঁতে রাখলেই সজনে গাছ জন্মায়। সজনে গাছের কোন পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। অযতœ অবহেলায় প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠে গাছ। এখন বীজ সংগ্রহ করে চারা তৈরী করে জমিতে রোপন করা হচ্ছে। বড় ও মাঝারি ধরনের একটি গাছে ৩ থেকে ৪ মণ পর্যন্ত সজনে পাওয়া যায়। প্রাকৃতিক কোন দুর্যোগ না হলে বাম্পার ফলন হয়ে থাকে।

উপজেলা কৃষিবিদ ও কৃষি কর্মকতা মোঃ মনিরুজামান বলেন, বিজ্ঞানীরা গবেষনায় পেয়েছেন, সজনের পাতা পুষ্টিগুণের আঁধার। এর পাতায় ৩৮ রকম অত্যাবশ্যকীয় এমাইনো এসিডসহ ৩৮ শতাংশ আমিষ রয়েছে। আমিষের অনুপাত বিবেচনায় সজনের গাছকেই পৃথিবীর সেরা গাছ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। পুষ্টি ও ওষুধি গুণ বিবেচনায় এই গাছকে বাড়ির আঙ্গিনায় এটি একটি মাল্টিভিটামিন বৃক্ষ। এ উপজেলার মাটি ও আবহাওয়া সজনে চাষের উপযোগী। এখানে ব্যাণিজ্যিকভাবে সজনে চাষ করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। ফলে অনেকে আম, জাম, কাঠাল লিচু বাগানের মত এখন বিনা খরচে অধিক আয়ের জন্য অনেক সবজি চাষি ব্যাণিজ্যিকভাবে সজনে চাষে আগ্রহী হয়ে সজনের আবাদ শুরু করেছে। তাছাড়া উপজেলার কুড়লগাছি, লোকনাথপুর, ডিসি ইকোপার্ক ও উপজেলা পরিষদের মধ্যে সজনের ডাল রোপন করা হয়েছে। এ ব্যপারে সকল প্রকার পরামর্শের জন্য কৃষি বিভাগের দরজা খোলা রয়েছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পঃ পঃ কর্মকতা আবু হেনা মোঃ জামাল শুভ বলেন, সজনে সবজিতে ক্যালসিয়াম, খনিজ লবণ আয়রণসহ প্রোটিন ও শর্করা জাতীয় খাদ্য রয়েছে। এছাড়া গাছের বাকল ও পাতা রক্তামাশয় পেটের পীড়া, উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ কার্যকর ভূমিকা রাখে সজনের বাকল, শিকড়, ফুল, ফল, পাতা, বীজ এমনকি এর আঠাতেও ওষুধি গুণ আছে। পোকার কামড়ে এন্টিসেপটিক হিসেবে সজনে পাতার রস ব্যবহার হয়। মাথা ব্যথায় সজনের কচিপাতা কপালের দুই পাশে ঘষলে ব্যথা উপশম হয়। সজনে গ্যাস্টিক রোগের বায়ুনাশক হিসেবে কাজ করে। পাতার রস হৃদরোগ চিকিৎসায় এবং রক্তের প্রবাহ বৃদ্ধিতে ব্যবহার হয়। ক্ষতস্থান সারার জন্য সজনে পাতার পেষ্ট কার্যকরি। খাদ্যাভাসে সজনে গাছের পাতায় চোখের ছানি পড়া রোগ কম হয়। ভারত, চীনসহ পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশে সজনে পাতার পাউডার দিয়ে তৈরি ক্যাপসুল বাণিজ্যিক ভাবে বাজারজাত করছে। আফ্রিকার দুর্ভিক্ষ পীড়িত অনাহার ও অপুষ্টি শিকার মৃত প্রায় রোগাক্রান্ত শিশুদের দ্রুত আরোগ্যের জন্য সজনের পাতা ও পাতার গোড়া খাওয়ানোর কর্মসূচি চলমান রয়েছে।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More