আয়া সোফিয়া : জাদুঘর থেকে মসজিদ

…………….. হাসানুজ্জামান ………………
কয়েকদিন আগেও মানুষ জানতো তুরস্কের রাজধানী ইস্তাম্বুলে ‘আয়া সোফিয়া’ নামে একটি জাদুঘর রয়েছে।

প্রতি বছর বিভিন্ন দেশ থেকে এই যাদুঘর দেখতে লক্ষ লক্ষ পর্যটক তুরস্কে এসেছে। কিন্তু গত ১০ জুলাই’২০২০ সাল থেকে এক আদালতের রায়ের মাধ্যমে ‘আয়া সোফিয়া’ এখন আর জাদুঘর নয় মসজিদ হিসাবে ব্যবহূত হবে ।‘ আগামী ২৪ জুলাই’২০২০ থেকে এই মসজিদে নামাজ আদায় করা হবে বলে ঘোষণাটি দিয়েছেন তুরস্কের বর্তমান প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। এই রায় এবং ঘোষণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন রাশিয়ার অর্থোডক্স চার্চ , রাশিয়ার পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির উপ-প্রধান ভøাদিমির ঝাবারভ । গ্রীসের সংস্কৃতিমন্ত্রী লিনা ফেন্ডলি বলেন ‘ এরদোয়ান যে জাতীয়তাবাদ দেখালো তাতে তার দেশ ছয় শতাব্দী পিছিয়ে গেল। সাইপ্রাস তুরস্কের এই রায়ের কড়া সমালোচনা করেছে। ইউনেস্কো বলেছে ‘ তারা আয়া সোফিয়ার বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখবে।এ জন্য তারা তুরস্ককে একটি সংলাপে বসার আহবান জানাবে’।

১ হাজার ৫০০ বছর আগে ‘ আয়া সোফিয়া’ খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের অর্থোডক্স গির্জা ছিল। ১৪৫৩ সালে অটোম্যানদের বিজয়ের পর এটিকে মসজিদে রুপান্তর করা হয়। ১৯৩৫ সালে এটিকে জাদুঘরে রুপান্তর করা হয়। ইউনেস্কোর হেরিটেজ সাইটে এই ‘ আয়া সোফিয়া’র নাম রয়েছে। তুরস্কের ইসলাম পন্থিরা এটাকে মসজিদে রুপান্তরিত করতে দাবী জানিয়ে আসছিল। পাশাপাশি ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা মুসলিমদের এই দাবীর বিরোধিতা করে আসছে।
নির্মাণের পর থেকে ‘ আয়া সোফিয়া’ নিয়ে বিতর্ক চলে আসছিল। যে যখন ক্ষমতায় যায় তারা তখনই তাদের মত করে ‘আয়া সোফিয়া’কে ব্যবহার করেছে। এই বিতর্কের সমাপ্ত টেনেছিলেন আধুনিক তুরস্কের জন্মদাতা মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক। তিনি ছিলেন একজন অসাম্প্রদায়িক , বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ। তিনি গীর্জা , মসজিদের উর্ধ্বে উঠে এই ‘ আয়া সোফিয়া’কে জাদুঘরে রুপান্তর করেন। তার এই সিদ্ধান্ত মেনে নেয় সকল ধর্মের মানুষ। এই জাদুঘর দেখতে প্রতি বছর প্রায় ৩৭ লক্ষ পর্যটক তুরস্কে প্রবেশ করে।১৯৩৫ সালের আগে এই জাদুঘরটি মসজিদ হিসাবে ব্যবহারের সময় দেওয়ালের মার্বেল পাথরে অংকিত যীশু খ্রিষ্টের বেশ কিছু দূর্লোভ ছবি সিমেন্ট দিয়ে মুছে ফেলার চেষ্ঠা করা হয়। ছবিগুলো ৫০০ বছরের মত সিমেন্টের নিচে চাপা পড়েছিল। যাদুঘরে রুপান্তরের পর ছবিগুলো আবার উদ্ধার করা হয়। এদিকে যাদুঘর করলেও আয়া সোফিয়ার নীচতলায় পৃথক রুমে খ্রিষ্ঠান এবং মুসলিমদের জন্য প্রার্থনার ব্যবস্থা রাখা হয়। যাদুঘরের কর্মচারীরা যার যার ধর্মানুযায়ী এই সংরক্ষিত কক্ষগুলো ধর্মীয় কাজে ব্যবহার করে আসছে।

আর্ন্তজাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা তুরস্কের নির্বাচনের সময় কাছে চলে এসেছে। রাজধানীর দুটি সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের দায়িত্ব পালন করে আসছে বিরোধী পক্ষরা। এই বিষয়টি প্রেসিডেন্ট তাইয়েপ এরদোয়ানের জন্য বড়ই বিড়ম্বনার। তারপরে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক তুরস্কের উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটি নানা সমস্যায় জর্জরিত রয়েছে। ফলে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে গিয়ে এরদোয়ান এ রকম একটি ধর্মীয় বিষয়কে পুজি করে সামনে এগুতে চাচ্ছেন। মসজিদ বা ধর্মকে কেন্দ্র করে এই উপমহাদেশে রাজনীতি করার প্রচলন অনেক আগে থেকে রয়েছে। ভারতের অযোদ্ধ্যায় রয়েছে বাবরী মসজিদ। মোগল সম্্রাট বাবরের নির্দেশে তার প্রধান সেনাপতি মীর বাকী ১৫২৮-২৯ সালে এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। কিন্তু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের দাবী তাদের ধর্মের অবতার রামের জন্মস্থান এটি। ২০০৩ সালে ভারতের ভ’মি জরিপ বিভাগ বাবরী মসজিদের নীচে একটি পুরানো স্থাপনার অস্থিত্ব পেয়েছেন। ফলে এলহাবাদ উচ্চ আদালত উভয় ধর্মের লোকজনের মধ্যে বাবরী মসজিদের জায়গাটি ভাগ করে দেওয়ার রায় দেয়। পরবর্তীতে আপিল করলে আদালত বাবরী মসজিদকে পুরোটাই হিন্দুদের জন্য এবং মুসলিমদের জন্য পৃথক জায়গায় ৫ একর জমি বরাদ্দ দেওয়ার আদেশ দেয়। এই মসজিদটিকে কেন্দ্র করে ভারতীয় রাজনীতিতে ভারতীয় জনতাপর্টি ( বিজেপি) শক্তিশালী হয়েছে। বার বার ক্ষমতার মসনদ দখল করেছে তারা। আদালতের বিষয়গুলি এমন একটি সময়ে মীমাংসিত হয়েছে যখন বিজেপি ক্ষমতায় ছিল। রায়গুলি তাদের পক্ষে গেছে। একই ভাবে তুরস্কে জাদুঘরকে মসজিদে রুপান্তর করতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার যে অপব্যবহার হয়নি তার নিশ্চয়তা কে দিবে।

ধর্মীয় বিভেদের কারণে দেশ পিছিয়ে যায়। আর এই বিভেদের পিছনে বাতাস দেয় সুবিধাবাদী , ক্ষমতালোভী রাজনৈতিক দলগুলো। মসজিদকে কেন্দ্র করে ভারত এবং তুরস্কে যে রাজনীতি তা কতটুকু সুখকর হবে তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। হয়তো মোদী বা এরদোয়ান মসজিদকে পুজি করে সাধারণ মানুষের ( একশ্রেণীর) সহানুভ’তি নিয়ে বার বার ক্ষমতায় যেতে পারবে কি›তু দেশ এবং নাগরিকরা হয়ে উঠবে বন্ধুহীন। যুগ যুগ ধরে তার জন্য দেশ ও জনগণকে খেসারত দিতে হতে পারে।

এছাড়া, আরও পড়ুনঃ

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More